
দেশের পোশাক ও টেক্সটাইল খাতে একদিকে কারখানা বন্ধ ও শ্রমিক ছাঁটাই বাড়ছে, অন্যদিকে নতুন বিনিয়োগ ও উৎপাদন সম্প্রসারণের উদ্যোগও দেখা যাচ্ছে। বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলো আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন, ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ এবং উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে নিজস্ব মূলধন নিয়ে বাজারে প্রবেশ করছেন নতুন উদ্যোক্তারাও।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, এই বিপরীতমুখী পরিস্থিতি পোশাকশিল্পে গভীর একটি পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ঋণনির্ভর ও তুলনামূলক দুর্বল কারখানাগুলো বাজার থেকে ছিটকে পড়লেও প্রযুক্তিনির্ভর, বহুমুখী ও বেশি উৎপাদনক্ষম প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছে। ফলে দেশের প্রধান রপ্তানি খাতটি বর্তমানে বড় ধরনের কাঠামোগত পুনর্বিন্যাসের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও বিটিএমএর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত পোশাক, নিটওয়্যার, টেক্সটাইল ও অ্যাকসেসরিজ খাতে শতাধিক কারখানা বন্ধ হয়েছে। কার্যাদেশ কমে যাওয়ায় আরও অন্তত ৫০টি কারখানায় বড় ধরনের শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার মানুষ চাকরি হারিয়েছেন।
তবে একই সময়ে প্রায় ৭০টি নতুন কারখানা উৎপাদনে এসেছে অথবা চালুর অপেক্ষায় রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে এরইমধ্যে কর্মসংস্থান হয়েছে এবং পুরোপুরি চালু হলে প্রায় ৬০ হাজার মানুষের কাজের সুযোগ তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ নতুন বিনিয়োগ এলেও তা বন্ধ হওয়া কারখানার কর্মসংস্থান ঘাটতি পূরণ করতে পারছে না। তাহলে এত কারখানা বন্ধ হওয়ার পরও নতুন উদ্যোক্তারা কেন বিনিয়োগ করছেন?
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারের সাম্প্রতিক কিছু নীতিগত সিদ্ধান্ত বিনিয়োগকারীদের কাছে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। বন্ধ পোশাক ও টেক্সটাইল কারখানা পুনরায় চালু করতে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠনের ঘোষণা এসেছে। স্থানীয় সুতা ব্যবহার করে পোশাক রপ্তানিতে নগদ সহায়তা ১ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। কয়েকটি খাতে দেওয়া হয়েছে করসুবিধাও।
তবে নতুন বিনিয়োগের বড় অংশ আগের মতো শুধু পোশাক সেলাইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। উদ্যোক্তারা এখন সুতা, কৃত্রিম তন্তু, অন্তর্বাস, পকেটিং এবং উচ্চমূল্যের অ্যাকসেসরিজ উৎপাদনে গুরুত্ব দিচ্ছেন। এতে আমদানিনির্ভরতা কমবে, ডলার সাশ্রয় হবে এবং বিদেশি ক্রেতার কাছে পণ্য সরবরাহের সময়ও কমে আসবে।
এনভয় গ্রুপ সুতা ও ম্যান-মেইড ফাইবারের দুটি নতুন ইউনিটে বিনিয়োগ করছে। হা-মীম গ্রুপ চীনা অংশীদারের সঙ্গে নরসিংদীতে বড় অ্যাকসেসরিজ কারখানা চালু করেছে। ডিবিএল গ্রুপও অন্তর্বাস ও অ্যাকসেসরিজ খাতে নতুন বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে।
নতুন উদ্যোক্তাদের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, তাঁরা ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা কমাচ্ছেন। প্রায় ১৫ শতাংশ সুদে ঋণ নিয়ে এমন ব্যবসায় টিকে থাকা কঠিন বলে অনেকেই নিজস্ব সঞ্চয়, পারিবারিক অর্থায়ন ও অংশীদারদের মূলধন ব্যবহার করছেন।
তবে ঘোষিত নীতির সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। তহবিলের অর্থ প্রকৃত উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছানো, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা এবং উচ্চ সুদ কমানো না গেলে বিনিয়োগের বর্তমান আস্থা দীর্ঘস্থায়ী হবে না।
পোশাক খাতে তাই আশার সংকেত আছে, কিন্তু এখনই পুনরুদ্ধারের ঘোষণা দেওয়ার সুযোগ নেই। পুরোনো ও দুর্বল কারখানার জায়গায় প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠান আসছে। এই পরিবর্তন কতটা উৎপাদন, রপ্তানি ও স্থায়ী কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে, সেটিই হবে সরকারের নীতির আসল পরীক্ষা।