ঢাকা মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

এক ইঞ্জিনের পার্টস দিয়ে চলছে আরেক ইঞ্জিন

বছর পার যন্ত্রাংশের অপেক্ষায়
এক ইঞ্জিনের পার্টস দিয়ে চলছে আরেক ইঞ্জিন

একটি লোকোমোটিভ সচল রাখতে খুলে নিতে হচ্ছে আরেকটি অচল ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশ। প্রয়োজনীয় স্পেয়ার পার্টস কোথাও না পেয়ে দ্রুত মেরামত করে লাইনে পাঠানো হচ্ছে ইঞ্জিন। কিছুদিন পর একই ত্রুটি নিয়ে আবার সেটি ফিরছে কারখানায়। এভাবেই 'রিপিট ফেইলিওর'-এর চক্রে চলছে চট্টগ্রামের পাহাড়তলী ডিজেল ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ মেরামত কারখানা।

পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের মিটারগেজ লোকোমোটিভের অন্যতম প্রধান এই কারিগরি কেন্দ্রে অনুমোদিত ৩৩০টি পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ১১০ জন। দীর্ঘদিন নিয়োগ না হওয়া এবং অভিজ্ঞ টেকনিশিয়ানদের অবসরের কারণে দক্ষ জনবলের সংকট প্রকট হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আমদানিনির্ভর স্পেয়ার পার্টসের ঘাটতি, বাজেট বরাদ্দ ও ঋণপত্র (এলসি) জটিলতা।

কারখানা-সংশ্লিষ্টদের মতে, কোনো যন্ত্রাংশের চাহিদাপত্র দেওয়ার পর প্রশাসনিক অনুমোদন, বাজেট ও ক্রয়প্রক্রিয়া শেষ করে সেটি হাতে পেতে কখনো কখনো এক বছরেরও বেশি সময় লেগে যায়। ফলে মেরামতের জন্য আসা লোকোমোটিভ দিনের পর দিন পড়ে থাকে। ট্রেন সচল রাখতে দ্রুত ইঞ্জিন লাইনে ফেরানোর চাপ থাকায় অনেক সময় পূর্ণাঙ্গ ওভারহোলিংয়ের বদলে 'কুইক ফিক্স' করে সেটি পাঠানো হয়। কারখানা শ্রমিকরা মনে করেন, এক ইঞ্জিনের 'জীবন' বাঁচাতে আরেকটি অচল ইঞ্জিনের পার্টস ব্যবহার এখন অনেকটা নিয়মিত চর্চায় পরিণত হয়েছে। এতে তাৎক্ষণিকভাবে ইঞ্জিন সচল করা গেলেও দীর্ঘমেয়াদে ত্রুটি থেকে যায়। কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ পর একই ধরনের ত্রুটি নিয়ে ইঞ্জিনটি আবার কারখানায় ফিরে আসে। এতে মেরামতের চাপ বাড়ার পাশাপাশি লাইনে প্রস্তুত লোকোমোটিভের সংখ্যাও কমে যায়। যার প্রভাব পড়ে পুরো রেল পরিচালনায় পড়ে। জনবল সংকটের কারণে সীমিতসংখ্যক মেকানিক ও টেকনিশিয়ানকে অতিরিক্ত চাপ নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। কোথাও কোথাও দৈনিক মজুরি ও অদক্ষ শ্রমিকের সহায়তাও নিতে হচ্ছে। অথচ পুরোনো মিটারগেজ লোকোমোটিভের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও নির্ধারিত ওভারহোলিংয়ের জন্য অভিজ্ঞ কারিগরি জনবল অপরিহার্য বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে সংকটের মধ্যেও পাহাড়তলী ডিজেল শপের সক্ষমতার বড় প্রমাণ রয়েছে। গত চার অর্থবছরে কারখানাটি ১৫টি মৃতপ্রায় এবং চারটি দুর্ঘটনাকবলিত মোট ১৯টি লোকোমোটিভ মেরামত করে সম্পূর্ণ সচল অবস্থায় রানিং ডিভিশনে ফেরত পাঠিয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে চারটি মৃতপ্রায় ও দুটি দুর্ঘটনাকবলিত লোকোমোটিভ, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চারটি এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পাঁচটি মৃতপ্রায় ও দুটি দুর্ঘটনাকবলিত লোকোমোটিভ পুনরুদ্ধার করা হয়। শুধু বড় ধরনের মেরামত নয়, প্রতিদিনের ছোট-বড় ত্রুটি সামাল দিতেও কারখানাটির ওপর রয়েছে বড় চাপ।

সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন-চার বছরে প্রতিদিন গড়ে সাত থেকে আটটি লোকোমোটিভের মেরামত ও লাইট ওভারহোলিং করা হয়েছে। ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার আগে বাড়তি ট্রেন পরিচালনার জন্য একসঙ্গে প্রায় ৪৫ থেকে ৫৫টি লোকোমোটিভ প্রস্তুত করে লাইনে পাঠানোর কাজও করতে হয়েছে। দেশীয় প্রযুক্তিতে স্থাপন করা হয়েছে স্বয়ংক্রিয় ডায়াগনস্টিকস এবং পার্টস ক্লিনিং ও ফিটিং অটোমেশন মেশিন। ডায়াগনস্টিকস মেশিনের মাধ্যমে ইলেকট্রিক্যাল ও ফুয়েল সিস্টেমের ত্রুটি দ্রুত শনাক্ত করা যাচ্ছে। অন্য মেশিনে সিলিন্ডার হেড, ক্র্যাঙ্কশ্যাফ্টসহ ভারী যন্ত্রাংশ পরিষ্কার ও ফিটিংয়ের কাজ তুলনামূলক দ্রুত ও নির্ভুলভাবে করা সম্ভব হচ্ছে। পাশাপাশি দেশীয় প্রযুক্তিতে জিব ক্রেন, এসি মোটর টেস্টিং প্ল্যান্ট ও কমপ্রেসর টেস্টিং প্ল্যান্টও স্থাপন করা হয়েছে।

পাহাড়তলী ডিজেল ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ মেরামত কারখানার কর্মব্যবস্থাপক (ডিজেল) প্রকৌশলী এতেশাম মো. শফিক বলেন, দীর্ঘদিন ধরে কারখানায় দক্ষ জনবল ও মানসম্মত স্পেয়ার পার্টসের ঘাটতি থাকায় মেরামত কাজ করা অনেকটাই চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়েছে। দক্ষ জনবলের ঘাটতি মোকাবিলা ও মূল্যবান কর্মঘণ্টা সাশ্রয়ের জন্য বিভিন্ন ধরনের অটোমেশন প্রযুক্তির ব্যবহার পর্যায়ক্রমে বাড়ানো হচ্ছে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত