ঢাকা বুধবার, ১১ মার্চ ২০২৬, ২৬ ফাল্গুন ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

রোজা মুত্তাকিদের জন্য লাগাম

শায়খ ড. আবদুর রহমান আস সুদাইস
রোজা মুত্তাকিদের জন্য লাগাম

রমজান মুসলিম জাতির আনন্দের মাস। এ মাসের মতো আর কোনো মাস হয় না। এটি একটি সুরভিত মাস। কল্যাণে পরিপূর্ণ। শ্রেষ্ঠত্ব যার সুস্পষ্ট। এ মাসে কালের আঁধার দিগন্তে যেন হয় আলোকিত নক্ষত্রোদয়। আমাদের মাঝে এই মহিমান্বিত রমজান আবার ফিরে এসেছে। কবি বলেন, ‘কবুলিয়তের মৃদু বাতাস বইছে। কল্যাণের স্রোতধারা প্রবাহিত হচ্ছে। শয়তান শৃঙ্খলিত ও বরবাদ হয়েছে।’ আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘রমজান এলে শয়তানকে শৃঙ্খলিত করা হয়। জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়। এরপর (পুরো রমজান) আর তা বন্ধ করা হয় না। জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর (পুরো রমজান) আর তা খোলা হয় না। একজন ঘোষক ঘোষণা করে, হে কল্যাণ অন্বেষী! অগ্রসর হও। হে অনিষ্ট সন্ধানী! থামো। আল্লাহ এ মাসের প্রতি রাতেই কিছু মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করেন।’ (তিরমিজি)। কবি বলেন, ‘এসেছে রমজান প্রভূত কল্যাণ লয়ে। এখানে সদা হয় কোরআনের তেলাওয়াত, গাওয়া হয় মাহিমা খোদার। মানুষ অভ্যস্ত হয় সুন্দর কথায় ও কাজে। দিনে হয় রোজা, আর রাতে তারাবির নামাজ।’

রমজানের পবিত্রতা রক্ষা : খাঁটি তওবা, পবিত্র জীবনযাপন ও মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে রমজানকে বরণ করে নিতে হবে। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তার লাগাম পরাতে হবে। সেগুলোর ওপর তাকওয়া-পরহেজগারির পাহাদার নিযুক্ত করা চাই। দোষমুক্ততা ও ছিদ্রযুক্ত হওয়া থেকে রোজাকে রক্ষা করতে হবে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘রোজা ঢালস্বরূপ। মানুষ তা দ্বারা জাহান্নামের আগুন প্রতিরোধ করে।’ (মুসনাদে আহমদ)। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের রোজা ছাড়া রোজার ঢাল হয়ে ওঠা সম্ভব নয়। অনর্থক ও কষ্টদায়ক কথাবার্তা থেকে জবান পবিত্র রাখতে হবে। দৃষ্টি অবনত রাখতে হবে। যেন তা হারাম স্থানে পতিত না হয়। নিন্দনীয় কোনো দিকে অগ্রসর হওয়া থেকে পা ঠেকিয়ে রাখতে হবে। কাউকে কষ্ট দেওয়া থেকে হাত গুটিয়ে রাখতে হবে। দানশীলতার হাত প্রশস্ত করতে হবে। ভীত ও বিশুদ্ধচিত্তে আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করে প্রার্থনা করতে হবে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘অনেক রোজাদার এমন রয়েছে, রোজা রেখে তার ক্ষুধার্ত থাকা ছাড়া আর কিছু অর্জন হয় না। তদ্রুপ অনেক রাতের নামাজ আদায়কারী এমন রয়েছে, রাত্রি জাগরণ ছাড়া নামাজ থেকে তার আর কিছু লাভ হয় না।’ (সুনানে নাসাঈ)।

রোজার উদ্দেশ্য : রোজার উদ্দেশ্য আত্মা পরিশুদ্ধ করা। আধ্যাত্মিক অবস্থার উন্নতি সাধন করা। আত্মাকে মলিনতা থেকে রক্ষা করা ও তাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা। তাকওয়াই হলো রোজার বিধান প্রণয়নের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য। ইমাম ইবনুল কায়্যিম (রহ.) বলেন, ‘রোজা মুত্তাকিদের জন্য লাগামস্বরূপ। লড়াইকারীদের জন্য ঢালস্বরূপ। আর আধ্যাত্মিকতার সাধকদের জন্য এটি উন্নতমানের সাধনা-পদ্ধতি। অন্যান্য আমলের পাশাপাশি এটি আল্লাহর জন্য একটি বিশেষ আমল। বান্দা ও রবের মাঝে এক গোপন রহস্য। আল্লাহ ছাড়া রোজার ব্যাপারে আর কেউ নিশ্চিতভাবে জানতে পারে না।’ ইমাম কামাল ইবনুল হুমাম (রহ.) বলেন, ‘রোজা পাপাত্মাকে মন্দ কাজ থেকে নিবৃত রাখে। তার শক্তি চূর্ণ করে দেয়। এর মাধ্যমে সব অঙ্গকে অনর্থক কাজ থেকে বিরত রাখে।’

রমজান ও কোরআন : রমজান মাসেই কোরআন নাজিল হয়েছে। জিবরাইল (আ.) এ মাসে রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে কোরআনের দাওর করতেন। রাসুল (সা.) বলেন, ‘কোরআন ও রমজান বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। রোজা বলবে, হে রব! আমি তাকে দিনে পানাহার ও প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণ থেকে ঠেকিয়ে রেখেছি। তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। কোরআন বলবে, আমি তাকে রাতে নিদ্রা থেকে বিরত রেখেছি। তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন।’ রাসুল (সা.) বলেন, ‘রমজান ও কোরআনের সুপারিশ গ্রহণ করা হবে।’ (মুসনাদে আহমদ)। কতই না মহান মাস রমজান! এ মাসে আল্লাহর নেয়ামত বর্ষিত হতে থাকে অবারিত ধারায়। মানুষের অন্তর সুন্দর সুন্দর অভ্যাস ও আচরণে সজীবতা লাভ করে। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন, ‘যে সঠিক পথপ্রাপ্তির প্রত্যাশায় কোরআনে ধ্যানমগ্ন হবে, তার জন্য সত্যের পথ স্পষ্ট হয়ে যাবে।’

রমজানে দানশীলতা : রমজানের ক্ষেত্রে আমাদের রাসুল (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণ করতে হবে। তিনি রমজানে সবচেয়ে বেশি দান করতেন। এমন কিছু বিশেষ নেক আমল রমজানে করতেন, যা অন্য মাসে এত পরিমাণে করতে দেখা যেত না। রাসুল (সা.)-এর রমজান কাটত জিকির, ইস্তেগফার, কোরআন তেলাওয়াত, দান-সদকা ইত্যাদি নেক আমলের মাধ্যমে। এখানে আমরা বিশেষভাবে জাকাত আদায়ের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করব। আমাদের আনন্দচিত্তে সম্পদের জাকাত আদায় করতে হবে। দরিদ্রদের প্রয়োজনের প্রতি লক্ষ্য রেখে অতিরিক্ত দান-সদকাও করা চাই।

ব্যক্তি ও জাতিগত উন্নয়ন : রমজান ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে শুরু করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়নের এক সুবর্ণ সুযোগ। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ কোনো জাতির ভাগ্য ততক্ষণ পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেরা তা পরিবর্তন করে।’ (সুরা রাদ : ১১)। এটি জাতির কোরআন-সুন্নাহ আঁকড়ে ধরা, বিভিন্ন ক্ষেত্রে মতবিরোধ দূর করা, সংকট উত্তরণ, পরস্পর শান্তি-শৃঙ্খলা স্থাপনের এক উপযুক্ত মৌসুম। যুদ্ধবিরতি, নিরাপত্তাবিধান, স্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টিকরণ, নির্মাণ ও প্রবৃদ্ধি অর্জন এ মাসে খুবই সহজ। মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে এ মাসের পবিত্রতা তুলে ধরতে হবে। যারা বিচ্ছিন্নতাবাদী, দেশদ্রোহী, দ্বীনের কাজে বাঁধা দেয়, সমাজে ঝগড়া-বিবাদের প্রসার ঘটাতে চায়, তাদের প্রতিহত করতে হবে। সমাজে সহনশীলতা, সৌহার্দ্য ও মধ্যপন্থার প্রচলন ঘটাতে হবে।

আরবি থেকে অনুবাদ : মুইনুল ইসলাম

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত