ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৫ মার্চ ২০২৬, ২০ ফাল্গুন ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

চীনকে চমকে দিয়ে উ. কোরিয়ার অপেক্ষায় বাংলাদেশ

চীনকে চমকে দিয়ে উ. কোরিয়ার অপেক্ষায় বাংলাদেশ

এএফসি এশিয়ান কাপে একবারই খেলেছিল বাংলাদেশ জাতীয় পুরুষ ফুটবল দল। ১৯৮০ সালে কুয়েতে অনুষ্ঠিত সে আসরে লাল সবুজ দলের হয়ে খেলেছিলেন কাজী সালাউদ্দিন, আশরাফউদ্দিন আহমেদ চুন্নুরা। সেটি ছিল বাংলাদেশের প্রথম এবং শেষ এশিয়া কাপ। এরপর আর খেলার সুযোগ পাননি আলফাজ আহমেদ, জাহিদ হাসান এমিলি ও জামাল ভূঁইয়ারা। সাড়ে চার দশকেরও বেশি সময় পর আবারও এশিয়ান কাপ ফুটবলে খেলছে বাংলাদেশ। তবে ছেলেরা নয়, এবার খেলছেন মেয়েরা। গত মঙ্গলবার অস্ট্রেলিয়ার সিডনির কমব্যাঙ্ক স্টেডিয়ামে চ্যাম্পিয়ন চীনের মুখোমুখি হয়েছিলেন আফঈদা খন্দোকার, ঋতুপর্ণা চাকমারা। শক্তিশালী চীনের বিপক্ষে অভিষেকেই দুর্দান্ত নৈপুণ্য দেখিয়েছে লাল সবুজের মেয়েরা। শেষ পর্যন্ত ২-০ গোলে হারলেও দর্শকের মন জিতেছেন তারা। ৯বারের চ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে সমান তালে লড়েছেন পিটার বাটলারের শিষ্যরা।

এটা বাংলাদেশ নারী ফুটবল নিয়ে দীর্ঘদিনের পরিকল্পনার ফল। এটি ধরে রেখে সামনে এগোতে পারলে ভবিষ্যতে অবশ্যই ভাল ফল পাবে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল। সাবেক কোচ গোলাম রব্বানী ছোটনের হাত ধরে বিভিন্ন বয়সভিত্তিক দলের আঞ্চলিক টুর্নামেন্টে ভাল ফল পেয়েছিল মেয়েরা। তার বিদায়ের পর জাতীয় নারী দলের দায়িত্ব নেন পিটার জেমস বাটলার। এ ব্রিট্রিশ কোচের অধিনে ইতিহাস গড়ে প্রথমবার মেয়েদের এশিয়ান কাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে আফঈদা-ঋতুপর্ণারা। নিজেদের ফুটবল ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায় শুরু করলেন বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল।

লাল সবুজ দলের মেয়েদের এ ম্যাচ ঘিরে সিডনিতে থাকা বাংলাদেশিদের উন্মাদনা ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রথমবারের মতো এশিয়ার নারী ফুটবলের সর্বোচ্চ আঙিনায় আফঈদা-ঋতুপর্ণাদের প্রথম পা রাখার মুহূর্তটি স্মরণীয় করে রাখতে লাল-সবুজের পতাকা নিয়ে, জার্সি গায়ে জড়িয়ে গ্যালারিতে আসেন অনেকে। তবে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ ছিল শক্তিশালী চীন। যারা প্রতিযোগিতায় রেকর্ড ৯ বারের চ্যাম্পিয়ন, বর্তমান শিরোপাধারীও। ফিফা র‍্যাংকিংয়ে চীন বিশ্বে ১৭তম, এশিয়ায় চতুর্থ। ১৯৯৯ সালে ফিফা বিশ্বকাপের রানার্সআপ। অন্যদিকে, বাংলাদেশ এবারই প্রথম পা রেখেছে এ মঞ্চে। র‍্যাংকিংয়ে অবস্থান ১১২তম। তারপরও সমর্থকদের কেউ কেউ এ ‘অসম’ লড়াইয়ে বাংলাদেশের পক্ষে বাজি ধরতেও পিছপা হননি। রোমাঞ্চ নিয়ে লড়াইয়ের প্রত্যয় আফঈদা-ঋতুপর্ণারাও জানিয়েছিলেন ম্যাচের আগে।

