
দেখে মনে হবে এ যেন স্বল্প বাজেটের কোনো ভৌতিক সিনেমার চিত্রনাট্য-একটি জনপদ শত শত সাপের দখলে। কিন্তু চীনের দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় ১০ লাখ মানুষের শহর হেংঝৌতে বন্যার পানি সেই ভয়াবহ দৃশ্যকে বাস্তবে পরিণত করেছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, টাইফুন মেসাক আঘাত হানার পর সৃষ্ট বন্যায় সাপের খামার ভেসে গিয়ে প্রায় ৯০০টি সাপ লোকালয়ে ছড়িয়ে পড়েছে। এর মধ্যে অনেক সাপই বিষধর। এ পর্যন্ত বন্যায় ৩৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। সাপের কামড়ে একজন নারী মারা গেছেন। ধারণা করা হচ্ছে, তাকে একটি কোবরা কামড়েছিল। সাপটি সম্ভবত বন্যায় প্লাবিত এলাকার কোনো খামার থেকে ভেসে এসেছিল।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, এ ছাড়া আরও কয়েকজন সাপের কামড়ে আহত হয়েছেন। উদ্বিগ্ন বাসিন্দাদের প্রকাশ করা ভিডিওতে দেখা গেছে, সাপগুলো বন্যার পানির ওপর মাথা উঁচু করে রাস্তায় সাঁতার কাটছে। প্রথমে চীনা কর্তৃপক্ষ বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দেয়নি। তবে এখন তারা গ্রামবাসীকে এসব সাপ থেকে দূরে থাকতে সতর্ক করছে। একই সঙ্গে সাপ ধরার লোক মোতায়েন, সাপের বিষের প্রতিষেধকের মজুত বাড়ানো এবং সাপের কামড়ে আহত রোগীর সংখ্যা বেড়ে গেলে তা সামাল দিতে হাসপাতালের কর্মীদের প্রস্তুত করা হচ্ছে। তবে শুধু সাপই নয়, আরও অনেক প্রাণীও খাঁচা থেকে বেরিয়ে গেছে। অঞ্চলটির একটি চিড়িয়াখানা প্লাবিত হওয়ার পর দুটি জেব্রা, একটি কুঁজওয়ালা গরু, তিনটি ক্ষুদ্রাকৃতির ঘোড়া, দুটি গাধাসহ আরও কয়েকটি প্রাণী পালিয়ে যায়।
ব্যক্তিমালিকানাধীন গুইগাং চিড়িয়াখানা বুধবার রাতে জরুরি সতর্কতা জারি করে জানায়, পালিয়ে যাওয়া প্রাণীদের মধ্যে উটপাখি, ইমু ও র্যাকুন রয়েছে। ভয় পেলে এসব প্রাণী আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে পারে। প্রাণীগুলোকে কোথাও দেখা গেলে তা জানাতে সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম হংশিং নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে চিড়িয়াখানার মালিক ইন ফেইফেই বলেন, বন্যার পানি বাড়তে শুরু করলে কর্মীরা নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হিংস্র প্রাণীদের খাঁচা নিরাপদে বন্ধ করেন। তবে তিনটি সিংহ ডুবে মারা যায়। তিনি বলেন, ‘বন্যার সময় হিংস্র প্রাণীদের পালিয়ে গিয়ে জননিরাপত্তার জন্য অতিরিক্ত ঝুঁকি তৈরি করতে দেওয়া যেত না।’ চীনের স্থানীয় সংবাদমাধ্যম শাংইউ নিউজ জানিয়েছে, বন্যার পানিতে ১৬ হাজারের বেশি শূকরও ভেসে গেছে। অনলাইনে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, ভারী যন্ত্র দিয়ে বন্যার পানি থেকে শূকরগুলোকে তুলে আনা হচ্ছে।
জুঁই ফুলের জন্য যেমন পরিচিত, তেমনি সাপের জন্যও
হেংঝৌ গুয়াংজি অঞ্চলের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত। তুলনামূলক সমতল এই শহরটি পাহাড়বেষ্টিত এবং এর আশপাশে ৬৬০টিরও বেশি নদী রয়েছে। শহরটি চীনের ‘জুঁই ফুলের রাজধানী’ হিসেবে সবচেয়ে বেশি পরিচিত। প্রায় ৫০০ বছর ধরে এখানে চা তৈরিতে ব্যবহৃত সুগন্ধি জুঁই ফুলের চাষ হয়ে আসছে। তবে অঞ্চলটি শুধু চায়ের জন্যই বিখ্যাত নয়। গত কয়েক দশকে হেংঝৌ এবং পুরো গুয়াংসি অঞ্চল সাপের প্রজননের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। ভিয়েতনাম সীমান্তবর্তী এ অঞ্চলে ১০০টিরও বেশি প্রজাতির সাপের সন্ধান পাওয়া গেছে। এখানে বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ বসবাস করেন। স্থানীয়রা সাপের মাংসকে পুষ্টিকর খাবার মনে করেন এবং খাদ্যের জন্য সাপ ধরার দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য রয়েছে। গুয়াংজি সরকারের সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যম গুয়াংসি ডেইলির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০ সাল নাগাদ এ অঞ্চলে প্রায় দুই কোটি সাপ ছিল এবং ১৪ হাজারের বেশি সাপের প্রজনন খামার গড়ে উঠেছিল। বর্তমানে অধিকাংশ সাপ ওষুধ ও জৈব-চিকিৎসাবিষয়ক কাজে ব্যবহারের জন্য প্রজনন করা হয়। এ অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি পালন করা হয় কোবরা ও কমন র্যাট সাপ। কমন র্যাট সাপ বিষহীন হলেও কোবরার কামড় প্রাণঘাতী হতে পারে।
কর্তৃপক্ষ সতর্ক
হেংঝৌর জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি শিল্প হিসেবে পরিচিত সাপের প্রজনন এখন স্থানীয় কর্তৃপক্ষের জন্য বড় ধরনের সংকটে পরিণত হয়েছে। হেংঝৌর একটি বেসামরিক সাপ ধরার দলের সদস্য ঝু রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বেইজিং নিউজকে জানান, তাদের দলটি সাত থেকে আট সদস্যের। তারা টানা দুই দিন কাজ করেছে। এ সময় তারা মোট দুই হাজার থেকে তিন হাজার সাপ ধরেছে। এর মধ্যে বেশির ভাগই ছিল র্যাট সাপ। এই সংখ্যা আগে পালিয়ে যাওয়া সাপের যে হিসাব দেওয়া হয়েছিল, তার চেয়েও বেশি। ঝু বলেন, বন্যার পর সাপ সাধারণত বাড়ির কোণা বা অন্য কোনো আড়ালযুক্ত জায়গায় আশ্রয় নেয়। গ্রামবাসীরা সাপ দেখলে তাদের খবর দেন। এরপর ধরা সাপগুলো বিশেষজ্ঞদের কাছে হস্তান্তর করা হয়, যাতে সেগুলো আবার বনে ছেড়ে দেওয়া যায়। তিনি বলেন, ‘দুই দিনে আমরা দুই থেকে তিন হাজার সাপ ধরেছি। বলতে গেলে সবই ধরে ফেলেছি।’
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, একজন ব্যক্তি বন্যার পানিতে সাঁতার কাটা একটি সাপের পেছনে ছুটছেন। অন্যরা জাল নিয়ে সেটিকে ধরার জন্য প্রস্তুত ছিলেন। শেষ পর্যন্ত গোলাপি রঙের রেইনকোট পরা একজন ব্যক্তি সাপটির ওপর ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টা করেন। এরপর আরেক ব্যক্তি সেটিকে পানি থেকে ধরে ফেলেন। ভিডিওতে দেখা যায়, সাপ ধরার সময় উপস্থিত লোকজন চিৎকার করছেন এবং উত্তেজনায় হাসছেন। তবে কর্তৃপক্ষ সতর্ক করে বলেছে, সাপের কামড় প্রাণঘাতী হতে পারে। গ্রামবাসীরা বেইজিং নিউজকে জানান, সাপের কামড়ে মারা যাওয়া নারীকে সময়মতো চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয়নি। বন্যার কারণে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় দ্রুত কোথাও নেওয়া যায়নি। এর মধ্যেই বিষ শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় একজন রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমরা সাহায্য চেয়েছিলাম, কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল।’
স্থানীয় সরকার বাসিন্দাদের জন্য নির্দেশনা জারি করে। এতে রাতে অপ্রয়োজনে বাইরে না যাওয়া এবং ঘাসে ভরা জায়গা ও পুকুরের কাছ থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কারণ বন্যার পানি থেকে আশ্রয় ও খাবারের খোঁজে সাপগুলো এসব স্থানে আসতে পারে। রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়ার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘বেশির ভাগ সাপ ঠান্ডা ও স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ পছন্দ করে এবং বিনা উসকানিতে সাধারণত মানুষের ওপর আক্রমণ করে না।’ প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ‘তীব্র গন্ধযুক্ত পদার্থ সাপ দূরে রাখে। তাই বাড়ির প্রবেশপথে সাপ প্রতিরোধক গুঁড়া ছিটিয়ে রাখা যেতে পারে।’ এতে আরও বলা হয়, ‘বাইরে গেলে যেখানে সাপ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে, সেসব জায়গা এড়িয়ে চলা উচিত। প্রয়োজনে লাঠি দিয়ে ঝোপঝাড়ে আঘাত করে আশপাশে থাকা সাপ সরিয়ে দেওয়া যেতে পারে।’
সিনহুয়ার তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত পরিমাণ সাপের বিষের প্রতিষেধক মজুত রয়েছে। তবে আক্রান্ত ব্যক্তিকে সময়মতো প্রতিষেধক দিতে হবে। বন্যার পানি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করলেও শত শত সাপ আর কতদিন মানুষের জন্য হুমকি হয়ে থাকবে, তা এখনও অনিশ্চিত। একই সঙ্গে ঝুঁকি কমানোর জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক সাপ ধরা সম্ভব হবে কি না, সেটিও অনিশ্চিত।