ঢাকা শুক্রবার, ০৩ জুলাই ২০২৬, ১৯ আষাঢ় ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

পর্তুগাল নাকি ক্রোয়েশিয়া কে যাচ্ছে শেষ ষোলোয়

পর্তুগাল নাকি ক্রোয়েশিয়া কে যাচ্ছে শেষ ষোলোয়

কিছু ম্যাচের গুরুত্ব স্কোরলাইনে ধরা যায় না। কিছু ম্যাচের মূল্য মাপা যায় না শুধু জয়-পরাজয়ের হিসাবে। কারণ সেই ম্যাচে জড়িয়ে থাকে ইতিহাস, আবেগ আর একটি প্রজন্মের বিদায়ের সম্ভাবনা। পর্তুগাল বনাম ক্রোয়েশিয়ার বিশ্বকাপ নকআউট লড়াই ঠিক তেমনই একটি মুহূর্ত। একটি ফুটবল ম্যাচের টিকিট সাধারণত কেনা হয় ৯০ মিনিটের বিনোদনের জন্য। কিন্তু সব ম্যাচ কি শুধুই ৯০ মিনিট? কিছু ম্যাচের মূল্য সময়ের চেয়েও বেশি।

কিছু ম্যাচ মানুষ দেখতে চায় কারণ তারা জানে-এই দৃশ্য আর দ্বিতীয়বার ফিরে আসবে না। পর্তুগাল বনাম ক্রোয়েশিয়ার বিশ্বকাপ লড়াই ঠিক তেমনই একটি মুহূর্ত।

টরন্টোর স্টেডিয়ামে যে ম্যাচ হবে, সেটির টিকিট এখন শুধু একটি আসন নয়, হয়ে উঠেছে ইতিহাসের একটি অংশ। কারণ সেই মাঠে নামতে পারেন ফুটবল যুগের শেষ দুই প্রতীক-ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ও লুকা মদরিচ।

এই ম্যাচের কিছু টিকিট পুনর্বিক্রয় বাজারে ৩০ হাজার কানাডিয়ান ডলারের বেশি দামে উঠেছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা ২৬ লাখ টাকারও বেশি। একজন দর্শক এত টাকা খরচ করছেন শুধু একটি ম্যাচ দেখার জন্য নয়, হয়তো দেখতে যাচ্ছেন একটি কিংবদন্তির শেষ মুহূর্ত।

এ যেন কোনো কনসার্ট নয়, কোনো সাধারণ ক্রীড়া অনুষ্ঠান নয়-এটি এমন একটি রাত, যেখানে ইতিহাস হয়তো চোখের সামনে শেষ হয়ে যাবে। রোনালদোর গল্প শুরু হয়েছিল ক্ষুধা দিয়ে। ছোটবেলার সংগ্রাম থেকে উঠে এসে তিনি হয়ে উঠেছেন বিশ্বের অন্যতম পরিচিত ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব। তার গোল, তার উদযাপন, তার আত্মবিশ্বাস-সবকিছুই আলাদা এক পরিচয় তৈরি করেছে। অন্যদিকে মদরিচের গল্প একটু নীরব। তিনি আলো কেড়ে নেননি, বরং আলো তৈরি করেছেন। ছোট দেশ ক্রোয়েশিয়াকে নিয়ে তিনি এমন জায়গায় পৌঁছেছেন, যেখানে অনেক বড় ফুটবল শক্তিও যেতে পারেনি।

রোনালদো যেখানে ব্যক্তিগত সাফল্যের প্রতীক, মদরিচ সেখানে নেতৃত্ব ও সংগ্রামের প্রতীক। একজন গোল দিয়ে ইতিহাস লিখেছেন, অন্যজন পাস দিয়ে। ৪০ বছর বয়সের পরও বিশ্বকাপের মাঠে নামা নিজেই এক বিরল ঘটনা। একসময় মনে করা হতো, এই বয়সে ফুটবলাররা বিদায়ের পথে থাকেন।

কিন্তু রোনালদো ও মদরিচ সেই ধারণাকে বদলে দিয়েছেন। রোনালদো দেখিয়েছেন, শরীরের বয়স বাড়লেও জয়ের ক্ষুধা কমে না। মদরিচ দেখিয়েছেন, ফুটবল শুধু গতির খেলা নয়—এটি বুদ্ধি ও অনুভূতিরও খেলা। তবে বয়সের বাস্তবতা কেউ এড়াতে পারে না। তাই এই ম্যাচে জয়-পরাজয়ের পাশাপাশি সবচেয়ে বড় প্রশ্ন-এটাই কি শেষ?

নকআউট ম্যাচের সবচেয়ে নির্মম দিক হলো-এখানে বিদায়ের জন্য জায়গা থাকে। গ্রুপ পর্বে ভুল শুধরে নেওয়ার সুযোগ থাকে, কিন্তু শেষ ষোলোতে একটি ভুলই শেষ করে দিতে পারে পুরো যাত্রা। পর্তুগাল হারলে রোনালদোর শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ হয়ে যেতে পারে এটি। ক্রোয়েশিয়া বিদায় নিলে শেষ হয়ে যেতে পারে মদরিচের বিশ্বকাপ অধ্যায়।

একজন মাঠ ছাড়বেন বিজয়ের আলো নিয়ে, অন্যজন হয়তো দাঁড়িয়ে থাকবেন শেষবারের মতো বিশ্বকাপের সবুজ ঘাসের দিকে তাকিয়ে। পর্তুগালের ফুটবল মানে গতি, আক্রমণ, ব্যক্তিগত প্রতিভা। রাফায়েল লিয়াওয়ের দৌড়, ব্রুনো ফার্নান্দেসের চিন্তা, বের্নার্দো সিলভার নিয়ন্ত্রণ এবং রোনালদোর শেষ স্পর্শ-সব মিলিয়ে তারা ভয়ংকর। ক্রোয়েশিয়ার শক্তি আবার অন্য জায়গায়। তারা ম্যাচকে ধীর করতে জানে, প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করতে জানে। মদরিচ, কোভাচিচ ও ব্রোজোভিচের মাঝমাঠ যেন তাদের হৃদস্পন্দন।

পর্তুগাল চাইবে আগুনের মতো শুরু করতে, ক্রোয়েশিয়া চাইবে বরফের মতো ঠান্ডা মাথায় ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করতে। ফুটবলে নিশ্চিত কিছু নেই। রোনালদো একটি মুহূর্তে ম্যাচ বদলে দিতে পারেন, মদরিচ একটি পাসে পুরো খেলার গল্প পাল্টে দিতে পারেন। হয়তো পর্তুগাল এগিয়ে যাবে, হয়তো ক্রোয়েশিয়া আবারও অসম্ভব কিছু করে দেখাবে। কিন্তু ফলাফলের বাইরেও এই ম্যাচের সবচেয়ে বড় সত্য হলো-ফুটবল একটি যুগের শেষ দেখতে যাচ্ছে। যে দর্শক টরন্টোর গ্যালারিতে বসবেন, তারা শুধু একটি ম্যাচ দেখবেন না। তারা হয়তো দেখবেন ইতিহাসের একটি শেষ পৃষ্ঠা। আর তাই ৩০ হাজার ডলারের টিকিটও অনেকের কাছে বেশি নয়। কারণ কিছু মুহূর্তের দাম টাকা দিয়ে মাপা যায় না! আজ বাংলাদেশ সময় ভোর ৫টায় টরন্টো স্টেডিয়ামে শুরু হবে এই মহারণ।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত