ঢাকা শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬, ২৭ আষাঢ় ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

ফিলিস্তিনের গ্র্যান্ড মুফতিকে আটক করেছে ইসরায়েল

গাজায় ত্রাণবাহী ট্রাকচালককে হত্যা
ফিলিস্তিনের গ্র্যান্ড মুফতিকে আটক করেছে ইসরায়েল

ফিলিস্তিনের অধিকৃত জেরুজালেমে অবস্থিত আল-আকসা মসজিদের ইমামকে আটক করেছে ইসরায়েল। পবিত্র জুমার নামাজের পর তাকে আটক করা হয়। গতকাল শুক্রবার ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ওয়াফার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুক্রবার জুমার নামাজের পর ইসরায়েলি বাহিনী আল-আকসা মসজিদ থেকে জেরুজালেম ও ফিলিস্তিনের গ্র্যান্ড মুফতি শেখ মোহাম্মদ হুসেনকে আটক করে। তবে তাকে আটকের কারণ বা ইসরায়েলি বাহিনী তাকে কোথায় নিয়ে গেছে, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে আর কোনো বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, শেখ মোহাম্মদ হুসেন শুক্রবার আল-আকসা মসজিদে জুমার খুতবা দেন এবং নামাজে ইমামতি করেন। এর কিছুক্ষণ পরই ইসরায়েলি সেনারা তাকে আটক করে। এদিকে, ইসরায়েলের এ পদক্ষেপের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আবারও পাল্টাপাল্টি হামলা শুরু হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ইরানের পাঁচটি প্রদেশে হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের চার প্রতিবেশী দেশ কুয়েত, কাতার, বাহরাইন ও জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে ইরান। দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) শুক্রবার এক বিবৃতিতে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। আইআরজিসির বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইরানে হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পাল্টা এই হামলা চালানো হয়। এতে কুয়েতে মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র, কাতারে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা-সংক্রান্ত পূর্ব সতর্কীকরণ কেন্দ্র এবং বাহরাইনে মার্কিন বাহিনীর একটি জ্বালানি ডিপোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। আইআরজিসির এই বিবৃতির কয়েক ঘণ্টা পর কুয়েত সরকার এক বিবৃতিতে জানায়, বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে কুয়েতকে লক্ষ্য করে একটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, তিনটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ১০টি বিস্ফোরকবাহী ড্রোন নিক্ষেপ করা হয়েছিল। তবে সবগুলোই লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার আগেই ধ্বংস করে ফেলা হয়। ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষের আঘাতে কুয়েতে একজন নিহত হয়েছেন বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে। জর্ডানের প্রতিরক্ষা বাহিনীর বরাত দিয়ে দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, জর্ডানের পূর্বাঞ্চলীয় শহর আজরাকে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে বৃহস্পতিবার রাতে ১০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল ইরান। এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম ব্যবহার করে সেগুলোর মধ্যে আটটিকে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার আগেই ধ্বংস করা হয়। বাকি দুটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা সম্ভব না হলেও আজরাকের মার্কিন ঘাঁটিতে কোনো প্রাণহানি বা ক্ষয়ক্ষতি হয়নি বলে জানিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত বার্তা সংস্থা।

গাজায় ত্রাণবাহী ট্রাকচালককে ‘বিনা বিচারে হত্যা’র অভিযোগ আইডিএফের বিরুদ্ধে

গাজায় ‘ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেন’ (ডব্লিউসিকে)-এর খাদ্য সহায়তা বহনকারী এক ফিলিস্তিনি চালককে এক ইসরায়েলি সেনা ‘বিনা বিচারে হত্যা’ (ফিল্ড এক্সিকিউশন) করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় ট্রাক চালক সমিতির বরাতে এই তথ্য জানা গেছে। গাজায় প্রবেশের পরপরই একটি ট্রাক বিকল হয়ে পড়ায় ত্রাণবাহী বহরটি থেমে যায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, ইসরায়েলি সেনারা চালকদের ট্রাক থেকে নামার নির্দেশ দেন। এ সময় আহমদ এসলেম তার দুই হাত ওপরে তুলে থাকা অবস্থায় এক সেনা তাকে লক্ষ্য করে মাথায় সরাসরি গুলি করেন। ওই বহরে থাকা অন্য একটি ট্রাকের চালক দিয়া মনসুর জানান, গাজা উপত্যকার দক্ষিণ প্রান্তের ফিলাডেলফি করিডোরে এই ঘটনা ঘটে। তিনি বলেন, ‘ট্রাকটি নষ্ট হওয়ার পর আমরা সেটি পরীক্ষার অনুমতির জন্য অপেক্ষা করছিলাম। কারণ আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপ আগে থেকে সমন্বয় করতে হয়। অপেক্ষার সময় একটি ইসরায়েলি সামরিক যান সেখানে পৌঁছায়। সেনারা আমাকে ও আহমদকে ট্রাক থেকে নামার নির্দেশ দেন। এরপর তারা আরেক চালক আলা শাতকেও নামতে বলে। তবে বহরের সামনে থাকা ফারেস মুহাইসেন ট্রাকের ভেতরেই ছিলেন।’