শক্তিশালী চীনের বিপক্ষে শুরুর একাদশে পোস্টে মিলি আক্তারকে রেখে বাংলাদেশ কোচ পিটার জেমস বাটলার একটু চমকই দেখান। দুটি নারী সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ী এবং গত নারী ফুটবল লিগে খেলা ১০ ম্যাচের সবগুলোতে ‘ক্লিনশিট’ রাখা রূপনা চাকমা এতদিন ছিলেন প্রথম পছন্দের গোলরক্ষক। তাকে বেঞ্চে রেখে মিলির তরুণ কাঁধে আস্থা রাখেন বাটলার। শুরু থেকেই চীন খেলেছে উচ্চ ডিফেন্স লাইনে। মাঝমাঠে দখল প্রতিষ্ঠা করে উইং দিয়ে আক্রমণ সাজানো ছিল তাদের মূল কৌশল। প্রথম ১০ মিনিটেই কয়েকটি আক্রমণ, কর্নার এবং দূরপাল্লার শট- বাংলাদেশের রক্ষণভাগকে ব্যস্ত রাখে। তবে গোলকিপার মিলির আত্মবিশ্বাসী অবস্থান, শিউলি আজিমের গোললাইন ক্লিয়ারেন্স এবং ডিফেন্সের সংগঠিত অবস্থান চীনের একাধিক সুযোগ ভেস্তে দেয়। তারপরও প্রথমার্ধের শেষ দিকে দুই গোল হজম করলেও বাকি সময়টায় ভালোভাবেই ম্যাচে ছিল লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। এমনকি ঋতুপর্ণা চাকমা তৈরি করেছিলেন এক দারুণ গোলের সুযোগ। প্রথমার্ধ্বে চীনের হয়ে গোল দুটি করেন ওয়াং শুয়াং ও যাং রুই। দ্বিতীয়ার্ধ্বে তারা কোন গোল করতে পারেননি, এমনকি দু’একটি ছাড়া নিশ্চিত কোনো সুযোগও পায়নি বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা।

ঐতিহাসিক ম্যাচে হার দিয়ে আসর শুরু করলেও নয়বারের এশিয়ান চ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে চোয়ালবদ্ধ দৃঢ়তা দেখিয়ে সমীহ আদায় করেছে বাংলাদেশের মেয়েরা।

১১ মিনিটে দারুণ দক্ষতায় বাংলাদেশকে বাঁচান মিলি আক্তার। ১৪ মিনিটে ঋতুপর্ণা দেখান অসাধারণ ঝলক। অনেক দূর থেকে দুর্দান্ত শট নেন তিনি, যা অসম্ভব ক্ষীপ্রতায় প্রতিহত করেন চীনের গোলরক্ষক। ১৯ মিনিটে বাংলাদেশের গোলবারে আরেকবার ঢুকেও সফল হয়নি চীন। মিলিকে কাটিয়েও বল জালে জড়াতে পারেননি চীনের ফরোয়ার্ড। পরের মিনিটে আরেকটি দারুণ সেইভ করেন মিলি। ২৪ মিনিটে ওয়াং শুয়াং বল জালে জড়ালেও অফসাইডের কারণে ভিএআরে তা বাতিল হয়ে যায়। তবে বেশিক্ষণ থামানো যায়নি ওয়াং শুয়াংকে। ৪৪ মিনিটে দূরপাল্লার শটে প্রথম গোল করেন তিনি। এক মিনিট পর ব্যবধান দ্বিগুণ করেন যাং রুই। দুই গোলের লিড নিয়ে বিরতি থেকে ফিরেও বাংলাদেশের রক্ষণে গিয়ে খেই হারাতে থাকে চীন। গোলবারের নিচে মিলি একাধিকবার বাঁচান বাংলাদেশকে। রক্ষণে নবিরন, আফঈদারা খেলেন উজাড় করে। চীনের একাধিক শট লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ায় তাদের ব্যবধান বাড়ানো কঠিন হয়ে যায়। রক্ষণ জমাট রেখে শেষ দিকেও চীনকে বারবার প্রতিহত করে বাংলাদেশ। প্রতি-আক্রমণে গিয়ে তাদের রক্ষণভাগেও একাধিকবার রোমাঞ্চ ছড়ায় লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। বাংলাদেশের জার্সিতে আনিকা রানিয়া সিদ্দিকীর অভিষেক ৮৬তম মিনিটে। শামসুন্নাহার জুনিয়রের বদলি নামেন সুইডেন প্রবাসী এই মিডফিল্ডার। প্রবাসী আনিকা মাঠে নামতেই অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী বাংলাদেশিরা ‘বাংলাদেশ-বাংলাদেশ’ স্লোগানে আওয়াজ তোলেন গ্যালারিতে।

নির্ধারিত সময় পেরিয়ে অতিরিক্ত আট মিনিটেও স্লোগানে, হর্ষোল্লাসে গ্যালারি মুখরিত করে রাখেন সমর্থকেরা। দ্বিতীয়ার্ধে দল আর কোনো গোল হজম না করলেও, তহুরা-মনিকাদের মতো তারাও শেষ পর্যন্ত মাঠ ছাড়েন হারের হতাশা নিয়ে। গতকাল বুধবার সকালে সিডনির জুবিলি স্টেডিয়ামে অনুশীলন করে বাংলাদেশ দল। অনুশীলন শেষে মারিয়া মান্দা বলেন, ‘আমরা একটা কঠিন দলের সঙ্গে খেলেছি। আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি...আমাদের যে চেষ্টা ছিল সে চেষ্টাকে আসলে আমরা সফল করতে পেরেছি।’ ৯ বারের চ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে লড়াই নিয়ে তার মূল্যায়ন, ‘৯ বার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে যে টিম, সেই টিমের সঙ্গে আমরা মাত্র দুই গোল খেয়েছি। তো ওইটা আসলে আমাদের জন্য অনেক কিছু শেখার।’

ম্যাচ শেষে খেলোয়াড়েরা পরিশ্রান্ত ছিলেন। রাতের খাবার সেরে সবাই দ্রুত বিশ্রামে চলে যান। বোনাসের বিষয়ে কোনো আলোচনার সুযোগ ছিল না জানান মারিয়া, ‘আসলে খেলার শেষে আমরা ওই মুহূর্তে টায়ার্ড ছিলাম তো তাই আমরা এগুলো বিষয় নিয়ে আর কিছু বলিনি স্যারকে। তবে ফেডারেশন প্রেসিডেন্ট খেলোয়াড়দের উৎসাহিত করেছেন এবং পরবর্তী ম্যাচের জন্য প্রস্তুত থাকতে বলেছেন।’ দলের অন্যতম প্রাপ্তি ছিল গোলকিপার মিলির দুর্দান্ত নৈপুণ্য। মারিয়া তার প্রশংসা করে বলেন, ‘যদিও শুরুতে কিছুটা সংশয় ছিল যে, সে কেমন করবে। কিন্তু তারপরেও ওটা বুঝতে দেয়নি সে আমাদের। সে নিজের পারফরম্যান্সটা ভালোভাবে দিয়েছে। আমাদের মনের ভেতর আস্থা ছিল তাকে নিয়ে।’ গ্রুপে নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচে আগামীকাল তিনবারের চ্যাম্পিয়ন উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে খেলবে বাংলাদেশ।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত