
দেশের যে প্রান্তেই যান, তার ব্যাগে কিংবা গাড়িতে জায়গা করে নেয় একটি চারা অথবা একমুঠো বীজ। কোথাও সংবাদ সংগ্রহে, কোথাও ব্যক্তিগত সফরে, আবার কোথাও স্বেচ্ছাসেবী কাজের প্রয়োজনে যাওয়া-যাত্রার শেষটা যেন তার কাছে অসম্পূর্ণ থেকে যায় একটি গাছ না লাগালে। সুযোগ পেলেই স্থানীয় মানুষের সহযোগিতায় মাটিতে পুঁতে দেন সেই চারা। রেখে আসেন একটি জীবন্ত স্মৃতি। তিনি এস এম আরিফুল আমিন প্লাবন।
তার কাছে গাছ লাগানো কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়। এটি তার দীর্ঘদিনের অভ্যাস, বিশ্বাস এবং ভবিষ্যতের প্রতি এক ধরনের দায়বদ্ধতা। গত এক দশক ধরে তিনি নিয়মিত তালবীজ রোপণ করছেন। নিজের হাতে মাটিতে পুতে দেওয়া সেই বীজগুলোর অনেকগুলো আজ পূর্ণাঙ্গ গাছে পরিণত হয়েছে। একসময় ছোট্ট বীজ থেকে জন্ম নেওয়া এসব গাছ এখন তার দীর্ঘ অপেক্ষা, ধৈর্য আর সবুজ ভবিষ্যতের স্বপ্নের সাক্ষী।
তালগাছের পাশাপাশি কয়েক হাজার দেশীয় ফলজ গাছও রোপণ করেছেন তিনি। তার কাছে বৃক্ষরোপণের অর্থ শুধু গাছের সংখ্যা বাড়ানো নয়; হারিয়ে যেতে বসা দেশীয় জীববৈচিত্র্যকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা। দেশীয় প্রজাতির গাছের প্রতি তার এ আগ্রহের পেছনে রয়েছে নিজের জীবনের অভিজ্ঞতাও। নদীভাঙন ও বন্যাপ্রবণ এলাকার মানুষ হিসেবে প্রকৃতির রুদ্ররূপ খুব কাছ থেকে দেখেছেন প্লাবন। দেখেছেন নদী কীভাবে মানুষের বসতভিটা কেড়ে নেয়, বন্যা কীভাবে বদলে দেয় একটি পরিবারের জীবন ও জীবিকার হিসাব। তাই চরাঞ্চল তার বৃক্ষরোপণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। সেখানে একটি গাছ তার কাছে কেবল সবুজের সংযোজন নয়; ভঙ্গুর পরিবেশকে একটু বেশি টেকসই করে তোলার একটি প্রচেষ্টা। সম্প্রতি বিলুপ্তপ্রায় করঞ্জা গাছের ৫০০ বীজ সংগ্রহ করেছেন তিনি। সেগুলো থেকে চারা তৈরির কাজ চলছে। তার স্বপ্ন, দেশীয় এ গাছগুলো আবার ছড়িয়ে পড়বে দেশের নানা প্রান্তে। হারিয়ে যেতে বসা প্রজাতিগুলো ফিরে আসবে মানুষের আশপাশের প্রকৃতিতে।
পরিবেশ নিয়ে তার কাজকে আরও সংগঠিত করতে প্রতিষ্ঠা করেছেন 'হেল্প দ্য নেশন' নামে পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। ঢাকায় প্রতি শুক্রবার ৫৫ কদমতলার সঙ্গে গুলশান-বনানী লেক এলাকায় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতেও নিয়মিত অংশ নেন তিনি। সপ্তাহের ব্যস্ততার মধ্যেও ছুটির একটি দিন প্রকৃতির জন্য বরাদ্দ রাখেন। তার সবুজ ভাবনা এখন নিজের পরিবারকেও ঘিরে। নিজের কন্যার মাত্র এক মাস বয়স থেকে তাকে সঙ্গে নিয়ে প্রতি মাসে অন্তত ২০টি গাছ লাগানোর উদ্যোগ নিয়েছেন। নাম দিয়েছেন— 'কার্বন নিউট্রাল বেবি'। শিশুকে কোলে নিয়ে গাছ লাগানোর এ উদ্যোগ যেন এক প্রজন্মের কাছ থেকে আরেক প্রজন্মের হাতে দায়িত্ব তুলে দেওয়ার প্রতীক।
পেশায় প্লাবন একজন ফটোসাংবাদিক। করোনা মহামারী, জুলাই গণঅভ্যুত্থান, রাজনীতি ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সময়কে ক্যামেরায় নথিবদ্ধ করেছেন। তার ছবি প্রকাশিত হয়েছে দেশ-বিদেশের বহু গণমাধ্যমে। পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবী কাজ, প্রাণী উদ্ধার এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোও তার জীবনের অংশ।
কিন্তু তার গল্পের সবচেয়ে নীরব অধ্যায়গুলো পড়ে থাকে মাটিতে। কোনো ছবির ক্যাপশনে নয়, কোনো শিরোনামের নিচেও নয়। পড়ে থাকে সেই বীজে, যা একদিন গাছ হবে; সেই গাছে, যা একদিন ছায়া দেবে। ইতিহাসকে ক্যামেরায় ধরে রাখার পাশাপাশি প্লাবন তাই মাটিতে লিখে চলেছেন ভবিষ্যতের গল্প— একটি চারা, একটি গাছ, একটি সবুজ পৃথিবীর স্বপ্ন দিয়ে।