ঢাকা মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৪ ভাদ্র ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

সুসংবাদ প্রতিদিন

মালচিং পদ্ধতিতে সবজি চাষে লাভবান কৃষক

মালচিং পদ্ধতিতে সবজি চাষে লাভবান কৃষক

কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলায় আধুনিক কৃষির এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। চোখ জুড়ানো সবুজ আর বাহারি সবজির নান্দনিক সমারোহে এখন হাসছে এ অঞ্চলের মাঠের পর মাঠ। চান্দিনার হারং, ছায়কোট, বড় গোবিন্দপুর এবং পিহরসহ বিভিন্ন প্রত্যন্ত এলাকার বিস্তীর্ণ জমিতে আধুনিক মালচিং পদ্ধতিতে শুরু হয়েছে ব্যাপক সবজি চাষ। শীত কিংবা বর্ষা, যেকোনো পরিবর্তনশীল ঋতুতেই পুষ্টিকর, নিরাপদ ও উন্নত মানের সবজি উৎপাদনে এই বিশেষ প্রযুক্তিটি স্থানীয় কৃষকদের মাঝে এক অভাবনীয় আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। প্রথাগত চাষাবাদের নানামুখী সংকট ও অনিশ্চয়তা পেরিয়ে এখন শসা, টমেটো, লাউসহ হরেক রকমের শাকসবজি সাফল্যের সাথে ফলিয়ে নিজেদের অর্থনৈতিক চিত্র বদলে ফেলছেন এ অঞ্চলের শত শত কৃষক।

একসময় আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা এবং প্রকৃতির খেয়ালিপনার ওপর নির্ভর করে চাষাবাদ করতে গিয়ে চান্দিনার কৃষকদের প্রায়শই চরম লোকসানের মুখে পড়তে হতো। বিশেষ করে অনাকাঙ্ক্ষিত অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত, দীর্ঘমেয়াদি খরা কিংবা ক্ষতিকর আগাছার উপদ্রবে এক ঋতুতেই নষ্ট হয়ে যেত হাজার হাজার টাকার ফসল। কিন্তু সময়ের দাবিতে বিজ্ঞানের ছোঁয়ায় বদলাতে শুরু করেছে সেই পুরনো দৃশ্যপট। চান্দিনার দূরদর্শী কৃষকরা এখন জমি প্রস্তুত করার একদম প্রাথমিক ধাপেই আধুনিক প্রযুক্তির নিবিড় ছোঁয়া নিচ্ছেন। প্রথমেই জমি ভালো করে চাষ দিয়ে তৈরি করা হয় উঁচু উঁচু বেড বা ফাঁড়ি। মাটির স্বাস্থ্য নিশ্চিত করার এই বিশেষ দিনটিতেই জমিতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের জৈব ও উন্নত রাসায়নিক সার একবারে সুষম অনুপাতে মিশিয়ে দেওয়া হয়। এর ফলে পরবর্তী দিনগুলোতে গাছের বেড়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় আর আলাদা করে ঘন ঘন সার দেওয়ার বাড়তি ঝামেলা থাকে না।

জমির ফাঁড়িগুলো সঠিকভাবে তৈরির পরপরই শুরু হয় মালচিং পদ্ধতির মূল ও আকর্ষণীয় কাজ। এক বিশেষ ধরনের স্থায়িত্বশীল পলি পেপার বা বিশেষ প্লাস্টিক শিট দিয়ে পুরো মাটির ফাঁড়িগুলোকে খুব নিখুঁতভাবে ঢেকে দেওয়া হয়, যেন মাটির উপরিভাগ পুরোপুরি পলিথিনের একটি সুরক্ষাকবচে মুড়ে থাকে। এরপর বৈজ্ঞানিক পরিমাপ অনুযায়ী নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে সেই পলি পেপারের ওপর ছোট ছোট ছিদ্র করা হয়। ওই ছিদ্রযুক্ত নির্দিষ্ট স্থানগুলোতে পরম যত্নে রোপণ করা হয় শসা, টমেটো কিংবা লাউয়ের মতো নানাজাতের উচ্চফলনশীল সবজির সতেজ চারা। মাটির উর্বরতা আর পলি পেপারের সুরক্ষা বলয় ভেদ করে অল্প দিনেই ডালপালা মেলে তরতর করে বড় হতে থাকে কচি গাছগুলো।

আধুনিক এই মালচিং প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে কৃষকরা যে ধরনের বহুমাত্রিক সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন, তা প্রচলিত চাষাবাদে কল্পনাও করা যেত না। স্থানীয় উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা এবং দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এই পদ্ধতির সবচেয়ে বড় বৈপ্লবিক দিক হলো জমিতে কোনোপ্রকার ক্ষতিকর আগাছা জন্মাতে পারে না। প্লাস্টিকের চাদর দিয়ে মাটি শক্তভাবে ঢাকা থাকায় সূর্যের আলো ও বাতাস না পেয়ে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত নিড়ানি বা আগাছা গজানোর সুযোগই পায় না। ফলে নিড়ানি দেওয়ার পেছনে কৃষকের যে বিশাল অঙ্কের শ্রম ও অর্থের অপচয় হতো, তা একবারে শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। পাশাপাশি এই প্লাস্টিক শিট মাটির ভেতরে থাকা স্বাভাবিক রস ও আর্দ্রতা দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখতে সাহায্য করে। এর ফলে খরার দিনেও জমিতে বারবার সেচ দেওয়ার কোনো তীব্র প্রয়োজন পড়ে না, যা সেচ খরচ ও পানির অপচয় দুটোই চমৎকারভাবে কমিয়ে দেয়।

বিশেষ করে বর্ষাকালের মতো দুর্যোগপূর্ণ সময়ে, যখন চিরাচরিত উপায়ে রোপণ করা অন্যান্য এলাকার সবজি খেত পানিতে ধুয়েমুছে যায় কিংবা অতিবৃষ্টির পানিতে চারা পচে ধস নামার সম্ভাবনা থাকে, তখন চান্দিনার এই মালচিং খেতগুলো থাকে একদম অক্ষত ও সম্পূর্ণ নিরাপদ। নিবিড় পলি পেপারে মাটি আবৃত থাকার কারণে মুষলধারে প্রবল বৃষ্টি বা মেঘের বর্ষণেও চারা গাছের গোড়ার মাটি ধুয়ে ধসে যায় না। ফলে বর্ষাকালে চারা গাছ পচে নষ্ট হওয়া কিংবা গোড়া আলগা হয়ে গাছ মরে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে না বললেই চলে। আবহাওয়ার যেকোনো প্রতিকূল পরিবেশেও সবজি গাছগুলো থাকে সতেজ, সবুজ ও প্রাণবন্ত, যা পর্যায়ক্রমে বাজারের জন্য উৎকৃষ্ট মানের ও মাশরুমমুক্ত সতেজ ফসল উপহার দেয়। কৃষিব্যবস্থার এই আধুনিকায়নে চাষাবাদ করে চান্দিনার কৃষকদের সামগ্রিক উৎপাদন খরচ আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে।

একদিকে সার ও সেচের অপচয় পুরোপুরি বন্ধ হয়েছে, অন্যদিকে শ্রমিকের অতিরিক্ত মজুরি বাবদ বড় অঙ্কের টাকা বেঁচে যাচ্ছে। তুলনামূলক অনেক কম পুঁজিতে চাষাবাদ শুরু করে কৃষকরা এখন পাচ্ছেন দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ লাভ। চান্দিনার মাঠজুড়ে ছড়িয়ে পড়া মালচিং পদ্ধতির এই জয়জয়কার কেবল আঞ্চলিক কৃষিচিত্রকেই বদলে দেয়নি, বরং স্থানীয় বহু কর্মহীন মানুষকে স্বাবলম্বী হওয়ার নতুন পথ দেখিয়েছে। কম খরচে অধিক ফসল ও নিশ্চিত লাভের এই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত দেখে এখন আশপাশের অন্যান্য এলাকার সাধারণ কৃষকরাও বিপুল উৎসাহে প্রযুক্তিনির্ভর এই আধুনিক সবজি চাষে ঝুঁকছেন।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত