
মানব পাচারকারীদের আস্তানায় একাধিক মরদেহ পড়ে থাকার খবর পেয়ে টেকনাফের পাহাড়ে অভিযান চালিয়েছে যৌথ বাহিনী। গতকাল শনিবার সকাল সাড়ে ৭টা থেকে চার ঘণ্টার অভিযানেও কোনও মরদেহের সন্ধান মেলেনি। তবে পাহাড়ের আস্তানা থেকে রান্নার পাতিল, খাবার ও বিছানাসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র উদ্ধার করা হয়েছে। খবর ছড়িয়ে পড়ার পর পাচারকারীরা মরদেহ সরিয়ে ফেলেছে, নাকি সেখানে আদৌ কোনও মরদেহ ছিল না তা নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা।
এদিকে পাহাড়ে ধারাবাহিক অভিযান ও গোলাগুলিতে সেনাসদস্য নিহতের ঘটনায় টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের পাহাড়ি এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এর প্রভাব পড়েছে পাহাড়সংলগ্ন লেদা রোহিঙ্গা ক্যাম্পেও। নিরাপত্তা বাহিনীর তৎপরতা এবং পাহাড় থেকে গুলির শব্দে আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন ক্যাম্পের বাসিন্দারা। গতকাল শনিবার সকাল সাড়ে ৭টা থেকে সাড়ে ১১টা পর্যন্ত টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের লেদা-নয়াপাড়া পাহাড়ি এলাকায় এ অভিযান চালানো হয়। সেনাবাহিনীর ১০ পদাতিক ডিভিশনের নেতৃত্বে এতে সেনাবাহিনী, বিজিবি, এসআরবি ও পুলিশের শতাধিক সদস্য অংশ নেন। অভিযানকালে মানব পাচারকারীদের কয়েকটি চৌকি ও স্থাপনা ধ্বংস করা হয়। টেকনাফ মডেল থানার ওসি সাইফুল ইসলাম বলেন, ভোর থেকে পাহাড়ে মানব পাচারকারীদের আস্তানায় যৌথ বাহিনী অভিযান চালিয়েছে। এ সময় পাচারকারীদের বেশ কয়েকটি চৌকি ও স্থাপনা ধ্বংস করা হয়। আগের রাতে পাহাড়ে মরদেহ পড়ে থাকার খবর তারাও পেয়েছিলেন। তবে অভিযানে কোনও মরদেহ পাওয়া যায়নি। সেগুলো সরিয়ে নেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি।
অভিযানে অংশ নেওয়া স্থানীয় বাসিন্দা মাঈন উদ্দিন ভুট্টা বলেন, সকাল থেকে যৌথ বাহিনীর সঙ্গে পাহাড়ে গিয়েছি। সেখানে কোনও মরদেহ পাওয়া যায়নি। শুধু কয়েকটি রান্নার পাতিল ও বিছানা পাওয়া গেছে। পাহাড়টি এতটাই দুর্গম যে, মরদেহ থাকলেও খুঁজে পাওয়া কঠিন। পাচারকারীরা পাহাড়ের প্রতিটি পথঘাট চেনে। অভিযান চালানো হবে বুঝতে পেরে তারা মরদেহ সরিয়ে ফেলতে পারে।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) একই পাহাড়ে যৌথ বাহিনীর অভিযানে একটি বন্দিশালা থেকে ৫৬ জনকে উদ্ধার করা হয়। তাদের মধ্যে ছয়জন রোহিঙ্গা এবং ৫০ জন বাংলাদেশি। এ সময় মানব পাচারকারী চক্রের পাঁচ সদস্যকে আটক করা হয়। অভিযান চলাকালে পাচারকারীদের সঙ্গে যৌথ বাহিনীর সদস্যদের গোলাগুলি হয়। এতে পাচারকারীদের গুলিতে সেনাবাহিনীর সৈনিক মোহাম্মদ তিতাস শেখ (২৭) নিহত হন। শুক্রবার সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ফরিদপুরের নগরকান্দায় নিজ গ্রামে তাকে দাফন করা হয়।
উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের কয়েকজন পাহাড়ে একাধিক মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেছেন বলে দাবি করেছিলেন। শুক্রবার টেকনাফ মডেল থানায় পরিবারের কাছে হস্তান্তরের সময় ভুক্তভোগী শহিদুল ইসলাম জানান, দুই পক্ষের গোলাগুলিতে একাধিক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। তবে তারা ডাকাত দলের সদস্য, নাকি বন্দিশালা থেকে পালানোর চেষ্টা করা কেউ, তা নিশ্চিত নন তিনি। বন্দিশালার কাছেই মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেছেন বলেও দাবি করেন শহিদুল।
উদ্ধার হওয়া আরেক ভুক্তভোগী আসাদুজ্জামান জানান, চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে তাকে কক্সবাজারে ডেকে নেওয়ার পর পাহাড়ের একটি আস্তানায় আটকে রাখা হয়। সেখানে আট দিন বন্দি ছিলেন তিনি। দুইবার পালানোর চেষ্টা করেও সফল হননি। তার ভাষ্য, বন্দিশালায় ৫০ জনের বেশি মানুষ ছিলেন। তাদের সাগরপথে পাচারের প্রস্তুতি চলছিল। সশস্ত্র ব্যক্তিরা আস্তানাটি পাহারা দিতেন। বন্দিদের মোবাইল ফোনসহ ব্যক্তিগত জিনিসপত্রও কেড়ে নেওয়া হয়েছিল।
পাহাড়ে মানব পাচারকারীদের আস্তানায় ধারাবাহিক অভিযান, গোলাগুলি এবং সেনাসদস্য নিহতের ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে পাশের লেদা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। ক্যাম্পের পাহাড়সংলগ্ন অংশে প্রায় তিন থেকে চার হাজার রোহিঙ্গার বসতি রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে পাহাড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা বেড়ে যাওয়ায় নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন তারা।
ক্যাম্পের মাঝি নবী হোসেন বলেন, পাহাড়ঘেষা ক্যাম্পের পাশে প্রায় চার হাজার মানুষের বসতি। এসব ঘটনার পর থেকে ক্যাম্পের লোকজন ভয়ভীতির মধ্যে রয়েছেন। গত কয়েক দিন ধরে পাহাড়ে যৌথ বাহিনী অভিযান চালাচ্ছে।
ক্যাম্পের বাসিন্দা মরিয়ম খাতুন (৫০) বলেন, সকাল থেকে পাহাড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চলাচল বেড়েছে। এর আগে কয়েক দিন পাহাড় থেকে গুলির শব্দ শোনা গেছে। সব মিলিয়ে পুরো এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
এদিকে টেকনাফ পরিদর্শনকালে কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান বলেন, যত দিন সাগরপথে মানবপাচার চলবে, তত দিন আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে।