
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশ জিতবে-এই সম্ভাবনাকে সিরিজ শুরুর আগে হয়তো কেউ খুব একটা গুরুত্ব দেননি! বরং আলোচনা ছিল উল্টোটা, অস্ট্রেলিয়ার দ্রুতগতির বোলিং আর শক্তিশালী ব্যাটিংয়ের সামনে বাংলাদেশ কতটা সময় টিকে থাকতে পারবে। কিন্তু ডারউইনের চার দিনের গল্পটি এমনভাবে বদলে গেল যে শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটাই উল্টো হয়ে দাঁড়াল-বাংলাদেশকে হারাতে অস্ট্রেলিয়া আর কতক্ষণ টিকবে?
সাড়ে তিন দিনের মধ্যেই উত্তর মিলেছে। ৯ উইকেটের জয় নিয়ে মাঠ ছেড়েছে বাংলাদেশ। টেস্ট র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ দলকে তাদের নিজেদের মাটিতে চার দিন ধরে শাসন করেছে নবম র্যাঙ্কিংয়ের দলটি। ম্যাচের ১১টি সেশনের একটিতেও পিছিয়ে ছিল না বাংলাদেশ। তাই এই জয়কে শুধু ‘অঘটন’ বলে ডেকে থেমে গেলে যেন ডারউইনের আসল গল্পটাই বলা হয় না!
অঘটন নিশ্চয়ই। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার ব্যর্থতার চেয়ে বাংলাদেশের অসাধারণ ক্রিকেটই এই জয়ের সবচেয়ে বড় পরিচয়। বাংলাদেশের টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার ২৬তম বছরে এসে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম জয়। অথচ এই অস্ট্রেলিয়ার ঘরে জিততে ভারতের অপেক্ষা করতে হয়েছে ৩০ বছর ও ১২ টেস্ট। নিউজিল্যান্ডের লেগেছে ১৫ বছর, পাকিস্তানের ১৩ বছর। শ্রীলঙ্কা এখনো অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট জয়ের দেখা পায়নি। সেই তুলনায় বাংলাদেশের অপেক্ষা দীর্ঘ হলেও ফলটা এসেছে এমন এক সময়ে, যখন অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে গিয়ে প্রতিটি সেশন দাপটের সঙ্গে নিজেদের করে নিয়েছে তারা।
আরও অবাক করার মতো বিষয়, বাংলাদেশের এই ঐতিহাসিক জয়ে দলে ছিলেন না নাহিদ রানা ও শরীফুল ইসলাম। দেশের ক্রিকেটের সম্ভাব্য আরও দুই গুরুত্বপূর্ণ পেস অস্ত্র ছাড়াই অস্ট্রেলিয়ার ঘরে ঢুকে তাদেরই ঘায়েল করেছে বাংলাদেশ।
কারণ ডারউইনের জয়টা শুধু একটি স্কোরকার্ড নয়। এটি এমন এক ম্যাচ, যেখানে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত গল্পের নিয়ন্ত্রণ ছিল বাংলাদেশের হাতে। প্রথম ইনিংসে হাসান মাহমুদের বিধ্বংসী বোলিংয়ে অস্ট্রেলিয়াকে ১৯৮ রানে গুটিয়ে দেওয়া, এরপর বাংলাদেশের ৪২৬ রান, ২২৮ রানের লিড, দ্বিতীয় ইনিংসে মেহেদী হাসান মিরাজের পাঁচ উইকেট-সব মিলিয়ে অস্ট্রেলিয়াকে এমন এক জায়গায় ঠেলে দেওয়া হয়েছিল, যেখান থেকে ফিরে আসার রাস্তা ক্রমেই সরু হয়ে আসে।
শেষ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার সামনে লক্ষ্য দাঁড়ায় মাত্র ৫৭ রান। বাংলাদেশ সেই রানও তুলে নেয় ১৪.২ ওভারে, এক উইকেট হারিয়ে। মুমিনুল হকের বাউন্ডারিতে যখন ম্যাচ শেষ হলো, তখন ডারউইনের আকাশে বাংলাদেশের ক্রিকেটের নতুন একটি সকাল যেন দেখা দিল।
অস্ট্রেলিয়া অধিনায়ক প্যাট কামিন্স বলছিলেন, আমার মনে হয় তারা সত্যি সব বিভাগেই আমাদের পর্যুদস্ত করেছে। তারা দারুণ ধৈর্য ও শৃঙ্খলা দেখিয়েছে। আমরা পিছিয়ে পড়ার পর ঘুরে দাঁড়ানো খুবই কঠিন ছিল। বাংলাদেশের জয়ের সম্ভাবনার কথা অবশ্য আগেই আঁচ করেছিলেন অস্ট্রেলিয়ার সাবেক ওপেনার মার্ক ওয়াহ। শেষ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার দেওয়া ৫৭ রানের লক্ষ্য দেখে তিনি মন্তব্য করেছিলেন, আমার যতদূর মনে পড়ে, অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অস্ট্রেলিয়ারই বিপক্ষে এটাই সবচেয়ে বড় অঘটন।
প্রথম দিন থেকেই বাংলাদেশ তাদের ওপর চাপ তৈরি করেছে। হাসান মাহমুদের আগুনে অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংস ভেঙেছে। তানজিদ হাসান তামিমের সেঞ্চুরি, নাজমুল হোসেন শান্তর ৮৪, মিরাজের ৬৫ আর মুমিনুলের ৪৯ রানে বাংলাদেশ পেয়েছে বিশাল লিড। এরপর মিরাজের ঘূর্ণিতে দ্বিতীয় ইনিংসও গুটিয়ে গেছে।
এই ধারাবাহিকতাই ‘অঘটন’ শব্দটির সীমাবদ্ধতা সামনে আনে। অঘটন সাধারণত হঠাৎ আসে। কিন্তু বাংলাদেশ যা করেছে, তার প্রতিটি ধাপ ছিল পরিকল্পিত, ধৈর্যশীল এবং ধারাবাহিক। চার দিন ধরে একই দল যদি প্রতিপক্ষকে চাপে রাখে, প্রতিটি সেশন নিজেদের করে নেয়, তাহলে সেটিকে কেবল প্রতিপক্ষের দুর্ভাগ্য বলে ব্যাখ্যা করা কঠিন।
ডারউইনের জয়ের আগে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের তিন টেস্টে কোনো জয় ছিল না। ২০০৩ সালের সফরের ২৩ বছর পর আবার অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলতে এসে প্রথম সুযোগেই জয়। এতদিনের অপেক্ষার পর এমন ফল আসায় বাংলাদেশ যে নিজেদের ক্রিকেট ইতিহাসের একটি নতুন অধ্যায় খুলেছে, তা নিয়ে সন্দেহ নেই। আর এই জয় অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটেও প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। মধ্যাহ্নভোজন বিরতির সময়ই অস্ট্রেলিয়ার সাবেক অধিনায়ক রিকি পন্টিং পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন,
এটি যদি শেষ পর্যন্ত চরম লজ্জাজনক পরাজয় হয়, তবে আমি মনে করি পরিবর্তন আনাটা অনিবার্য হয়ে দাঁড়াবে। ডেভিড ওয়ার্নারের কথাটিও তাই আলাদা করে মনে রাখার মতো। বাংলাদেশের এই জয় নিয়ে তিনি বলেছেন, অনেক অনেক বছর এই জয়কে মনে রাখা হবে।
কারণ ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ফিরে বাংলাদেশ সেখানে শুধু একটি টেস্ট জেতেনি। তারা বদলে দিয়েছে প্রশ্নের ভাষা। আর তাই এই জয়কে ‘অঘটন’ বলা গেলেও, বাংলাদেশের চার দিনের শ্রেষ্ঠত্বকে সেই চার অক্ষরের শব্দের ভেতর আটকে রাখা যায় না। এটি অস্ট্রেলিয়ার ব্যর্থতার গল্প যতটা, তার চেয়ে অনেক বেশি বাংলাদেশের সাহস, শৃঙ্খলা, বিশ্বাস আর বদলে যাওয়া ক্রিকেটের গল্প!