
পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন বাহিনীর ওপর আকস্মিক হামলার চেষ্টার প্রতিশোধ হিসেবে ইরানে বিরুদ্ধে ‘বড় ধরনের’ হামলা শুরু করার কথা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী।
সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক্স পোস্টে বলেছে, গত মঙ্গলবার জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটি এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজের দিকে ইরানের গোলাবর্ষণের প্রতিক্রিয়ায় এ হামলা ছিল ‘শক্তিশালী জবাব’।
বিবিসি লিখেছে, ইরাকে ইরানি মিত্রদের লক্ষ্য করে প্রথমবারের মতো যৌথ হামলার কথা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব। এর মাধ্যমে যুদ্ধ আরও বিস্তৃতি পেল।
ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যখন ইরানে হামলা চালায়, তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, এ অভিযান ‘মাত্র কয়েক সপ্তাহ’ স্থায়ী হবে। কিন্তু পাঁচ মাস ধরে যুদ্ধ চলার পরও এর শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে বুধবার অ্যাক্সিওস লিখেছে, ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমান বলেছেন, সৌদি আরব উত্তেজনা কমাতে চায়। বিবিসি লিখেছে, কূটনৈতিক উপায়ে সমাধানের আশায় উভয় পক্ষই কয়েকদিন হামলা বন্ধ রেখেছিল। এরপর ট্রাম্প ‘খুবই বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনা’ হওয়ার কথা বললেও তেহরান কোনো ধরনের আলোচনা চলার কথা অস্বীকার করে।
গত বুধবার নতুন হামলার ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা আগে ট্রাম্প মার্কিন সেনাদলের ওপর আগের দিনের ইরানি হামলা চেষ্টার বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হোয়াইট হাউজে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা তাদের ওপর খুব জোরালো আঘাত হানতে যাচ্ছি, কারণ এবার তাদের ওপর আমাদের আঘাত করার পালা।’
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, তারা ‘শিশু হত্যাকারী আমেরিকান বাহিনীর আগ্রাসনের জবাবে’ জর্ডানে একটি মার্কিন বিমানঘাঁটি এবং একটি কমান্ড সেন্টারে হামলা চালিয়েছে। তারা এও জানিয়েছে, নৌবাহিনী হরমুজ প্রণালিতে তিনটি তেলবাহী ট্যাঙ্কারে আঘাত করেছে।
এসব নৌযান সতর্কবাতা ‘উপেক্ষা’ করে গুরুত্বপূর্ণ উপসাগরীয় জলপথটির ‘অনিরাপদ এবং অবৈধ পথ’ দিয়ে যাত্রা করেছিল বলে আইআরজিসির ভাষ্য।
টানা ১৩ রাত ধরে ইরানে তীব্র বোমা হামলা গত শুক্রবার সাময়িকভাবে স্থগিত করেন ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছিল, তারা ইরানের অস্ত্র ও সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। এতে বহু মানুষের মৃত্যুর খবরও এসেছে।
সেন্টকম মঙ্গলবার জানায়, আগের ৭২ ঘণ্টায় আইআরজিসি পরিচালিত ৩০টির বেশি ড্রোন হামলার জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব যৌথভাবে পূর্ব ইরাক জুড়ে ‘সন্ত্রাসীদের রসদ ও অস্ত্রের ঘাঁটিতে’ আঘাত হেনেছে।
ইরান-সমর্থিত শিয়া মিলিশিয়া নিয়ন্ত্রিত ইরাকের আধা-সামরিক বাহিনী ‘পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস’ পিএমএফ বলেছে, তাদের ঘাঁটিতে মার্কিন-সৌদি হামলায় অন্তত ২০ সদস্য নিহত হয়েছেন।
ইরাকি প্রেসিডেন্টের দপ্তর পিএমএফ ঘাঁটিতে বোমাবর্ষণের নিন্দা জানিয়ে একে ‘অগ্রহণযোগ্য হামলা এবং ইরাকের সার্বভৌমত্বের চরম লঙ্ঘন’ বলেছে।
তবে ট্রাম্প ফক্স নিউজকে বলেছেন, ‘ইরাক সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করেই’ হামলাগুলো চালানো হয়েছিল।
মিসরের বন্দরে মার্কিন ট্যাংকারে ভয়াবহ হামলা: মিসরের ভূমধ্যসাগরীয় একটি বন্দরে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। দেশটির দামিয়েত্তা বন্দরে থাকা একটি মার্কিন মালিকানাধীন ট্যাংকারে বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে।
সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা অ্যামব্রে জানিয়েছে, গত বুধবার মিসরের ভূমধ্যসাগরীয় বন্দর দামিয়েত্তায় একটি মার্কিন মালিকানাধীন ট্যাংকারে ড্রোন হামলা হয়েছে। খবর বার্তা সংস্থা রয়টার্সের। বন্দরে সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ইঞ্চকেপ এক পৃথক বার্তায় জানিয়েছে, দামিয়েত্তায় দুটি গ্যাসবাহী ট্যাংকারে আগুন লেগেছে।
সংশ্লিষ্ট তিনটি বাণিজ্যিক সূত্র জানিয়েছে, ড্রোনগুলো ভাসমান তেলবাহী ট্যাংকার ‘এনার্গোস উইন্টারে’ আঘাত হানে। এতে ট্যাংকারটিতে আগুন ধরে যায়।
পরে আগুন ‘গ্যাসলগ সালেম’ নামের আরেকটি জাহাজে ছড়িয়ে পড়ে। ড্রোন হামলার ফলেই এ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে।
অ্যামব্রে জানিয়েছে, বিস্ফোরণের পর কর্মীদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। তবে এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষ দায় স্বীকার করেনি।
এদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন থাকা মার্কিন বাহিনীকে লক্ষ্য করে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর একাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর কঠোর জবাব দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
গত বুধবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজ-কে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, তেহরানকে এর জন্য চরম মূল্য দিতে হবে।
জর্ডানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ইরানের হামলার পর ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, আমরা তাদের ভয়াবহভাবে আঘাত করব। আমরা তাদের ওপর প্রচণ্ড হামলা চালাব। তারা এর কঠিন মূল্য দেবে।
জর্ডানে ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার আগেই মাঝআকাশে ভূপাতিত করা হয়েছে বলে দাবি করেছে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড। ওই দাবির পরপরই ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের বিষয়ে কড়া সতর্কবার্তা দেন ট্রাম্প।
ইরানের ওই ক্ষেপণাস্ত্র হামলাকে ট্রাম্প ‘আকস্মিক হামলা’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলো জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিতে পৌঁছানোর আগে প্রতিক্রিয়া জানানোর জন্য মার্কিন সেনাদের হাতে মাত্র কয়েক মিনিট সময় ছিল।
এদিকে, গত বুধবার মধ্য রাত থেকে ইরানজুড়ে নতুন করে বিমান হামলা চালানো শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এতে এক শিশুসহ ইরানের ৩ নাগরিক নিহত হয়েছেন।
যুদ্ধ এড়াতে চাওয়া সৌদি আরব এখন ত্রিমুখী হামলার শিকার: ইরানের ড্রোন হামলার পরও যোগাযোগের পথ খোলা রেখে বিগত পাঁচ মাস ধরে আঞ্চলিক যুদ্ধ এড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছিল সৌদি আরব। তবে দেশটি এখন চারপাশ থেকে শত্রু পরিবেষ্টিত হয়ে পড়েছে। ইরান ছাড়াও ইয়েমেনের হুথি এবং ইরাকের ইরানপন্থি মিলিশিয়াদের অব্যাহত হামলায় শেষ পর্যন্ত নীরবতা ভাঙতে বাধ্য হলো রিয়াদ। মঙ্গলবার ভোরে মার্কিন বাহিনীর সঙ্গে যৌথভাবে ইরাকের পূর্বাঞ্চলে আকাশপথে হামলা চালিয়েছে সৌদি যুদ্ধবিমান।
ইয়েমেনের হুথিরা লোহিত সাগর উপকূলে সৌদির তেল স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়ে নৌ-অবরোধের ঘোষণা দিয়েছে। এতে ইয়াঙ্কু বন্দর হয়ে এশিয়ায় জ্বালানি রপ্তানির পরিকল্পনা বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়েছে। রিয়াদ অতীতে ৭ বছর হুথিদের সঙ্গে যুদ্ধ করে ব্যর্থ হয়েছিল এবং ২০২২ সালে একটি যুদ্ধবিরতি হলেও স্থায়ী শান্তি আসেনি।
বিশ্লেষকদের মতে, হুথিরা উত্তর কোরিয়ার মতো উসকানিমূলক পথ ধরে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা আদায়ের নীতি অনুসরণ করছে। তবে সৌদি বিমান বাহিনী আগের চেয়ে অনেক বেশি সজ্জিত হলেও ৩ লাখের বেশি সরকারি কর্মচারীর বেতন জোগাতে হুথিদের অর্থ দিয়ে বশ করার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
অন্যদিকে সোমবার ও মঙ্গলবার ইরাকভিত্তিক মিলিশিয়ারা রিয়াদসহ সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে একের পর এক ড্রোন হামলা চালায়। জবাবে রিয়াদ ধৈর্য হারিয়ে ইরাকের পূর্বাঞ্চলে হামলা চালিয়েছে, যাতে কয়েকজন হতাহত হওয়ার কথা জানিয়েছে ইরাকি পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস।
মার্কিন সেনাবাহিনীর সেন্টকম এই যৌথ পদক্ষেপকে ইরানের আইআরজিসি দ্বারা পরিচালিত ৩০টিরও বেশি ড্রোন হামলার জোরালো জবাব বলে উল্লেখ করেছে। এর আগে ২০১৯ সালে আবকাইক তেল শোধাগারে ভয়াবহ হামলার ঘটনা রিয়াদ ভুলে যায়নি।