ঢাকা সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ৩০ চৈত্র ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

সরকার নির্ধারিত দামে মিলছে না এলপিজি

সরকার নির্ধারিত দামে মিলছে না এলপিজি

সরকারের বেঁধে দেওয়া দামে মিলছে না এলপিজি সিলিন্ডার। ১২ কেজির একটি এলপিজি সিলিন্ডারের সরকারি দাম ১ হাজার ৭২৮ টাকা। প্রয়োজনের তাগিদে অতিরিক্ত ২৭২ টাকা বেশি দিয়ে সিলিন্ডার কিনছেন গ্রাহকরা। চট্টগ্রাম নগরের বেশ কয়েকজন বাসিন্দা অভিযোগ করেন, সরকারি দামে কেউ সিলিন্ডার বিক্রি করছেন না। ২ এপ্রিল বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) নতুন দাম ঘোষণা করে। প্রতি কেজিতে ৩২ টাকা ৩০ পয়সা বাড়ানো হলেও সেই দামে সিলিন্ডার মিলছে না­- এমন অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ে। অভিযোগের বাস্তবতা যাচাই করতে নগরের হিলভিউ, টেকনিক্যাল মোড়, ষোলশহর, উত্তর কাট্টলি, এনায়েতবাজার ও ২ নম্বর গেট এলাকায় কয়েকটি বড় দোকান ঘুরে দেখা যায়, ১২ কেজির সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৮৫০ থেকে ২ হাজার ১০০ টাকা পর্যন্ত। অর্থাৎ নির্ধারিত দামের চেয়ে ১২২ থেকে ৩৭২ টাকা পর্যন্ত বেশি নিচ্ছেন বিক্রেতারা। ষোলশহরের একটি দোকানে দাঁড়িয়ে ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলতে বলতেই নিজের অবস্থার কথা তুলে ধরেন বিক্রেতা মো. সাহাব উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘আমরা ইচ্ছা করে বাড়তি নিচ্ছি না। পরিবেশকের কাছ থেকেই বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। না হলে সরকারি দামে বিক্রি করতে আপত্তি কোথায়?’

সাহাব উদ্দিনের দোকানের নাম মেসার্স আরমান এন্টারপ্রাইজ। তিনি জানান, ওমেরা ২ হাজার ১০০ টাকা, বেক্সিমকো ২ হাজার ৫০, ইউনিগ্যাস ২ হাজার, বিএম ১ হাজার ৯০০ টাকায় বিক্রি করছেন তিনি। শহরের পলিটেকনিক্যাল এলাকার পুরোনো প্রতিষ্ঠান মেসার্স মোহাম্মদীয়া ট্রেডিংয়ে প্রতিদিন দু-তিন শতাধিক সিলিন্ডার বিক্রি হয়। প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার মুহাম্মদ আলী আজম বলেন, পরিবেশক পর্যায়েই দাম ১ হাজার ৮০০ থেকে ১ হাজার ৯০০ টাকায় উঠেছে। এর মধ্যে আবার বলা হচ্ছে, জাহাজভাড়া বেড়েছে। আমদানি খরচ বেড়েছে। এ অবস্থায় সরকারি দামে বিক্রি করা বাস্তবে সম্ভব হচ্ছে না।

পরিবেশকরে কাছ থেকেও একই কথা শোনা গেল। তাদের দাবি, কোম্পানি থেকেই বেশি দামে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে। ৫ এপ্রিল বাড়তি দামের বিষয়টি নিয়ে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছে চট্টগ্রাম মহানগর এলপি গ্যাস ডিস্ট্রিবিউটরস-ডিলারস অ্যাসোসিয়েশন। এতে বলা হয়েছে, ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার কোম্পানি থেকে ১ হাজার ৬৩৩ টাকায় পাওয়ার কথা রয়েছে। বাস্তবে কিনতে হচ্ছে ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৯৪০ টাকায়, এমনকি আগের মতো কমিশনও পাচ্ছেন না পরিবেশকেরা। ফলে খুচরা পর্যায়ে এসে দাম আরও বেড়ে যাচ্ছে।

অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাইফুল আলম বলেন, ‘আমাদের হিসাব মিলছে না। এ অবস্থায় ব্যবসা চালানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে। তাই কোম্পানি থেকে সরকার নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার না পেলে ১৮ এপ্রিল থেকে চট্টগ্রামে সিলিন্ডার বিক্রি বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

৭ এপ্রিল জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসকরে বাড়তি দামে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি বন্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণে একটি চিঠি দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে ৮ এপ্রিল আমদানিকারক কোম্পানিগুলোর সংগঠন ‘এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এলওএবি)’ সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠায়। তারা সরকার নির্ধারিত মূল্যে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি করতে সব পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাকে অনুরোধ জানিয়ে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এলপিজি বোতলজাতকারী প্রতিষ্ঠান থেকে সরকার নির্ধারিত মূল্যেই সিলিন্ডার সরবরাহ করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে এলপিজি অপারেটর অব বাংলাদেশের সভাপতি ও ডেল্টা এলপিজি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, তারা এরইমধ্যে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের সরকারি দামে বিক্রির জন্য অনুরোধ করেছেন। তিনি আশা করেন, সবাই যার যার জায়গা থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে।

বাড়তি খরচের চাপ : নগরের ২ নম্বর গেট এলাকায় ৪ তলা একটি ভবনে ১২টি ফ্ল্যাটের সব বাসিন্দাই এলপিজির ওপর নির্ভরশীল। সেখানে ভাড়া থাকেন স্কুলশিক্ষক জহিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, একটি সিলিন্ডার এক মাসেই শেষ হয়, কখনও ২০ দিনেই। দাম একটু বাড়লেই মাসের হিসাব মেলাতে কষ্ট হয়ে যায়। একই ধরনের চাপের কথা বললেন আতুরার ডিপো এলাকার বাসিন্দা মাহবুব হাসান।

একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন তিনি। মাসিক আয় সাকল্যে ২৫ হাজার টাকা। তার পরিবারের জন্য মাসে একটি সিলিন্ডার লাগে। তিনি বলেন, ঘরভাড়া, বাজার খরচ, সব মেলাতে গিয়ে এমনিতেই কষ্ট হয়। এখন গ্যাসের জন্য বাড়তি টাকা দিতে হচ্ছে। সেটা বড় চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশে বছরে প্রায় ১৭ লাখ টন এলপিজির চাহিদা রয়েছে, যা ১৮টি দেশ থেকে আমদানি করা হয়। ২৮টি কোম্পানি এই খাতে কাজ করলেও আমদানির বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে হাতে গুনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। সরকার এলপিজির দাম নির্ধারণ করলেও সেটির প্রতিফলন মাঠে নেই বলে মনে করেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত