ঢাকা মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২৬, ২৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া টেস্টের মঞ্চ প্রস্তুত

বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া টেস্টের মঞ্চ প্রস্তুত

ক্রিকেটারদের লড়াই শুরু হতে এখনও কিছুটা সময় বাকি, ১৩ আগস্ট মাঠে গড়াবে প্রথম টেস্ট। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া টেস্ট সিরিজের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে অনেক আগেই। সেই লড়াইয়ে ব্যাট হাতে কেউ নেই, নেই বলও। আছে ঘাস, মাটি, বৃষ্টি, তাপমাত্রা আর কখনো কখনো লবণপানির কুমিরের উপস্থিতি। ডারউইন ও ম্যাকের দুই কিউরেটর জেক পাভলিচ ও পিটার কাজাকফ তাই পাঁচ দিনের ক্রিকেটের মঞ্চ বানাতে গিয়ে লড়ছেন প্রকৃতির সঙ্গেই!

২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট সিরিজ খেলতে গেছে বাংলাদেশ।

প্যাট কামিন্সদের বিপক্ষে দুই টেস্টের ম্যাচ দুটি হবে ডারউইন ও ম্যাকেতে। অস্ট্রেলিয়ার প্রচলিত গ্রীষ্মকালীন মৌসুমের বাইরে শূন্য দশকের মাঝামাঝির পর প্রথমবারের মতো দেশটিতে টেস্ট ক্রিকেট আয়োজন হচ্ছে। ফলে ক্রিকেটারদের পাশাপাশি বাড়তি পরীক্ষার মুখে পড়েছেন মাঠ প্রস্তুতের দায়িত্বে থাকা কিউরেটররাও। ডারউইনের মারারা ওভালে টেস্ট ক্রিকেট ফিরছে দীর্ঘ ২১ বছর পর। ২০০৪ সালের পর এই মাঠে আবারও পাঁচ দিনের ক্রিকেটের আয়োজন। নর্দার্ন টেরিটরি ক্রিকেটের অবকাঠামো বিভাগের প্রধান জেক পাভলিচের জন্য সেটি যেমন সম্মানের, তেমনি বড় চ্যালেঞ্জও!

ডারউইনের আবহাওয়া যে কোনো কিউরেটরের জন্যই কঠিন পরীক্ষা। নভেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত চলে বর্ষাকাল। আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ে ঘাস। আগাছার দাপটও কম নয়। কিন্তু বেশি আগাছানাশক ব্যবহার করলে আবার পিচের জন্য প্রয়োজনীয় ঘাসও নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এই পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে গিয়ে পাভলিচের উপলব্ধি, ডারউইনে মাঠ পরিচর্যার নিয়ম অনেকটাই আলাদা। তিনি বলেন, ‘একটা বিষয় হলো, এখানে ঘাসের বৃদ্ধি কখনোই থামে না।’

বৃষ্টির পরিমাণও বিস্ময়কর। ডারউইনে জানুয়ারি থেকে মার্চ-এই তিন মাসে যতটা বৃষ্টি হয়, অ্যাডিলেডে পুরো এক বছরেও ততটা বৃষ্টি হয় না। ফলে পিচকে খেলার উপযোগী রাখা এখানে শুধু নিয়মিত পরিচর্যার বিষয় নয়, বরং আবহাওয়ার সঙ্গে প্রতিদিনের এক ধরনের যুদ্ধ। তার ওপর আছে ডারউইনের ড্রপ-ইন উইকেট। বছরের প্রায় ১০ মাস স্টেডিয়ামের বাইরে ধাতব ট্রের মধ্যে থাকে পিচ। টেস্টের আগে সেটিকে দুই টুকরো করে মাঠে এনে বসাতে হয়। পাভলিচ বলছিলেন, ‘এটা খুবই ঝামেলার কাজ।’ তবে সেই ঝামেলার ফলও মিলেছে। গত বছর দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে দুটি টি-টোয়েন্টিতে এমন মানের উইকেট তৈরি করা হয়েছিল যে দর্শকদের অনেকেই বুঝতে পারেননি, সেটি দুই ভাগে বসানো হয়েছে। এবার অবশ্য টি-টোয়েন্টি নয়, সামনে পাঁচ দিনের টেস্ট। তাই পরীক্ষাটাও আরও কঠিন।

ডারউইনের প্রকৃতির আরেকটি অনুষঙ্গ লবণপানির কুমির। প্রচণ্ড গরম, আর্দ্রতা ও বৃষ্টির সঙ্গে মাঠকর্মীদের এই পরিবেশের বাস্তবতাও মাথায় রাখতে হয়। এখানে কিউরেটরের কাজ শুধু একটি ভালো পিচ বানানো নয়; পরিবেশকে বুঝে তার সঙ্গে তাল মিলিয়েই পুরো প্রস্তুতি নিতে হয়! ম্যাকেতে চিত্রটা আবার অন্য রকম। হ্যারাপ পার্কের কিউরেটর পিটার কাজাকফের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল একটি সাধারণ মাঠকে আন্তর্জাতিক টেস্ট ভেন্যুতে রূপ দেওয়া। ব্রিসবেনের গ্যাবায় কিংবদন্তি কিউরেটর কেভিন মিচেল জুনিয়রের অধীনে প্রায় ১৭ বছর কাজ করেছেন তিনি। বৃষ্টির আগেই কাভার টেনে দেওয়ার মতো পরিস্থিতি বুঝে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার শিক্ষা সেখানেই পেয়েছেন।

২০২১ সালে হ্যারাপ পার্কের দায়িত্ব নেওয়ার পর কাজাকফের সামনে বদলে যায় মাঠটির পরিচয়। যে জায়গাটি একসময় ছিল গোচারণভূমি, সেটিই এখন অস্ট্রেলিয়ার নতুন টেস্ট ভেন্যু। প্রায় আড়াই কোটি অস্ট্রেলিয়ান ডলারের পুনর্গঠনে মাঠে এসেছে ২ হাজার আসনের গ্যালারি, আধুনিক ড্রেসিংরুম ও মিডিয়া সুবিধা। কাজাকফের উপলব্ধিটাও তাই বেশ গর্বের। তিনি বলেন, ‘এ বছর আমরা বড় মঞ্চে উঠে এসেছি। এটি ছিল একটি কান্ট্রি ক্রিকেট গ্রাউন্ড। এখন আমরা নিজেদের আইসিসি টেস্ট ভেন্যুতে রূপান্তর করেছি।’

তবে নতুন ভেন্যু বানিয়ে ফেললেই দায়িত্ব শেষ নয়। ওয়ানডে কিংবা টি-টোয়েন্টির জন্য যে ধরনের পিচ প্রয়োজন, পাঁচ দিনের টেস্টের জন্য তার চরিত্র আলাদা। ব্যাটার, বোলার ও ম্যাচের বিভিন্ন পর্যায়ের চাহিদা মাথায় রেখে উইকেটে ঘাসের ভারসাম্য রাখতে হয়। ম্যাকেতে শীতের সময় তাপমাত্রা কমে গেলে ঘাসের বৃদ্ধি থেমে যেতে পারে। ডারউইনেও তাপমাত্রা ২০ ডিগ্রির নিচে নেমে গেলে একই সমস্যা দেখা দেয়। সেই ঘাস বাঁচিয়ে রাখতে তাই ব্যবহার করা হচ্ছে বিশেষ গ্রোথ ম্যাট। পিচের মাটি উষ্ণ রাখা এবং ঘাসের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ধরে রাখাই এখন কিউরেটরদের অন্যতম প্রধান কাজ।

শেষ পর্যন্ত অবশ্য সব প্রস্তুতির বিচার হবে ক্রিকেট মাঠেই। ক্রিকেটাররা মাঠে নামার পর কিউরেটরদের আর কিছু করার থাকবে না। তখন শুধু অপেক্ষা, তাদের তৈরি পিচ পাঁচ দিনের ক্রিকেটকে কতটা প্রাণবন্ত করে তুলতে পারে। কাজাকফ সেই মুহূর্তটির কথাই বলছেন, ‘প্রথম দিন আম্পায়াররা যখন মাঠে ঢুকবেন, তখন আমরা গেট বন্ধ করে দেব। এরপর বসে শুধু আশা করব, একটি দারুণ টেস্ট ম্যাচ উপভোগ করতে পারব।’

বাংলাদেশের জন্য তাই অস্ট্রেলিয়া সফরের গল্পটা শুরু হচ্ছে মাঠে নামার আগেই। ডারউইনে বৃষ্টি ও অস্বাভাবিক গরম, ম্যাকেতে ঘাসের বেড়ে ওঠা ও তাপমাত্রার লড়াই-সবকিছুর ভেতর দিয়ে তৈরি হচ্ছে দুটি টেস্টের মঞ্চ। ক্রিকেটাররা যখন ব্যাট-বল হাতে মাঠে নামবেন, তখন হয়তো চোখ থাকবে স্কোরবোর্ডে!

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত