ঢাকা শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২১ ভাদ্র ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

এক বছরের মধ্যে বদলে যাবে পুঁজিবাজার

জানাল বিএসইসি চেয়ারম্যান
এক বছরের মধ্যে বদলে যাবে পুঁজিবাজার

আগামী এক বছরের মধ্যে দেশের পুঁজিবাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খান। তিনি বলেছেন, বাজারকে আরও গভীর, সুশৃঙ্খল, স্বচ্ছ ও ন্যায্য করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। একই সঙ্গে আগামী ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে ভালো ও বড় কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। গতকাল শুক্রবার ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্টস ফোরামের (সিএমজেএফ) সদস্যদের জন্য আয়োজিত আবাসিক কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সিএমজেএফের সভাপতি মনির হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক আহসান হাবীব রাসেল।

বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, আমি কনফিডেন্ট যে আগামী এক বছরে এই স্টক মার্কেটটা আগের মতো আপনারা দেখবেন না। এই স্টক মার্কেটটা আরও অনেক ডিপার হবে, অনেক ভালো ভালো কোম্পানি আসবে। তখন আমাদের যে বর্তমান দুর্বলতাটা আছে, ইনশাআল্লাহ আমি আশা করছি তখন আরও কমে আসবে। তিনি বলেন, পুঁজিবাজারে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য বাজারের উত্থান-পতন নিয়ে স্বল্পমেয়াদি চিন্তা করলে হবে না। বাজারে জোয়ার-ভাটা থাকবে, এটি স্বাভাবিক। নিয়ন্ত্রক সংস্থার লক্ষ্য হচ্ছে একটি 'অর্ডারলি, ফেয়ার ও ট্রান্সপারেন্ট' মার্কেট গড়ে তোলা।

ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের সুফল : বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার দুদিনের মধ্যেই ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার করা হয়েছিল। এর অন্যতম কারণ ছিল মরগান স্ট্যানলি ক্যাপিটাল ইনডেক্সে বাংলাদেশের অবস্থান।

তিনি বলেন, ফ্লোর প্রাইসের কারণে মরগান স্ট্যানলি ক্যাপিটাল ইনডেক্স বাংলাদেশকে স্থগিত করেছিল। এ সূচক একটি দেশের পুঁজিবাজার কতটা আকর্ষণীয়, তা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। ফ্লোর প্রাইসের মতো 'মেকশিফট প্র্যাকটিস' বিদেশি বিনিয়োগকারীদেরও নিরুৎসাহিত করে। তিনি জানান, পাওয়া তথ্য অনুযায়ী আগামী মাস থেকে বাংলাদেশের জন্য মরগান স্ট্যানলি ক্যাপিটাল ইনডেক্স আবার চালু হতে পারে।

বেক্সিমকোর জিডিআর চালু : বেক্সিমকোর জিডিআর ইস্যুতেও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা তুলে ধরেন বিএসইসি চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, জরুরি ভিত্তিতে বোর্ড সভার অনুমোদন দিয়ে লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জে স্থগিত থাকা বেক্সিমকোর জিডিআর পুনরায় চালু করা সম্ভব হয়েছে। এটি করা না হলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশি কোম্পানিগুলোর জিডিআর ইস্যুর ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হতে পারত বলেও জানান তিনি।

ডিএসইকে আরও ক্ষমতায়ন : ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জকে (ডিএসই) আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান বলেন, ডিএসই একটি প্রাথমিক নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করে। তাই তাদের পরিদর্শন কার্যক্রম, সার্কিট ব্রেকার নির্ধারণ এবং তালিকাভুক্ত কোম্পানির পরিদর্শনের ক্ষেত্রে আরও ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, তালিকাভুক্তির বিধিমালা বাস্তবায়নের দায়িত্ব ডিএসইর। তারা দায়িত্ব পালন না করলে বিএসইসি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। একই সঙ্গে ডিএসই ও বিএসইসির বাজার নজরদারি ব্যবস্থা আরও আধুনিক করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে মানবীয় হস্তক্ষেপ কমানোর পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।

প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়াতে উদ্যোগ : দেশের পুঁজিবাজার এখনো মূলত খুচরা বিনিয়োগকারীনির্ভর উল্লেখ করে বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, প্রায় ৯০ শতাংশ বিনিয়োগকারীই খুচরা বিনিয়োগকারী। বিপরীতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ খুবই কম। তার মতে, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ না বাড়াতে পারলে পুঁজিবাজারের বর্তমান অবস্থার পরিবর্তন হবে না। এ জন্য প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচুইটি ফান্ডের অর্থ বিনিয়োগের কাঠামো পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ট্রাস্ট আইনের সংশ্লিষ্ট ধারার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, বর্তমানে প্রভিডেন্ট ফান্ডের বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারি গ্রিন বন্ড ও সঞ্চয়পত্রের ওপর নির্ভরতা রয়েছে। একই সঙ্গে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের সুযোগ থাকলেও সেটিকে আরও কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। তিনি জানান, প্রাতিষ্ঠানিক তহবিলের বিনিয়োগের একটি অংশ শেয়ারবাজারে এবং আরেকটি অংশ করপোরেট বন্ডে নেওয়ার বিষয়ে কাজ করা হচ্ছে।

ভালো কোম্পানি আনতে সরাসরি তালিকাভুক্তি : পুঁজিবাজারে ভালো কোম্পানির সংখ্যা দ্রুত বাড়ানো জরুরি উল্লেখ করে বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, বর্তমানে বাজারে হাতে গোনা কিছু ভালো কোম্পানি রয়েছে। অনেক কোম্পানির আয়ের ওঠানামা বেশি হওয়ায় তাদের আর্থিক ঝুঁকিও তুলনামূলক বেশি। এ কারণে সরাসরি তালিকাভুক্তির মাধ্যমে ভালো কোম্পানিকে দ্রুত বাজারে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মাসুদ খান বলেন, আইপিও প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ। তাই সরাসরি তালিকাভুক্তি বিধিমালা ঢেলে সাজিয়ে নতুন ব্যবস্থা করা হচ্ছে। পাশাপাশি আইপিও ব্যবস্থাতেও পরিবর্তন আনা হবে।

আইপিওতে 'এক্সটেন্ডেড অডিট' : আইপিও প্রক্রিয়া দ্রুত করার জন্য 'এক্সটেন্ডেড অডিট' চালুর পরিকল্পনার কথা জানান বিএসইসি চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, প্রচলিত স্ট্যাটুটরি অডিট মূলত কোম্পানির আর্থিক বিবরণী সত্য ও ন্যায্যভাবে উপস্থাপিত হয়েছে কি না, সেটি যাচাই করে। কিন্তু পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে কোম্পানির জমি, যন্ত্রপাতি, মজুত পণ্য, ক্রেডিট বিক্রির পাওনা, সরবরাহকারীসহ বিভিন্ন বিষয় বাস্তবে আছে কিনা, তা যাচাই করা প্রয়োজন। এ জন্য আইপিও আবেদনকারী কোম্পানিকে বর্ধিত অডিটের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ কাজের দায়িত্ব অডিটরদের ওপর দেওয়া হবে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই ও প্রত্যয়ন হয়ে গেলে আইপিও আবেদনের সময় ডিএসইকে একই আর্থিক বিবরণী নিয়ে বারবার প্রশ্ন করতে হবে না। এতে আইপিও প্রক্রিয়া সহজ ও দ্রুত হবে বলে আশা করছেন বিএসইসির চেয়ারম্যান।

বহুজাতিক কোম্পানির জন্য হাইব্রিড ব্যবস্থা : আগামী সপ্তাহে 'হাইব্রিড সিস্টেম' চালুর উদ্যোগের কথাও জানান বিএসইসি চেয়ারম্যান। এ ব্যবস্থায় কোনো কোম্পানি একদিকে মূলধন সংগ্রহ করতে পারবে, অন্যদিকে সরাসরি তালিকাভুক্তও হতে পারবে। বিশেষ করে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে আনতে এ ব্যবস্থা কার্যকর হবে বলে মনে করছে বিএসইসি। তিনি বলেন, বহুজাতিক ও বড় স্থানীয় কোম্পানিগুলোকে স্বপ্রণোদিতভাবে পুঁজিবাজারে আসতে উৎসাহিত করা হবে। তবে প্রয়োজন হলে আইন প্রয়োগের সুযোগও রয়েছে।

'পাবলিক ইন্টারেস্ট কোম্পানি' সংজ্ঞা : বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, সিকিউরিটিজ আইনের ২০-এ ধারার ক্ষমতা প্রয়োগ করে জনস্বার্থে কোনো কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার নির্দেশ দেওয়া সম্ভব। এ জন্য 'পাবলিক ইন্টারেস্ট কোম্পানি'র একটি সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হবে। তিনি আশা করেন, আগামী ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে বাংলাদেশের বড় ও ফ্ল্যাগশিপ কোম্পানিগুলোর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পুঁজিবাজারে আসবে।

তালিকাভুক্ত হলে মিলবে কর সুবিধা : স্থানীয় কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে আনতে কর সুবিধার বিষয়টিও তুলে ধরেন বিএসইসি চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, তালিকাভুক্ত কোম্পানির ক্ষেত্রে করহারে সুবিধা রয়েছে এবং এ সুবিধা আরও বাড়ানোর বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তিনি বলেন, তালিকাভুক্ত ও তালিকাবহির্ভূত কোম্পানির করহারে আরও যৌক্তিক পার্থক্য তৈরি করা গেলে কোম্পানিগুলো পুঁজিবাজারে আসতে উৎসাহিত হবে।

করপোরেট বন্ডে ৮০ শতাংশ ফি কমেছে : দেশের করপোরেট বন্ড মার্কেটকে এগিয়ে নিতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের মূল বোর্ডে করপোরেট বন্ডের তালিকাভুক্তি ফি ৮০ শতাংশ কমানোর কথা জানান বিএসইসি চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, আগে মূল বোর্ডে তালিকাভুক্তির ফি বেশি থাকায় কোম্পানিগুলোর অনাগ্রহ ছিল। বর্তমানে ফি কমানো হয়েছে। ফলে আগামী তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে মূল বোর্ডে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক করপোরেট বন্ড লেনদেন হতে পারে।

করপোরেট বন্ডে আকর্ষণীয় কুপন রেট থাকার বিষয়টিও তুলে ধরে তিনি বলেন, অনেক বন্ডে 'এ' ক্যাটাগরির ব্যাংকের ছয় মাসের এফডিআর হারের সঙ্গে প্রায় ৩ শতাংশ স্প্রেড রয়েছে। ফলে এসব বন্ডে প্রায় ১২ থেকে সাড়ে ১২ শতাংশ পর্যন্ত কুপন রেট পাওয়া যাচ্ছে।

ডেরিভেটিভ, ইটিএফ ও রিয়েল এস্টেট ট্রাস্ট : পুঁজিবাজারে নতুন পণ্য চালুর পরিকল্পনাও তুলে ধরেন বিএসইসি চেয়ারম্যান। চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে ডেরিভেটিভ মার্কেট চালুর প্রক্রিয়া শিগগিরই শুরু হবে বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের কমোডিটি মার্কেটে গোল্ড, সিলভার ও ক্রুড পাম অয়েল নিয়ে কাজ হচ্ছে। অন্যদিকে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ইনডেক্স ফিউচার চালুর জন্য আবেদন করেছে। এ ছাড়া এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ড (ইটিএফ) এবং রিয়েল এস্টেট ইনভেস্টমেন্ট ট্রাস্ট বা আরইআইটি চালুর অনুমতি আগে দেওয়া হলেও কার্যকর করার ক্ষেত্রে আরও পরিবর্তন আনার কথা জানান বিএসইসির চেয়ারম্যান।

এক বছরের মধ্যে সিসিবিএল চালুর লক্ষ্য : ক্লিয়ারিং ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক করতে সেন্ট্রাল কাউন্টারপার্টি অব বাংলাদেশ লিমিটেড (সিসিবিএল) চালুর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে বিএসইসি। তিনি বলেন, আগামী এক বছরের মধ্যে সিসিবিএল চালুর লক্ষ্য রয়েছে। এর জন্য শেয়ারহোল্ডিং কাঠামো পরিবর্তনের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ব্যবস্থারও উন্নয়ন করতে হবে। বর্তমান প্রযুক্তি দিয়ে ডেরিভেটিভ লেনদেন পরিচালনায় সীমাবদ্ধতা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, নতুন ব্যবস্থায় যেতে হবে।

ব্রোকারদের জন্য অভিন্ন সফটওয়্যার : ব্রোকারদের ব্যাক অফিস সফটওয়্যারের ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন ব্রোকার নিজস্ব সফটওয়্যার ব্যবহার করায় ঝুঁকি রয়েছে বলে মনে করছে বিএসইসি। এ জন্য সব ব্রোকারের জন্য একটি অভিন্ন সফটওয়্যার চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতে সিসিবিএলের সঙ্গে এ সফটওয়্যারের এপিআই সংযোগ স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে- উল্লেখ করেন মাসুদ খান।

নতুন মার্জিন, আইপিও ও মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা : বিএসইসি চেয়ারম্যান জানান, মার্জিন বিধিমালা এরই মধ্যে করা হয়েছে। ক্যাপিটাল ইস্যু-সংক্রান্ত বিধিমালার পর আইপিও বিধিমালায় পরিবর্তন আনা হবে। আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যে নতুন আইপিও বিধিমালা আনার লক্ষ্য রয়েছে। এরপর মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালাতেও পরিবর্তন আনা হবে। তিনি বলেন, একটি বিধিমালা পরিবর্তন করতে সাধারণত দীর্ঘ সময় লাগে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত