প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৪ মে, ২০২৬
ইসলাম পৃথিবীতে এসেছে একমাত্র আল্লাহর ইবাদত প্রতিষ্ঠা করতে, এই ইবাদতের ভিত্তি মজবুত করতে, এবং আল্লাহর বান্দাদের ওপর তাঁর যে অবশ্যকরণীয় অধিকার আছে, তাঁর রাসুল (সা.)-এর যে অধিকার আছে এবং মানুষের একে অপরের ওপর যে অধিকার আছে তা পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করতে; যাতে মুসলিম ব্যক্তি আল্লাহর একজন বান্দা হয়ে ওঠে ও আল্লাহতায়ালার এই বাণীর অন্তর্ভুক্ত হয়, ‘আর কেউ আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য করলে সে নবী, সত্যনিষ্ঠ, শহীদ ও সৎকর্মপরায়ণ- যাদের প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন- তাদের সঙ্গী হবে। তারা কত উত্তম সঙ্গী!’ (সুরা নিসা: ৬৯)।
উলামায়ে কেরাম বলেছেন, ‘সৎ ব্যক্তি সে-ই, যে আল্লাহর হক ও বান্দাদের হক আদায় করে; ফলে সে নামাজের তাশাহহুদে পাঠ করা এই দোয়ার অন্তর্ভুক্ত হয়, ‘আমাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক এবং আল্লাহর সৎ বান্দাদের উপরও।’ আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর ইবাদত করবে ও কোন কিছুকে তাঁর শরীক করবে না।
পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, এতিম, অভাবগ্রস্ত, নিকট-প্রতিবেশী, দূর-প্রতিবেশী, সঙ্গী-সাথী, মুসাফির ও তোমাদের অধিকারভুক্ত দাস-দাসীদের প্রতি সদ্ব্যবহার করবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ পছন্দ করেন না দাম্ভিক, অহংকারীকে।’ (সুরা নিসা : ৩৬)। আলেমগণ বলেন, ‘এটিকে ‘অধিকারসমূহের আয়াত’ বলা হয়।’ মহান আল্লাহ আরও বলেন, ‘নবী মুমিনদের নিকট তাদের নিজেদের অপেক্ষা ঘনিষ্ঠতর।’ (সুরা আহজাব : ৬)।
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, ‘মদীনাবাসী ও এদের পার্শ্ববর্তী মরুবাসীদের জন্য সঙ্গত নয় আল্লাহর রাসূলের সহগামী না হয়ে পেছনে থেকে যাওয়া এবং তাঁর জীবন অপেক্ষা তাদের নিজেদের জীবনকে প্রিয় জ্ঞান করা।’ (সুরা তাওবা : ১২০) মহান আল্লাহ আরও বলেন, ‘আর আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর, যদি তোমরা মুমিন হও।’ (সূরা আনফাল: ১)।
এরপর ইসলাম এসেছে পৃথিবীতে নিরাপত্তা, শান্তি ও রহমত প্রতিষ্ঠার জন্য। এই ধর্ম প্রথমে মুসলিমের নিরাপত্তার প্রতি গুরুত্ব দিয়েছে ও ঈমানের ভিত্তি স্থাপন করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যারা ঈমান এনেছে আর তাদের ঈমানকে জুলুম দিয়ে কলুষিত করে নি, নিরাপত্তা তাদেরই জন্যে আর তারাই সৎপথপ্রাপ্ত।’ (সুরা আনআম : ৮২)। অতএব, যে ব্যক্তি পূর্ণ ঈমান অর্জন করে এবং আল্লাহ তাকে জুলুম থেকে, অর্থাৎ শিরকের সব ধরন থেকে, নিজের ওপর গোনাহের মাধ্যমে জুলুম থেকে ও অন্যদের ওপর জুলুম থেকে রক্ষা করেন, তার জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে পূর্ণ নিরাপত্তা থাকবে; এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে এমন প্রতিশ্রুতি যা কখনো ভঙ্গ হবে না।
আর যার ঈমানে ঘাটতি থাকে এবং সে নিজের বা অন্যের ওপর কোনো জুলুম করে, তার দুনিয়া ও আখেরাতের নিরাপত্তা ও সুখ ততটাই কমে যায়, যতটা তার তাওহীদ ও সৎপথে অবিচলতার ঘাটতি থাকে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা ঈমান এনেছে আর তাদের ঈমানকে জুলুম দিয়ে কলুষিত করে নি, নিরাপত্তা তাদেরই জন্যে আর তারাই সৎপথপ্রাপ্ত।’ (সুরা আনআম : ৮২)। তিনি আরও বলেন, ‘যারা ঈমান আনে এবং আল্লাহর স্মরণে যাদের চিত্ত প্রশান্ত হয়; জেনে রাখ, আল্লাহর স্মরণেই চিত্ত প্রশান্ত হয়; ‘যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, পরম আনন্দ ও শুভ পরিণাম তাদেরই।’ (সুরা রাদ : ২৮-২৯)। তিনি আরও বলেন, ‘মুমিন হয়ে পুরুষ ও নারীর মধ্যে যে কেউ সৎকর্ম করবে তাকে আমি নিশ্চয়ই পবিত্র জীবন দান করব। আর তাদের তাদের কর্মের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার দান করব।’ (সুরা নাহল : ৯৭)।
আর যখন আল্লাহ কোনো দেশকে নিরাপত্তা ও শান্তি দান করেন, তখন ধর্ম সেখানে সুস্পষ্ট, শক্তিশালী ও সম্মানিত হয়ে ওঠে; নামাজ, জুমা ও জামাত প্রতিষ্ঠিত হয়; মানুষের কাজকর্ম, ব্যবসা-বাণিজ্য, উপকার ও কল্যাণসমূহ সুশৃঙ্খল হয়; মানুষ তাদের জীবন, সম্মান ও সম্পদের নিরাপত্তা পায়; সভ্যতা উন্নত হয়; পথঘাট নিরাপদ হয়; শহরগুলো পরস্পরের সাথে সংযুক্ত হয়; দেশগুলো মানুষের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আদান-প্রদান করে; রিজিক সহজলভ্য হয়; সমৃদ্ধি ছড়িয়ে পড়ে; সম্পদ বৃদ্ধি পায়; মানুষের মন শান্ত হয়; প্রত্যেকে তার প্রয়োজন পূরণ করতে পারে; গবাদি পশু বৃদ্ধি পায় ও বিস্তার লাভ করে। সুতরাং নিরাপত্তার মধ্যেই সব ধরনের কল্যাণ একত্রিত থাকে। আর নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে সব ধরনের অকল্যাণ একত্রিত হয়। নিরাপত্তা ইসলামের পূর্ণতার একটি অংশ। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘আল্লাহ অবশ্যই এই ইসলামের পূর্ণতা দান করবেন, এমনকি একজন আরোহী সানআ থেকে হাদরামাউত পর্যন্ত ভ্রমণ করবে। সে আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে ভয় করবে না, আর তার পশুর ওপর নেকড়ে ছাড়া অন্য কিছুরও নয়।’ (সহিহ বোখারি : ৩৬১২)।
মহানবী (সা.)-এর জীবদ্দশায় ইসলামের প্রথম যুগেই নিরাপত্তা অত্যন্ত দ্রুত গতিতে বাস্তবায়িত হয়েছিল। তিনি আদী ইবন হাতিম রা.-কে বলেছিলেন, ‘যদি তুমি দীর্ঘ জীবন পাও, তবে অবশ্যই দেখবে যে, একজন নারী হিরা থেকে রওনা হয়ে কাবাঘর তাওয়াফ করবে, সে আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় করবে না।’ আদী বলেন, ‘আমি সেই নারীকে দেখেছি যে, সে হিরা থেকে রওনা হয়ে কাবাঘর তাওয়াফ করেছে, অথচ আল্লাহ ছাড়া সে কাউকে ভয় করেনি।’ (বোখারি : ৩৫৯৫)
এটি সেই সার্বিক নিরাপত্তার একটি উদাহরণ, যা মানবজাতি উপভোগ করেছিল। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন নতুন চাঁদ দেখতেন, তখন বলতেন, ‘হে আল্লাহ! এই চাঁদকে আমাদের ওপর উদিত করুন নিরাপত্তা, ঈমান, সুস্থতা ও ইসলামের সাথে। এটি কল্যাণ ও সঠিক পথের চাঁদ। আমার ও তোমার রব আল্লাহ।’ (সুনানে তিরমিজি)।
ইসলামের ইবাদতসমূহ নিরাপত্তা ছাড়া প্রতিষ্ঠিত হয় না। নামাজ পূর্ণ নিরাপত্তার মধ্যেই আদায় করা হয়। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা সালাতের প্রতি যত্নবান হবে, বিশেষত মধ্যবর্তী সালাতের এবং আল্লাহর উদ্দেশ্যে তোমরা বিনীতভাবে দাঁড়াবে; যদি তোমরা আশঙ্কা কর তবে পদচারী বা আরোহী অবস্থায় সালাত আদায় করবে। আর যখন তোমরা নিরাপদ বোধ কর তখন আল্লাহকে স্মরণ করবে, যেভাবে তিনি তোমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন, যা তোমরা জানতে না।’ (সুরা বাকারা: ২৩৮-২৩৯)। জাকাতও নিরাপত্তা ছাড়া আদায় হয় না। আর হজ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যখন তোমরা নিরাপদ হবে তখন তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি হজ্জের প্রাক্কালে উমরা দিয়ে লাভবান হতে চায় সে সহজলভ্য কুরবানী করবে।’ (সুরা বাকারা: ১৯৬)। তাঁর পবিত্র ঘরে প্রবেশকারীদের নিরাপত্তা সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই মানবজাতির জন্যে সর্বপ্রথম যে গৃহ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তা তো বাক্কায়, এটা বরকতময় ও বিশ্বজগতের দিশারী। এতে অনেক সুস্পষ্ট নিদর্শন আছে, যেমন মাকামে ইবরাহিম। আর যে কেউ সেখানে প্রবেশ করে সে নিরাপদ।’ (সুরা আলে ইমরান : ৯৬-৯৭)।
ইবরাহিম আলাইহিস সালাম তাঁর রবের কাছে দোয়া করেছিলেন, যাতে এই পবিত্র স্থানগুলো নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও ফল-ফলাদিতে সমৃদ্ধ হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘স্মরণ কর, ইবরাহিম বলেছিল, ‘হে আমার প্রতিপালক! এই নগরীকে নিরাপদ কর এবং আমাকে ও আমার পুত্রগণকে প্রতিমা পূজা হতে দূরে রেখ।’ (সুরা ইবরাহিম : ৩৫) আল্লাহ তাআলা উমরাহ পালনকারীদের ওপর নিরাপত্তার অনুগ্রহের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর রাসূলকে স্বপ্নটি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছেন, আল্লাহর ইচ্ছায় তোমরা অবশ্যই মসজিদুল-হারামে প্রবেশ করবে নিরাপদে।’ (সুরা ফাতহ : ২৭)। এ বিষয়ে আরও অনেক আয়াত রয়েছে। জান্নাতও নিরাপত্তা ছাড়া আনন্দদায়ক নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তাদেরকে বলা হবে, ‘তোমরা শান্তি ও নিরাপত্তার সঙ্গে এতে প্রবেশ কর।’ (সুরা হিজর : ৪৬)।
নিরাপত্তা আল্লাহর প্রতি সর্বদা কৃতজ্ঞতা আদায়কে অপরিহার্য করে, যাতে আল্লাহ আরও বৃদ্ধি দান করেন। আর গুনাহ ও পাপ থেকে সতর্ক থাকা জরুরি, কারণ এগুলো শাস্তি নেমে আসার কারণ হয়। নিয়ামত যদি কৃতজ্ঞতার সাথে গ্রহণ করা হয়, তা স্থায়ী হয়; আর অকৃতজ্ঞতা করলে তা চলে যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘স্মরণ কর, তোমাদের প্রতিপালক ঘোষণা করেন, ‘তোমরা কৃতজ্ঞ হলে তোমাদেরকে অবশ্যই অধিক দেব আর অকৃতজ্ঞ হলে অবশ্যই আমার শাস্তি হবে কঠোর।’ (সুরা ইবরাহিম : ০৭)।
তোমরা এমন কিছু মহৎ দিন ও বরকতময় সময়ের সম্মুখীন হচ্ছ; সুতরাং এগুলোকে সৎকর্ম দ্বারা পূর্ণ করো এবং সময় শেষ হওয়ার আগে যতটা সম্ভব ইবাদত নিজের জন্য সঞ্চয় করে নাও। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা তোমাদের ভবিষ্যতের জন্যে কিছু কর এবং আল্লাহ্কেও ভয় কর। আর জেনে রেখো যে, তোমরা আল্লাহর সম্মুখীন হতে যাচ্ছ আর মুমিনগণকে সুসংবাদ দাও।’ (সুরা বাকারা : ২২৩)। মহান আল্লাহ আরও বলেন, ‘তোমরা তোমাদের নিজেদের মঙ্গলের জন্যে ভাল যা কিছু অগ্রিম প্রেরণ করবে তা তোমরা পাবে আল্লাহর নিকট। তা উৎকৃষ্টতর ও পুরস্কার হিসেবে মহত্তর। আর তোমরা ক্ষমা প্রার্থনা কর আল্লাহর নিকট; নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা মুজ্জাম্মিল : ২০)।
হে আদম সন্তান! যতক্ষণ তুমি সুস্থ ও ভালো অবস্থায় আছ এবং সৎকর্ম করার সামর্থ্য রাখো, ততক্ষণ আখেরাতের জন্য আমল করো। হযরত ইবনে আব্বাস রা. বলেন, মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘দুটি নিয়ামত রয়েছে, যেগুলোর ব্যাপারে অনেক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত: স্বাস্থ্য ও অবসর।’ (সুনানে তিরমিজি : ২৩০৪)। বিশ্বনবী (সা.) আরও বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি সকালে এমন অবস্থায় জাগে যে, সে নিজ এলাকায় নিরাপদ, শরীরের সুস্থতা ও দিনের খাদ্য তার কাছে আছে, তাহলে যেন পুরো দুনিয়াই তাকে দেওয়া হয়েছে।’ (সুনানে তিরমিজি : ২৩৪৬)।
(২১-১১-১৪৪৭ হিজরি মোতাবেক ০৮-০৫-২০২৬ খ্রিস্টাব্দে মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবার সংক্ষেপিত অনুবাদ করেছেন জামিয়া ইসলামিয়া ইসলামবাগের মুহাদ্দিস - আবদুল কাইয়ুম শেখ)