ঢাকা মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪ আশ্বিন ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

সুসংবাদ প্রতিদিন

চান্দিনায় রফিক মিয়ার ফল বাগানে দেশি-বিদেশি ফলের বিপুল সমাহার

চান্দিনায় রফিক মিয়ার ফল বাগানে দেশি-বিদেশি ফলের বিপুল সমাহার

কুমিল্লার চান্দিনার ৯ নং মাইজখার ইউনিয়নের আওড়াল গ্রাম। এই জনপদের নিস্তব্ধ মেঠোপথ ধরে এগোলেই চোখে পড়ে এক টুকরো সবুজ স্বর্গ। গ্রামটির উদ্যোমী মানুষ মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম (কালা মিয়া) নিজ উদ্যোগ ও পরিশ্রমে গড়ে তুলেছেন এক চমৎকার দেশি-বিদেশি ফলের বাগান। ৭২ শতাংশ জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এই বাগানটি যেন প্রকৃতির এক অপূর্ব ক্যানভাস, যেখানে মাটি আর মানুষের মিতালিতে ফলে উঠেছে পৃথিবীর নানা প্রান্তের দুর্লভ সব ফল।

আজ থেকে মাত্র দুই বছর আগের কথা। মনের ভেতর লালিত স্বপ্ন আর কিছু করার তাড়না থেকেই রফিকুল ইসলাম দেড় লাখ টাকা পুঁজি বিনিয়োগ করেন। উদ্দেশ্য ছিল নিজের একটু জমিকে ফলসমৃদ্ধ করে তোলা এবং একই সঙ্গে এলাকার মানুষকে পুষ্টিগুণসম্পন্ন ও বিষমুক্ত ফলের স্বাদ দেওয়া। তার সেই স্বপ্ন আজ বাস্তবে রূপ নিয়েছে। ৭২ শতাংশ জমির প্রতিটি কোণায় এখন শোভা পাচ্ছে নজরকাড়া সব ফলের গাছ।

এই বাগানের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এর বৈচিত্র্যময় ফল সংগ্রহ। দেশীয় ফল ছাপিয়ে এখানে ডালপালা মেলেছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নামিদামি সব জাত। বাগানে ঢুকলে চোখে পড়বে ভিয়েতনামী মালটা ও ভেরি জাতের মালটা। গাছের ডালে থোকা থোকা ঝুলে থাকা সোনালী ও সবুজ মালটা দেখতে যেমন সুন্দর, তেমনি এর ভেতরের রসালো কোষগুলো মিষ্টি ও সুস্বাদু। পাশেই রয়েছে জাপানি ব্যানানা ম্যাংগো, বারুইপুরি আম এবং জনপ্রিয় আম্রপালি আম। আমের ভারে যখন ডালগুলো নুয়ে পড়ে, তখন এক মোহনীয় দৃশ্যের সৃষ্টি হয়।

শুধু আম বা মালটা নয়, ফলের এই সমাহারকে আরও সমৃদ্ধ করেছে ভিয়েতনামের জাম্বুরা, জাপানি ফার্সিমন, আলু বোখারা, ভিয়েতনামী নারিকেল এবং সুমিষ্ট আখ। ভিনদেশি এসব গাছের সাথে তাল মিলিয়ে দিব্যি বেড়ে উঠছে আমাদের চিরচেনা দেশি ফলগুলোও। সবচেয়ে আশার কথা হলো, এই বাগানের প্রতিটি ফল সম্পূর্ণ বিষমুক্ত। গাছের পরিচর্যার ক্ষেত্রে ক্ষতিকর রাসায়নিক সার বা কীটনাশকের পরিবর্তে জৈব বা পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। ফলে এখানকার ফলগুলো অত্যন্ত পুষ্টিগুণে ভরপুর এবং নিরাপদ। বাগানের বাণিজ্যিক সফলতাও মন্দ নয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এই বাগান রফিকুল ইসলামের মুখে হাসি ফোটাতে শুরু করেছে। গত বছর তিনি এই বাগান থেকে প্রায় ৫০ হাজার টাকার ফল বিক্রি করেছিলেন। আর চলতি বছর সেই বিক্রির পরিমাণ ছাড়িয়ে গেছে। এ পর্যন্ত তিনি প্রায় ৮০ হাজার টাকার ফল বিক্রি করেছেন। এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে ফলের প্রাকৃতিক স্বাদ ও গুণগত মান। রফিকুল ইসলাম সাধারণত পাইকারি দরে স্থানীয় বাজারে এসব ফল বিক্রি করেন। তবে তার বাগানের সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ায় এখন আর শুধু বাজারেই বসে থাকতে হয় না। কুমিল্লার চান্দিনা ছাড়াও জেলার বিভিন্ন দূর-দূরত্ব থেকে মানুষ ছুটে আসেন এই বাগানে। তাজা ফল দেখে সরাসরি গাছ থেকে বা বাগান থেকে কিনে নিয়ে যান পরম আনন্দে। উদ্যোক্তা রফিকুল ইসলামের চোখে মুখে এখন এক নতুন ভবিষ্যৎ গড়ার প্রত্যয়। তিনি থেমে থাকতে চান না। তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হলো এই বাগানের পরিধি আরও অনেকদূর বাড়ানো। তিনি দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এবং সুযোগ পেলে বিদেশ থেকেও নানা দুর্লভ ও উন্নত জাতের ফল গাছের চারা সংগ্রহ করে বাগানটিকে আরও বড় করতে চান। তার মূল লক্ষ্য, দেশি ফলের পাশাপাশি বাগানটিকে ভিনদেশি ফলে ভরপুর করে তোলা। যাতে বাংলাদেশের মানুষ অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে বিদেশ থেকে আমদানিকৃত ফল কেনার পরিবর্তে, দেশের মাটিতে উৎপাদিত বিদেশি ফলেরই আসল স্বাদ নিজ দেশেই বসে গ্রহণ করতে পারেন। একজন সাধারণ মানুষের এমন অসাধারণ উদ্যোগ শুধু তার নিজের ভাগ্যের পরিবর্তনই ঘটাচ্ছে না, বরং স্থানীয় যুবসমাজকেও কৃষি খাতে নতুন কিছু করার অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছেন। রফিকুল ইসলামের এই সফল ফলের বাগান আজ চান্দিনার সবুজ প্রকৃতির এক অনন্য অহংকার।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত