ঢাকা সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬, ২৯ আষাঢ় ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

রাষ্ট্রায়ত্ত ৯ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা

রাষ্ট্রায়ত্ত ৯ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা

দেশের ৯টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়ে প্রায় ২ লাখ কোটি টাকায় ঠেকেছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ব্যাংকগুলোর ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো-সিআইবি ডেটাবেইজে গেল ৩১ মে পর্যন্ত পাঠানো তথ্যের ভিত্তিতে এ হিসাব করার কথা বলে বলেছেন তিনি। গতকাল রোববার স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশনে সংরক্ষিত নারী আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য সাবিকুন্নাহারের প্রশ্নের লিখিত জবাবে অর্থমন্ত্রী এ তথ্য দেন। সাবিকুন্নাহার রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের বর্তমান পরিমাণ এবং তা পুনরুদ্ধারে নেওয়া কার্যকর ব্যবস্থা সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলেন।

জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, অগ্রণী ব্যাংক পিএলসি, জনতা ব্যাংক পিএলসি, রূপালী ব্যাংক পিএলসি, সোনালী ব্যাংক পিএলসি, বেসিক ব্যাংক পিএলসি, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক পিএলসি, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক ও প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক- এই ৯টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ পরিমাণ দাঁড়িয়েছেন ১ লাখ ৮৮ হাজার ৭০১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। আমির খসরু বলেন, ‘ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে খেলাপি ঋণের উচ্চহার কমানো প্রয়োজন। বর্তমান সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারেও খেলাপি ঋণ কমানোর কথা বলা হয়েছে।’

অর্থমন্ত্রীর লিখিত জবাবে খেলাপি ঋণ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বিবরণ দেওয়া হয়। স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার মধ্যে ব্যাংকগুলোর জন্য শ্রেণিকৃত ঋণ নিষ্পত্তির কৌশলসংক্রান্ত নির্দেশিকা প্রণয়ন এবং আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ‘ক্রেডিট রিস্ক ম্যানেজমেন্ট’ গাইডলাইন হালনাগাদের কথা বলা হয়েছে। মধ্যমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ব্যাংকের আর্থিক বিবরণীর স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে ব্যাংক খাতে ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং স্ট্যান্ডার্ড-৯ বা আইএফআরএস-৯ বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। ব্যাংকের নিজস্ব মূল্যায়নের পাশাপাশি তালিকাভুক্ত জামানত মূল্যায়নকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ঋণের বিপরীতে রাখা জামানতের মূল্য নির্ধারণের উদ্যোগও রয়েছে। এ ছাড়া স্বল্পমেয়াদি কৃষিঋণ পুনঃতফসিলের নীতিমালা হালনাগাদ, শ্রেণিকৃত ঋণ আদায়ে কর্মকর্তাদের উৎসাহিত করতে বিশেষ ভাতা এবং নিয়মিত ঋণ পরিশোধকারী ভালো গ্রাহকদের প্রণোদনা দেওয়ার নীতিমালা পর্যালোচনার কথা জানিয়েছে সরকার। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় একজন ঋণগ্রহীতা পুরো ব্যাংক খাত থেকে সর্বোচ্চ কত টাকা ঋণ নিতে পারবেন, তার সীমা নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা জোরদারে আইনি সংস্কার, অর্থঋণ আদালতের বিচারক প্যানেল বা জুরি বোর্ডে অভিজ্ঞ ব্যাংকারদের অন্তর্ভুক্ত করা এবং রিট আবেদনের মাধ্যমে ঋণ আদায় কার্যক্রম স্থবির করার সুযোগ সীমিত করার পরিকল্পনাও রয়েছে। খেলাপি ঋণ কিনে তা আদায় বা ব্যবস্থাপনার জন্য বেসরকারি খাতে ‘অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি-এএমসি’ প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়নের কথাও লিখিত জবাবে বলা হয়েছে।

মূলধন ঘাটতি, তারল্য সংকট, দেউলিয়াত্ব বা ঝুঁকিতে পড়া ব্যাংকের কার্যকর ও সময়োপযোগী সমাধানের কাঠামো গড়ে তুলতে ‘ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬’ প্রণয়ন করা হয়েছে। ‘আমানত সুরক্ষা আইন, ২০২৬’ প্রণয়নের মাধ্যমে আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি জনআস্থা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার শীর্ষ পদে দক্ষ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক, বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন সংশোধনের কথাও বলা হয়েছে।

‘নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট’ আইন সংশোধনের মাধ্যমে চেক জালিয়াতি ও চেক প্রত্যাখ্যানের মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া সহজ ও কার্যকর করা হয়েছে বলে লিখিত জবাবে তুলে ধরা হয়।

প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকেও ‘ক্লিনিং প্রসেস’

এক সম্পূরক প্রশ্নে গাজীপুর-৪ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য সালাহ উদ্দিন আইউবী বলেন, প্রবাসীদের কল্যাণের জন্য প্রতিষ্ঠিত প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকে বিগত সরকারের সময়ে ‘তদবির, ঘুষ-বাণিজ্য ও সিন্ডিকেটের’ মাধ্যমে ঋণের নামে কোটি কোটি টাকা ‘লুটপাট’ করা হয়েছে। ব্যাংকটির প্রায় ৬১ শতাংশ ঋণ খেলাপি বলে দাবি করে তিনি অভিযোগ করেন, আগের সিন্ডিকেট ও তদবিরের মাধ্যমে এখনও বিভিন্ন জায়গায় ঋণ অনুমোদন ও বিতরণ করা হচ্ছে। এই সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া এবং আগের অনিয়ম তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, তা জানতে চান তিনি। জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, আর্থিক শৃঙ্খলা সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের একটি। এ ক্ষেত্রে সরকার কোনো আপস করবে না। শুধু একটি ব্যাংক নয়, আরও অনেক ব্যাংকে কী ঘটেছে, তা নিয়ে তদন্ত চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, এরই মধ্যে অনেকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পুরো আর্থিক খাতে একটি ‘ক্লিনিং প্রসেস’ চলছে মন্তব্য করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘দীর্ঘদিনের সমস্যার রাতারাতি সমাধান সম্ভব নয়। তবে এ প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে।’

‘ব্যাংক দখলের সুযোগ নেই’

কুড়িগ্রাম-২ আসনের এনসিপির সংসদ সদস্য আতিকুর রহমান মোজাহিদ রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক একটি সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে বলে অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, ব্যাংকটিতে অনেক খেলাপি ঋণ রয়েছে। আগে আওয়ামী লীগের সঙ্গে থাকা একটি গোষ্ঠী এখন বিএনপির পরিচয় ব্যবহার শুরু করেছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। ব্যাংকটিকে কৃষক ও সাধারণ মানুষের জন্য আরও কার্যকর করতে সরকার তদন্ত বা অন্য কোনো ব্যবস্থা নেবে কি না, তা জানতে চান আতিকুর। জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আওয়ামী লীগের পরিবর্তে বিএনপি কোনো ব্যাংক দখল করবে, এমন সুযোগ বর্তমান সরকারের অধীনে নেই।’ ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিকভাবে কাউকে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে না তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘এটি সরকারের সচেতন সিদ্ধান্ত।’ রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক ছাড়াও আরও কয়েকটি ব্যাংকে সমস্যা রয়েছে তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, এসব ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। পর্যালোচনা শেষে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন দেখা যাবে।

সরকারের ঋণ ২২ লাখ ৬ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা

জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য গোলাম রছুলের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, গত ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ ২২ লাখ ৬ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা। এর মধ্যে বৈদেশিক ঋণ ৯ লাখ ৫৯ হাজার ৩১১ কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ ঋণ ১২ লাখ ৪৭ হাজার ১৫১ কোটি টাকা।

নতুন উদ্যোক্তাদের বিনা জামানতে ১০ লাখ টাকা ঋণ

জামায়াতের সংসদ সদস্য মাহবুবুল আলমের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, তরুণদের সহজ শর্তে ঋণ দিতে কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি খাতের নতুন উদ্যোক্তাদের পুনঃঅর্থায়ন তহবিল ১০০ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০০ কোটি টাকা করা হয়েছে। এই তহবিল থেকে নতুন উদ্যোক্তারা বিনা জামানতে সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ সুদে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারবেন। জামানত দিলে ঋণের সর্বোচ্চ সীমা হবে ৩৫ লাখ টাকা।

বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নের পাইপলাইন

কুমিল্লা-৯ আসনের সংসদ সদস্য আবুল কালামের প্রশ্নের জবাবে আমির খসরু বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নের পাইপলাইন তৈরির প্রক্রিয়া চলছে। এ বিষয়ে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের আলোচনা হচ্ছে। আগামী অর্থবছরে বাজেট সহায়তার প্রয়োজনীয়তা ও লক্ষ্যমাত্রা সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে পর্যালোচনার ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হবে। বাজেট সহায়তার অর্থ কোন খাতে ব্যয় হবে, তা প্রয়োজন অনুযায়ী সরকার ঠিক করবে।

ভারতের ঋণে সাত প্রকল্প চলমান

রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান বেলালের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, ভারতের সঙ্গে সই হওয়া তিনটি লাইন অব ক্রেডিট ঋণচুক্তির আওতায় বর্তমানে সাতটি প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত