ঢাকা মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২৬, ২৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

সুসংবাদ প্রতিদিন

চান্দিনায় মাছ চাষে নীরব বিপ্লব

চান্দিনায় মাছ চাষে নীরব বিপ্লব

মাছ চাষে চান্দিনা উপজেলায় ঘটেছে এক বিস্ময়কর অগ্রগতি। কোনো ধরনের ঢাকঢোল ছাড়া নীরব এক বিপ্লবের মধ্য দিয়ে এ অঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতিতে এসেছে অভাবনীয় পরিবর্তন। একসময় যেখানে কেবল ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে পুকুরে কিংবা প্রাকৃতিক জলাশয়ে কিছু মাছ ধরা হতো, সেখানে আজ চান্দিনা রূপান্তরিত হয়েছে দেশের অন্যতম ব্যস্ত ও সম্ভাবনাময় মৎস্য উৎপাদন হাবে। এই ইতিবাচক পরিবর্তন শুধু চান্দিনার ভৌগোলিক মানচিত্রেই নয়, বরং সেখানকার সাধারণ মানুষের চিন্তা-চেতনায় এবং সামগ্রিক জীবনযাত্রায় এক বৈপ্লবিক রূপান্তর এনে দিয়েছে।

চান্দিনা উপজেলার এমন কোনো গ্রাম খুঁজে পাওয়া দুষ্কর, যেখানে পেশাদার বা উদীয়মান মাছ চাষীর দেখা মিলবে না। নতুন নতুন উদ্যোক্তারা যে সাফল্যের গল্প লিখছেন, তা দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রতিদিন আরও অনেকে নামছেন এ ব্যবসায়। প্রথমদিকে দু-একজন সাহসী উদ্যোক্তার সফলতা চোখে পড়েছিল সাধারণ মানুষের। তা দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে গ্রামের সাধারণ চাষি থেকে শুরু করে শিক্ষিত যুবকরাও ঝোঁপ বুঝে কোপ মারার মতো এতে জড়িয়ে পড়েন। বর্তমানে ধান চাষের চেয়ে মৎস্য চাষ তুলনামূলকভাবে বেশি লাভজনক প্রমাণিত হওয়ায় গ্রামীণ ভূদৃশ্যেও এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। ফসলি জমির উর্বর মাটি কেটে চারপাশে উঁচু ও মজবুত আইল বেঁধে রূপান্তর করা হচ্ছে বাণিজ্যিক মৎস্য খামারে। শত শত কৃত্রিম জলাশয় ও খামার এখন পুরো উপজেলার আনাচে-কানাচে, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে।

এই মৎস্য বিপ্লবের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তের নামিদামি মৎস্য হ্যাচারিগুলো। স্থানীয় চাষিরা আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি আয়ত্ত করে এসব গুণগত মানসম্পন্ন হ্যাচারি থেকে রুই, কাতলা, মৃগেল, পাঙ্গাস, তেলাপিয়া এবং পাবদাসহ নানাজাতের পোনা সংগ্রহ করছেন। সঠিক পরিচর্যা, উন্নতমানের খাবার সরবরাহ এবং উপযুক্ত জলাশয় ব্যবস্থাপনার কারণে কম সময়ে মিলছে আশানুরূপ ফলন।

চান্দিনার এই মৎস্য বিপ্লব শুধু জলাশয়ের চারদেওয়ালেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, ছড়িয়ে পড়েছে বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানের সুবিশাল বিস্তৃত ক্ষেত্রে। চাষিদের কঠোর শ্রমে উৎপাদিত বিপুল পরিমাণ মাছ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দেওয়ার জন্য একটি শক্তিশালী মধ্যস্থতাকারী নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। ফলে এখানে সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য মাছের বেপারী ও আড়তদার। ভোর হতেই চান্দিনার বিভিন্ন মোড়, বাজার ও খামারসংলগ্ন এলাকাগুলোতে শুরু হয় কর্মমুখর ব্যস্ততা। চাষি, বেপারী এবং আড়তদারদের হাত ধরে গড়ে উঠেছে এক বিশাল বাণিজ্যিক চক্র।

এই মৎস্যকেন্দ্রিক অর্থনীতির কারণে সৃষ্টি হয়েছে হাজার হাজার বেকার মানুষের কর্মসংস্থান। সরাসরি মাছ চাষের পাশাপাশি মাছ ধরা, জালের ব্যবস্থাপনা, খাবার পরিবহন, প্যাকেজিং এবং ট্রাকে মাছ লোড-আনলোডের মতো নানা আনুষঙ্গিক কাজে যুক্ত হয়ে অসংখ্য পরিবার আজ অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী। স্থানীয় মাছের বেপারী আবুল কালামের মতো মানুষরা প্রতিদিন বিভিন্ন গ্রাম ও খামার ঘুরে ঘুরে টন টন মাছ সংগ্রহ করেন। দিনে গড়ে দেড়শ’ মণ বা তারও বেশি মাছ তার হাত ধরে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন বড় শহরের পাইকারি বাজারে পৌঁছে যায়। শুধু আবুল কালামের ব্যবসার সাথেই কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন ৩০ থেকে ৪০ জন পূর্বে কর্মহীন থাকা মানুষ। উপজেলায় এমন অসংখ্য বড় ও মাঝারি বেপারী রয়েছেন, যাদের প্রতিদিনের সম্মিলিত চালান হাজার হাজার মণ পেরিয়ে যায়।

বর্তমান সময়ে এ খাতের সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক হলো তরুণ ও শিক্ষিত বেকারদের অংশগ্রহণ। ডিগ্রি অর্জন করে চাকরির পেছনে না ছুটে কিংবা হতাশাগ্রস্ত না হয়ে শিক্ষিত তরুণরা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে বাণিজ্যিক মৎস্য খামারে নেমে পড়ছেন। তারা শুধু গতানুগতিক পদ্ধতিতে সন্তুষ্ট না থেকে বায়োফ্লক, আইআরএস বা পুকুরে উন্নত প্রযুক্তির সমন্বয়ে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে মাছের ঘনত্ব ও বৃদ্ধি বাড়াচ্ছেন। এর ফলে যুবসমাজের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ব্যাপকভাবে জোরদার হচ্ছে।

চান্দিনার মাছ চাষ আজ শুধু একটি উপজেলার ক্ষুদ্র চিত্র নয়, বরং দেশের জাতীয় অর্থনীতিতে এক অতি গুরুত্বপূর্ণ অবদানকারী উপাদান। পর্যাপ্ত সরকারি বা বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, স্থানীয় পর্যায়ে সস্তা ও গুণগত মৎস্য খাদ্যের সহজলভ্যতা এবং সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করা সম্ভব হলে চান্দিনার এই নীরব বিপ্লব দেশের খাদ্য ও প্রোটিনের ঘাটতি পূরণে আরও বড় দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে সক্ষম হবে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত