
বয়স ৩৪ ছুঁয়েছে। এখনও ব্রাজিলের স্বপ্নের অন্যতম প্রতীক! কিন্তু বার বার বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় চোট। দীর্ঘ পুনর্বাসন এবং একের পর এক বাধা পেরিয়ে ৯৮১ দিন পর আবারও বিশ্বকাপের মঞ্চে ফিরলেন নেইমার জুনিয়র। ব্রাজিলের জার্সি গায়ে নেইমারের ফেরার মুহূর্তটা যেন শুধু একটি ফুটবল ম্যাচের অংশ ছিল না, ছিল দীর্ঘ এক অপেক্ষার শেষ অধ্যায়। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের ৭৬তম মিনিটে যখন মাঠে পা রাখলেন ব্রাজিলের সর্বোচ্চ গোলদাতা, তখন মায়ামি স্টেডিয়ামের গ্যালারি যেন একসঙ্গে শ্বাস নিল। করতালি, উল্লাস আর ‘নেইমার, নেইমার’ ধ্বনিতে স্বাগত জানানো হলো এক প্রিয় তারকাকে, যিনি প্রায় তিন বছর পর ফিরলেন দেশের জার্সিতে।
ব্রাজিল ৩-০ গোলে স্কটল্যান্ডকে হারিয়ে ‘সি’ গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে নকআউটে উঠেছে। কিন্তু ম্যাচের সবচেয়ে বড় গল্প হয়ে থাকল নেইমারের প্রত্যাবর্তন। ৯৮১ দিনের অপেক্ষা, চোটের যন্ত্রণা, অনিশ্চয়তা আর সমালোচনার পর আবারও হলুদ জার্সিতে দেখা গেল ১০ নম্বরকে। ম্যাচের আগে ব্রাজিল কোচ কার্লো আনচেলত্তি জানিয়েছিলেন, নেইমার খেলবেন। তবে শুরুতে তাকে বেঞ্চেই রাখা হয়। দলের ৯ নম্বর জার্সির মাতেউস কুনিয়াকে তুলে ১০ নম্বর জার্সির নেইমারকে মাঠে নামানোর সিদ্ধান্ত নেন আনচেলত্তি। কুনিয়াও যেন জানতেন এই মুহূর্তের গুরুত্ব। মাঠ ছাড়ার আগে হাসিমুখে জড়িয়ে ধরেন নেইমারকে।
এরপর শুরু হয় সেই প্রতীক্ষিত দৃশ্য। ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর প্রথমবার ব্রাজিলের জাতীয় দলের হয়ে মাঠে নামেন নেইমার। ডান পায়ের পেশির চোট, দীর্ঘ পুনর্বাসন এবং একের পর এক বাধা পেরিয়ে বিশ্বকাপের মঞ্চে আবারও দেখা যায় তাকে। ম্যাচে সময় পেয়েছেন অল্প। তবুও তার উপস্থিতি বদলে দেয় ব্রাজিলের আক্রমণের চেহারা। কয়েকটি ভালো মুভ তৈরি করেন, কর্নারও নেন। মাঠে তার আত্মবিশ্বাসী উপস্থিতি বুঝিয়ে দেয়, এখনও ব্রাজিলের আক্রমণভাগে তাঁর গুরুত্ব কতটা। শেষ বাঁশি বাজার পর আবেগ ধরে রাখতে পারেননি নেইমার। মাঠেই চোখের জল দেখা যায় তার। পরে পরিবার-স্ত্রী ও মেয়ের সঙ্গে দেখা হওয়ার মুহূর্তও হয়ে ওঠে আবেগঘন। যেন দীর্ঘ সংগ্রামের পর পাওয়া স্বস্তির বহিঃপ্রকাশ ছিল সেই কান্না।
নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে নেইমার বলেন, ‘আমি অবশ্যই এই দিনটিকে আমার জীবনের সবচেয়ে বিশেষ দিনগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করতে পারি। কারণ ব্রাজিল জাতীয় দলের জার্সি পরা প্রতিটি ছেলের স্বপ্ন। আমি দীর্ঘ সময় এই জার্সি পরেছি, এখানেই চোট পেয়েছিলাম, অনেক দিন দূরে ছিলাম। আমি এটাকে ভীষণভাবে মিস করেছি এবং ফিরে আসার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেছি। আজ প্রায় তিন বছর পর আবার ফিরতে পেরেছি। আমি খুবই সুখী, আনন্দিত এবং আবেগাপ্লুত। সত্যিই আবেগে ভেসে গিয়েছিলাম।’ ড্রেসিংরুমে ফেরার পরও আবেগ থামেনি নেইমারের। একা বসে কেঁদেছেন বলেও জানান তিনি। সেই মুহূর্তে যেন ফিরে এসেছে তার দীর্ঘ অপেক্ষার সব স্মৃতি! নেইমার বলেন, ‘ড্রেসিংরুমে একা বসে কেঁদেছি, কারণ আবার এসব অনুভূতি ফিরে পাওয়া ছিল এক বিশাল স্বস্তি। জাতীয় দলের জার্সি পরা, বিশ্বকাপে খেলা, এমনকি একদিন বিশ্বকাপ জেতাণ্ডএসবই সবসময় আমার স্বপ্ন ছিল। এই অভিজ্ঞতা অসাধারণ। আমাকে উৎসাহ দেওয়া প্রতিটি ব্রাজিলিয়ানকে এবং বিশেষ করে আমার পরিবারকে ধন্যবাদ জানাই।’
নেইমারের এই ফেরার পেছনে ছিল কঠিন এক পথ। ২০১৪ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে চোট থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত একাধিক বড় ইনজুরি সামলাতে হয়েছে তাঁকে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন, এত চোটের পরও কি তিনি বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে ফিরতে পারবেন? কিন্তু আনচেলত্তি তার ওপর আস্থা রেখেছেন। স্কোয়াড ঘোষণার সময় থেকেই নেইমারের জায়গা নিয়ে ছিল আলোচনা। শেষ পর্যন্ত কোচের সিদ্ধান্তই সত্যি হলো। ব্রাজিলের কোচও মুগ্ধ নেইমারের মানসিকতায়।
আনচেলত্তি বলেন, ‘তার বয়স ৩৪ ছুঁয়েছে, অথচ ফুটবল খেলার প্রতি তার তাড়না ও ভালোবাসা যেন এখনো যেকোনো কিশোরের মতোই।’ নেইমারের ফেরার দিনটির পেছনে ছিল বাবার দেওয়া এক অনুপ্রেরণাও। ম্যাচের আগে নেইমার সিনিয়র নিজের ইনস্টাগ্রামে পুরোনো একটি ভিডিও শেয়ার করেন, যেখানে নেইমার সতীর্থদের উদ্দেশে বলেছিলেন বাবার সেই কথা, ‘দৌড়াও, নিজেকে নিংড়ে দাও। এমনভাবে দৌড়াও, যেন এটাই তোমার জীবনের শেষ দিন।’
বার্তাটা যেন ছেলের জন্যই ছিল। মাঠে নামো, সবটুকু দাও-কারণ এই মুহূর্ত হয়তো আর ফিরে আসবে না! নেইমারের প্রত্যাবর্তনের মুহূর্তকে ব্রাজিলের আরেক তারকা ভিনিসিয়ুস জুনিয়র বলেছেন, ‘আমাদের আইডলের প্রত্যাবর্তন’। ফরাসি কিংবদন্তি থিয়েরি অঁরিও নেইমারের প্রভাব নিয়ে বলেন, ‘নেইমারের মাঠে নামার মুহূর্তেই ম্যাচটা বদলে গেল। বিশ্বসেরা খেলোয়াড়েরা এমনই। ম্যাচে নিজের প্রভাব রাখতে তাদের পুরো ৯০ মিনিট মাঠে থাকার প্রয়োজন হয় না।’ গ্যালারিতে ছিলেন নেইমারের মেয়ে মাভি, মা ব্রুনা বিয়ানকার্দি এবং ব্রাজিলের কিংবদন্তিরাও। রোনালদো নাজারিও, রোনালদিনিও, কাফু, রবার্তো কার্লোসদের সামনে লেখা হলো নেইমারের প্রত্যাবর্তনের নতুন অধ্যায়। এই বিশ্বকাপে এখন মেসি, এমবাপ্পেরা গোলের উৎসবে মেতেছেন। নেইমার সেই উৎসবে কতটা যোগ দিতে পারবেন, তা সময় বলবে। তবে একটা বিষয় নিশ্চিত-৩২ মাসের অপেক্ষা শেষে ফিরে আসা এই নেইমার শুধু একজন খেলোয়াড় নন, ব্রাজিলের স্বপ্নেরও অন্যতম প্রতীক!