মনসুর আরও বলেন, ‘তারা আমাদের রাস্তার পাশে দাঁড় করান। আমাকে কাপড় খুলে রোদের নিচে বসে থাকতে বাধ্য করা হয়। এরপর তারা আহমদকে তার ট্রাক থেকে বের করে আনে। এক সেনা সদস্য দুই হাত তুলে দাঁড়িয়ে থাকা আহমদের সঙ্গে কথা বলা শুরু করেন। আহমদ হিব্রু জানতেন না এবং মনে হচ্ছিল সেনারাও তার আরবি বুঝতে পারছিল না। হঠাৎ তারা আহমদকে গুলি করে। তার মাথায় গুলি লাগে এবং তিনি ঘটনাস্থলেই মারা যান। মনে হচ্ছিল আমরা কেন থেমেছি তারা তা জানার চেষ্টা করছিল, কিন্তু পরিস্থিতি বুঝতে না পেরে কোনো আলাপ ছাড়াই সরাসরি গুলি চালিয়ে দেয়।’ গাজার পরিবহন কোম্পানি সমিতির উপ-প্রধান এবং নিহতের দূরসম্পর্কীয় আত্মীয় জিহাদ এসলেম বলেন, বুধবারের ওই ত্রাণ বহরটি জাতিসংঘ বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) এবং ডব্লিউসিকে-এর মাধ্যমে ‘শতভাগ’ সমন্বয় করা হয়েছিল।

তিনি বলেন, ‘একজন ইসরায়েলি কর্মকর্তা ও কয়েকজন সেনা ট্রাক চালকদের কাছে এসে তাদের ওখানে অবস্থানের কারণ জিজ্ঞাসা করেন এবং সবাইকে ট্রাক থেকে নামতে বলেন। তারা চালকদের লাঞ্ছিত ও মারধর করেন এবং নগ্ন হতে বাধ্য করেন। আহমদ যখন আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে হাত তোলেন, ঠিক তখনই এক সেনা তার এমণ্ড১৬ রাইফেল দিয়ে সরাসরি আহমদের মাথায় গুলি করেন। এটি ছিল একজন নিরস্ত্র বেসামরিক চালককে বিনা বিচারে হত্যা, যিনি সব নির্দেশ মেনে চলেছিলেন। তিনি কমলা রঙের সেফটি ভেস্ট পরে ছিলেন এবং তার কাছে ইসরায়েলি বাহিনীর (আইডিএফ) অনুমোদিত সব ধরনের পারমিট ও নিরাপত্তা ছাড়পত্র ছিল।’

আহমদের নিয়োগকর্তা ইয়াদ কামরি ট্রেডিং অ্যান্ড পাবলিক ট্রান্সপোর্ট কোম্পানিও জানিয়েছে যে এক সেনা সদস্য খুব কাছ থেকে তাকে গুলি করেছেন। হাসপাতাল থেকে পাওয়া আহমদের লাশের ছবিতে তার মাথায় গুরুতর ক্ষত দেখা গেছে। ৩০ বছর বয়সী আহমদের দুই সন্তান রয়েছে, যাদের বয়স দুই বছরের নিচে। কোম্পানির মালিক ইয়াদ এসলেম বলেন, ‘চালকরা রাত ৩টায় স্ত্রী-সন্তানদের রেখে ঘর থেকে বের হন, আর কেউ কেউ ফেরেন লাশ হয়ে। আহমদ এক মাস বয়সী একটি শিশু এবং এক কন্যা সন্তান রেখে গেছেন। এই ঘটনার পর থেকে আমার কোম্পানির পাঁচজন চালক জানিয়েছেন যে তারা আর এই কাজে ফিরবেন না। তারা পদত্যাগ করেছেন। যারা এখনও কাজ করছেন, তারা শুধু পরিবারের মুখে অন্ন জোগাতেই বাধ্য হয়ে ঝুঁকি নিচ্ছেন।’

ইসরায়েলি বাহিনী এই গুলির ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করলেও ঘটনার ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছে। বাহিনীটির এক মুখপাত্র বলেন, ‘বুধবার ফিলাডেলফি করিডোরে আইডিএফ সদস্যরা তিন চালককে দেখতে পান যারা নির্ধারিত নিয়মের বাইরে ট্রাক থামিয়ে বাইরে বেরিয়েছিলেন। সেনারা তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেন। একই সময় কাছেই এক চেকপোস্ট থেকে এক চালক সেনাসদস্যদের দিকে দৌড়ে আসছিলেন। সেনারা তখন ওই পরিস্থিতিকে হুমকি মনে করে সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে নিয়ম (প্রটোকল) অনুযায়ী গুলি চালান।’

সামরিক বাহিনীর দাবি, গুলিতে ওই চালক আহত হলে তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং পরে রেড ক্রসের মাধ্যমে হাসপাতালে পাঠানো হয়। পুরো ঘটনাটি বর্তমানে পর্যালোচনাধীন রয়েছে বলে জানানো হয়।

বিপজ্জনক কাজ

গাজায় জাতিসংঘ ও অন্যান্য সংস্থার ত্রাণ পরিবহনের কাজ বর্তমানে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত ২১ মে মুহাম্মদ আল-হিলা এবং মাহমুদ আওয়াদ নামের দুই ফিলিস্তিনি চালককেও একইভাবে গুলি করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, তাদের কয়েক দিন আটকে রাখার পর ছেড়ে দেওয়া হয় এবং হাঁটা শুরু করতেই পেছন থেকে গুলি করা হয়। আইডিএফের দাবি, ট্রাক চালকদের রুটটির বিষয়ে সামরিক বাহিনীর সঙ্গে কোনো সমন্বয় করা হয়নি। তবে সংশ্লিষ্ট সমিতি এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। এর আগে গত মাসে একটি নির্ধারিত বিতরণ কেন্দ্র থেকে পানির ট্রাকে পানি নেওয়ার সময় ইউনিসেফের দুই চালককে গুলি করে হত্যা করে ইসরায়েলি সেনারা। আইডিএফ তখন ‘হুমকির মুখে’ গুলি চালানোর দাবি করেছিল। এ ছাড়া ২০২৪ সালের এপ্রিলে গাজার দক্ষিণে ইসরায়েলি বিমান হামলায় ডব্লিউসিকে-এর সাতজন কর্মী নিহত হয়েছিলেন। জিহাদ এসলেম বলেন, ‘চালকরা প্রতিদিন মারধর, অপমান এবং রোদে দাঁড়িয়ে থাকার মতো নির্যাতনের শিকার হন। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, আহমদকে গুলি করার পর ওই সেনা অন্য তিন চালককে হুমকি দিয়ে বলেন যে তাদের পরিণতিও আহমদের মতো হবে। এতে স্পষ্ট হয় যে হামলাটি পরিকল্পিত ছিল।’ তিনি আরও অভিযোগ করেন, সেনাসদস্য ও ব্যবসায়ীরা অনেক সময় চালকদের সিগারেটসহ বিভিন্ন নিষিদ্ধ পণ্য চোরাচালানের জন্য চাপ দেন। গত বুধবারও আনারসের ভেতরে লুকিয়ে সিগারেট পাচারের চেষ্টা করা হয়েছে। এসব বিপজ্জনক কর্মকাণ্ডের জন্য তিনি আইডিএফ-কে দায়ী করেন।

কেরেম শালম ক্রসিংয়ে কার্যক্রম স্থগিতের বিষয়ে আলোচনার জন্য পরিবহন কোম্পানি সমিতি শুক্রবার জরুরি বৈঠকে বসবে। জিহাদ এসলেম বলেন, ‘সবার এটি বোঝা অত্যন্ত জরুরি যে ফিলিস্তিনি ট্রাকচালকরাই হলেন ইসরায়েল এবং গাজার মধ্যে যোগাযোগের প্রথম মাধ্যম ও অন্যতম প্রধান যোগসূত্র। এই ভূমিকা পালন করা থেকে তাদের কোনোভাবেই বাধা দেওয়া উচিত নয়।’

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত