
এনসিপির ভেতরে একটি অনানুষ্ঠানিক হিসাব ঘুরছে। ঢাকা দক্ষিণে আসিফ মাহমুদ যদি ইসলামী আন্দোলন ও খেলাফত মজলিসের সমর্থন পান, আর উত্তর সিটিতে মামুনুল হককে এনসিপি ও ইসলামী আন্দোলন ছেড়ে দেয়, তাহলে জামায়াত জোটের বাইরে একটি বিকল্প কাঠামো দাঁড়াতে পারে। তবে এ ধরনের আলোচনা এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক পর্যায়ে পৌঁছায়নি। জোটের একটি দল আগেই প্রার্থী ঘোষণা করে বসে আছে, আরেক দল সেই একই আসনে নিজের প্রার্থী চূড়ান্ত করে নিয়েছে। মাঝখানে আটকে পড়েছে দুই দলের জোট রাজনীতির ভবিষ্যৎ। জামায়াতে ইসলামী গত ২২ জুন তাদের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের বৈঠকে ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েমকে ঢাকা দক্ষিণে মেয়র প্রার্থী হিসেবে প্রাথমিকভাবে চূড়ান্ত করে।
এর আগেই গত ২৯ মার্চ জামায়াতের জোটসঙ্গী জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) একই আসনে তাদের প্রার্থী হিসেবে সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়ার নাম ঘোষণা করে রেখেছিল। ফলে একই ময়দানে এখন এক জোটের দুজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে যাচ্ছেন।
সাদিক কায়েম ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের ভিপি নির্বাচিত হন ইসলামী ছাত্রশিবিরের ব্যানারে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি জামায়াতের বেশ কয়েকজন প্রার্থীর প্রচারণায় অংশ নেন। জামায়াতের মেয়র প্রার্থী হিসেবে নাম চূড়ান্তের পরপরই ১৩ জুলাই তিনি ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক সম্পাদকের দায়িত্ব ছেড়ে দেন। নির্বাচনি প্রস্তুতির অংশ হিসেবেই এ সিদ্ধান্ত, জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
আসিফ মাহমুদের গল্পটা একটু ভিন্ন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম মুখ হিসেবে তিনি অন্তর্বর্তী সরকারে উপদেষ্টার পদ পান। নির্বাচনে অংশ নেওয়ার লক্ষ্যে গত বছরের ২৯ ডিসেম্বর পদত্যাগ করে এনসিপিতে যোগ দেন এবং দলের মুখপাত্র হন।
ঢাকা-১০ সংসদীয় আসন থেকে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণাও দিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর মাঠে নামেননি। এনসিপির এক শীর্ষ নেতা জানিয়েছেন, তখনও জামায়াতের আপত্তি ছিল। উপদেষ্টা থাকাকালীন আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের কারণে দলটি তাকে সমর্থন দিতে রাজি হয়নি।
এবার সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনেও সেই একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি হচ্ছে বলে মনে করছেন এনসিপির ভেতরের মানুষজন। দলের রাজনৈতিক পর্ষদের এক সদস্য বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারে দায়িত্ব পালনের সময় জামায়াতের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কিছু বিষয়ে আসিফ মাহমুদের ভূমিকা নেতিবাচক ছিল বলে দলটির অভিযোগ। তবে সেই বিষয়গুলো ঠিক কী, তা বলতে চাননি কেউ।
পরিস্থিতি এখন যেদিকে যাচ্ছে, তাতে আসিফ মাহমুদের সামনে কয়েকটি পথ খোলা আছে। তিনি নিজেই ইঙ্গিত দিয়েছেন, জামায়াত জোটের বাইরে অন্য একটি সমঝোতার সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছেন না। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হকের সঙ্গে তার সম্পর্ক যে ভালো, তা নিজেই স্বীকার করেছেন।
মামুনুল হকের দল এখন একদিকে জামায়াতের ১১-দলীয় ঐক্যে আছে, অন্যদিকে হেফাজতে ইসলামের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত আলাদা কওমি বৈঠকেও সক্রিয়। এই দ্বৈত অবস্থান ভবিষ্যতের নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এনসিপির ভেতরে একটি অনানুষ্ঠানিক হিসাব ঘুরছে। ঢাকা দক্ষিণে আসিফ মাহমুদ যদি ইসলামী আন্দোলন ও খেলাফত মজলিসের সমর্থন পান, আর উত্তর সিটিতে মামুনুল হককে এনসিপি ও ইসলামী আন্দোলন ছেড়ে দেয়, তাহলে জামায়াত জোটের বাইরে একটি বিকল্প কাঠামো দাঁড়াতে পারে। তবে এ ধরনের আলোচনা এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
এনসিপি আপাতত একক প্রস্তুতিতে মনোযোগী। দলটি এরইমধ্যে পাঁচ সিটিতে মেয়র প্রার্থী এবং ১০০টি উপজেলা-পৌরসভায় দলীয় প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে। আসিফ মাহমুদ চাইছেন, এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এনসিপি অন্তত ৭০ শতাংশ জায়গায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করুক। সংসদ নির্বাচনে মাত্র ৩০টি আসনে ভোট করে তৃণমূল যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা তিনি আর চাইছেন না।
সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের তফসিল এখনও ঘোষণা হয়নি, বছরের শেষ দিকে হওয়ার পরিকল্পনা আছে। এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব বলেছেন, তফসিল ঘোষণার আগে বা পরে জাতীয়ভাবে যদি মনে হয় যে বিরোধী দলের প্রার্থীরা সমঝোতা ছাড়া জিততে পারবেন না, তখনই হয়তো দলগুলো এক টেবিলে বসবে। ততদিন পর্যন্ত প্রত্যেক দল নিজের সাংগঠনিক শক্তি বাড়ানোয় মনোযোগ দিচ্ছে। ঢাকা দক্ষিণে আসিফ মাহমুদ শেষ পর্যন্ত কোন পথে হাঁটবেন, সে উত্তর এখনও সময়ের হাতে।