ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬, ২৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

ইতালিসহ ইউরোপের বাজারে পোশাক রপ্তানি প্রবৃদ্ধি

ইতালিসহ ইউরোপের বাজারে পোশাক রপ্তানি প্রবৃদ্ধি

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে নতুন অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে মিশ্র চিত্র দেখা দিয়েছে। প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোর কয়েকটিতে পোশাক রপ্তানি কমলেও ইতালিসহ ইউরোপের কয়েকটি বাজারে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে। বিশেষ করে ইতালির বাজারে ১ বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ৩২ শতাংশ।

তবে বড় বাজারগুলোর সামগ্রিক দুর্বলতার কারণে জুলাইয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি গত বছরের একইমাসের তুলনায় ১ দশমিক ৯২ শতাংশ কমেছে। এ সময়ে মোট রপ্তানি হয়েছে ৩৮৮ কোটি ৬৭ লাখ ২০ হাজার ডলারের পোশাক। গত বছরের জুলাইয়ে রপ্তানি হয়েছিল ৩৯৬ কোটি ২৬ লাখ ৫০ হাজার ডলার। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) ‘বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের’ সংকলিত পরিসংখ্যানে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

তবে মাসভিত্তিক হিসাবে পোশাক রপ্তানিতে বেশ ভালো প্রবৃদ্ধি হয়েছে। জুনে রপ্তানি হয়েছিল ৩৩৮ কোটি ৭৭ লাখ ১০ হাজার ডলার। ফলে একমাসের ব্যবধানে জুলাইয়ে রপ্তানি বেড়েছে ১৪ দশমিক ৭৩ শতাংশ। অর্থাৎ নতুন অর্থবছরের শুরুতে রপ্তানি জুনের তুলনায় শক্তিশালী অবস্থানে ফিরলেও গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এখনও কিছুটা পিছিয়ে রয়েছে।

বাংলাদেশের পোশাকের বড় বাজারগুলোর মধ্যে জুলাইয়ে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সাফল্য এসেছে ইতালিতে। দেশটিতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ৩১ দশমিক ৯১ শতাংশ। জুলাইয়ে ইতালিতে রপ্তানি হয়েছে ১৪ কোটি ২১ লাখ ৮০ হাজার ডলারের পোশাক।

একই ইউরোপীয় বাজারের অন্য কয়েকটি দেশেও ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। স্পেনে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ৩ দশমিক ২৬ শতাংশ, রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪০ কোটি ৪৫ লাখ ২০ হাজার ডলারে। নেদারল্যান্ডসেও রপ্তানি বেড়েছে ১ দশমিক ২ শতাংশ, হয়েছে ২৩ কোটি ৪৮ লাখ ৯০ হাজার ডলার। অর্থাৎ ইউরোপের বাজারে সামগ্রিকভাবে রপ্তানি কমলেও সব দেশে একই প্রবণতা দেখা যায়নি। কিছু বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের চাহিদা বাড়ছে, যা নতুন করে সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়ন। জুলাইয়ে মোট পোশাক রপ্তানির ৪৯ দশমিক ৬৪ শতাংশ এসেছে এই অঞ্চল থেকে। তবে এই বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি কমেছে ২ দশমিক ৪৫ শতাংশ। জুলাইয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে মোট ১৯২ কোটি ৯২ লাখ ২০ হাজার ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে। ইইউর সবচেয়ে বড় বাজার জার্মানিতে রপ্তানি কমেছে ২ দশমিক ৮৪ শতাংশ। জুলাইয়ে দেশটিতে রপ্তানি হয়েছে ৪৫ কোটি ৮৩ লাখ ৯০ হাজার ডলারের পোশাক। ফ্রান্সেও রপ্তানি কমেছে ৪ দশমিক ৪৪ শতাংশ। দেশটিতে রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৬ কোটি ৯ লাখ ডলারে। ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বড় দুই বাজার জার্মানি ও ফ্রান্সে রপ্তানি কমে যাওয়ায় পুরো অঞ্চলের প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তবে ইতালি, স্পেন ও নেদারল্যান্ডসের ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি সেই চাপ কিছুটা সামলে দিয়েছে।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের একক বৃহত্তম গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজার জুলাইয়ে মোটামুটি স্থিতিশীল ছিল। দেশটিতে পোশাক রপ্তানি হয়েছে ৭৯ কোটি ৫৭ লাখ ৯০ হাজার ডলারের। গত বছরের জুলাইয়ের তুলনায় এটি মাত্র দশমিক ১৮ শতাংশ কম। অন্যদিকে মোট রপ্তানিতে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ সামান্য বেড়েছে। গত বছরের জুলাইয়ে বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানির ২০ দশমিক ১২ শতাংশ গিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রে। এবার তা বেড়ে হয়েছে ২০ দশমিক ৪৭ শতাংশ।

অর্থাৎ ইউরোপের বাজারে রপ্তানি কমলেও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের অবস্থান প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে। সামগ্রিক রপ্তানি কমার মধ্যেও এটি পোশাক খাতের জন্য তুলনামূলকভাবে ইতিবাচক দিক।

বাংলাদেশের পোশাকের আরেক গুরুত্বপূর্ণ বাজার যুক্তরাজ্য। জুলাইয়ে দেশটিতে রপ্তানি কমেছে ২ দশমিক ৪৪ শতাংশ। রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৫ কোটি ৮ লাখ ২০ হাজার ডলারে। তবে কানাডার বাজারে পতন আরও বেশি। জুলাইয়ে দেশটিতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমেছে ৮ দশমিক ৩৯ শতাংশ, নেমে এসেছে ১৩ কোটি ৬ লাখ ২০ হাজার ডলারে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে স্থিতিশীলতা থাকলেও যুক্তরাজ্য ও কানাডার বাজারের পতন মোট রপ্তানি প্রবৃদ্ধির ওপর চাপ তৈরি করেছে।

জুলাইয়ে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির দুই প্রধান খাত নিট ও ওভেন- দুটিতেই গত বছরের একই সময়ের তুলনায় রপ্তানি কমেছে। ওভেন পোশাক রপ্তানি হয়েছে ১৭২ কোটি ৭৬ লাখ ৬০ হাজার ডলারের- যা গত বছরের তুলনায় ৩ দশমিক ১৬ শতাংশ কম। অন্যদিকে নিট পোশাক রপ্তানি হয়েছে ২১৫ কোটি ৯ লাখ ৬০ হাজার ডলারের, যা কমেছে দশমিক ৯০ শতাংশ। অর্থাৎ রপ্তানি কমার ক্ষেত্রে ওভেন পোশাক তুলনামূলকভাবে বেশি চাপের মধ্যে রয়েছে। বিপরীতে নিট পোশাকে পতনের হার কম হওয়ায় এই খাত মোট রপ্তানিকে কিছুটা স্থিতিশীল রাখতে ভূমিকা রেখেছে।

তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, পোশাক রপ্তানি বাড়াতে হলে প্রথমে শিল্পের অভ্যন্তরীণ সংকটগুলো দূর করতে হবে। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে অনেক কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, সময়মতো পণ্য তৈরি ও জাহাজীকরণ কঠিন হয়ে পড়ছে। এর সঙ্গে বাড়তি উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানি ও অন্যান্য খরচের চাপ রয়েছে। এ অবস্থায় শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং ব্যবসার খরচ কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। তা না হলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা এবং রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন হবে।

প্রচলিত বড় বাজারের বাইরে বাংলাদেশের পোশাকের যেসব বাজারকে অপ্রচলিত বাজার বলা হয়, সেখানেও জুলাইয়ে বড় ধরনের পতন দেখা যায়নি। এসব বাজারে সম্মিলিত রপ্তানি হয়েছে ৫৮ কোটি ২ লাখ ৬০ হাজার ডলারের, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় দশমিক ৪৮ শতাংশ কম। মোট পোশাক রপ্তানিতে এসব বাজারের অংশ প্রায় ১৪ দশমিক ৯৩ শতাংশ।

অপ্রচলিত বাজারগুলোর মধ্যে জাপানে রপ্তানি সামান্য বেড়েছে। জুলাইয়ে দেশটিতে রপ্তানি হয়েছে ১০ কোটি ৮৫ লাখ ১০ হাজার ডলারের পোশাক, যা আগের বছরের তুলনায় দশমিক ২৯ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়া ও ভারতে রপ্তানি কমেছে যথাক্রমে দশমিক ৩৩ শতাংশ ও ৩ দশমিক ৯৭ শতাংশ। জুলাইয়ের পোশাক রপ্তানির পরিসংখ্যানে একটি বিষয় বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। জুনের তুলনায় জুলাইয়ে রপ্তানি বেড়েছে ১৪ দশমিক ৭৩ শতাংশ। মাত্র এক মাসে প্রায় ৫০ কোটি ডলারের রপ্তানি বেড়েছে। তবে এটিকে এখনই পোশাক খাতের ঘুরে দাঁড়ানোর স্থায়ী লক্ষণ হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত