
কিছু ইনিংস কেবল রানসংখ্যায় বিচার করা যায় না। কিছু ইনিংসের জন্ম হয় চাপের মধ্যে, কিছু ইনিংস হয়ে ওঠে জবাব দেওয়ার ভাষা। আর কিছু ইনিংস একজন ক্রিকেটারের ক্যারিয়ারের গতিপথই বদলে দেয়। সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে গতকাল শনিবার তাওহীদ হৃদয়ের ডাবল সেঞ্চুরির ইনিংসটি ঠিক তেমনই। মিরপুরের ব্যর্থতা, সমালোচনার তির আর নিজের সামর্থ্য নিয়ে ওঠা প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে ইতিহাসের পাতায় নাম লিখিয়েছেন বাংলাদেশের এই ব্যাটার। ক্যারিয়ারের প্রথম ডাবল সেঞ্চুরি তুলে নিয়ে শুধু ব্যক্তিগত মাইলফলক স্পর্শ করেননি, কঠিন পরিস্থিতিতে দলকেও এনে দিয়েছেন স্বস্তি।
টেস্ট ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরিটাকেই ডাবল করলেন এই ব্যাটসম্যান। বাংলাদেশের হয়ে এই ঘটনা এবারই প্রথম। বাংলাদেশের চতুর্থ ব্যাটসম্যান হিসেবে ডাবল সেঞ্চুরি তার। এর আগে ডাবল সেঞ্চুরি পেয়েছেন মুশফিকুর রহিম, তামিম ইকবাল ও সাকিব আল হাসান। হৃদয়ের এই সেঞ্চুরিটা অন্য সবার চেয়ে আলাদা। কারণ হৃদয় তার বেশিরভাগ রানই করেছেন শেষের ব্যাটসম্যানদের নিয়ে। ৩০৪ বলে ১৯ চার ও ৭ ছক্কায় ডাবল সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন হৃদয়।
যে ক্রিকেটারকে নিয়ে আগের টেস্টের পর এত আলোচনা-সমালোচনা, সেই ক্রিকেটারই এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আশার নাম। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে মিরপুর টেস্টের দুই ইনিংসে বাজে শটে আউট হয়ে হতাশ করেছিলেন হৃদয়। বিশেষ করে দ্বিতীয় ইনিংসে তার আউট হওয়ার ধরন ছিল দৃষ্টিকটু। সমালোচকদের প্রশ্ন ছিল, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের এই পর্যায়ে এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন শট খেলার ব্যাখ্যা কী? সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে হৃদয়ের সামনে ছিল একটাই পথ-ব্যাট হাতে রান করা। সিলেটে সেটিই করে দেখালেন তিনি। তাও আবার এমন এক ইনিংসে, যা মনে রাখবে বাংলাদেশের ক্রিকেট।
প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরির অপেক্ষা ফুরিয়েছিল তৃতীয় দিন সকালে। সেই শতকের গল্পেও ছিল নাটকীয়তা। জেডেন সিলসের বলে ফাইন লেগে বল ঠেলে রান নিতে ছুটেছিলেন হৃদয়। সতীর্থরা অভিনন্দন জানাতে দাঁড়িয়ে গেলেও আম্পায়ারের সিদ্ধান্তে জানা যায়, সেটি ছিল লেগ বাই। ফলে শতকের উদযাপন থেমে যায় মুহূর্তের জন্য। তবে অপেক্ষা দীর্ঘ হয়নি। পরের ওভারের প্রথম বলেই সিঙ্গল নিয়ে পৌঁছে যান তিন অঙ্কের ঘরে। হেলমেট খুলে ব্যাট উচিয়ে ধরে উদযাপন করেন ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি।
সেখানেই থামার মানুষ ছিলেন না হৃদয়। দলের তখন প্রয়োজন ছিল বড় ইনিংস। ব্যক্তিগত মাইলফলকের চেয়ে দলীয় সংগ্রহকে এগিয়ে নেওয়ার তাড়নাই যেন তাকে চালিত করেছে। একে একে পেরিয়েছেন দেড় শ রানের বাধা। এরপরও ব্যাটের ধার কমেনি। শেষ পর্যন্ত ডাবল সেঞ্চুরির অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে যান তিনি। নিজের তৃতীয় টেস্টেই এমন কীর্তি! বাংলাদেশের ক্রিকেটে নতুন এক বীরত্বগাথার জন্ম হলো সিলেটের সবুজ গালিচায়। হৃদয়ের এই ইনিংসের মাহাত্ম্য বুঝতে হলে বাংলাদেশের অবস্থার দিকে তাকাতে হবে। একসময় ম্যাচে স্বাগতিকদের অবস্থা ছিল বেশ নাজুক। সাদমান ইসলামের চোটে একজন ব্যাটার কম নিয়ে ইনিংস শুরু করতে হয়েছিল বাংলাদেশকে। ৫১ রানে তিন উইকেট হারানোর পর চতুর্থ উইকেটে মুশফিকুর রহিমের সঙ্গে ৭৩ রানের জুটি গড়ে দলকে সাময়িক স্বস্তি দেন হৃদয়। পরে মেহেদী হাসান মিরাজের সঙ্গে যোগ করেন আরও ৪১ রান।
কিন্তু বড় ভরসা মুশফিক, লিটন কুমার দাস ও মিরাজের বিদায়ে আবারও বিপর্যয়ের মুখে পড়ে বাংলাদেশ। ১৮৪ রানে সপ্তম উইকেট হারানোর পর দলকে দুই শত পার করানোই কঠিন মনে হচ্ছিল। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণত ব্যাটারদের ওপর চাপ চেপে বসে। কিন্তু হৃদয় যেন ঠিক করে নিয়েছিলেন, এই ইনিংস সহজে শেষ হতে দেবেন না। এক প্রান্তে উইকেট পড়েছে, অন্য প্রান্তে তিনি দাঁড়িয়ে থেকেছেন পাহাড়ের মতো।
তাইজুল ইসলামকে সঙ্গী করে অষ্টম উইকেটে গড়েছেন অসাধারণ প্রতিরোধ। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বোলারদের হতাশ করে দুজনের জুটি বাংলাদেশকে বিপর্যয় থেকে টেনে তুলেছে। হৃদয়ের ব্যাটে রান এসেছে কখনো দৃষ্টিনন্দন কভারে, কখনো পুলে, কখনো আবার নিখুঁত টাইমিংয়ে বাউন্ডারি পেরিয়ে। আক্রমণ ও সংযমের মিশেলে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, বড় ইনিংস খেলতে শুধু শটের বৈচিত্র্য নয়, প্রয়োজন পরিস্থিতি বোঝার ক্ষমতাও।
এই ইনিংসে হৃদয়ের মানসিক দৃঢ়তার পরিচয়ও স্পষ্ট। দ্বিতীয় দিন ৮০ বলে ২৯ রান নিয়ে অপরাজিত ছিলেন তিনি। কিন্তু পরদিন যেন অন্য এক হৃদয়কে দেখা গেল। প্রথম ৫০ রান করতে ১০৯ বল খেললেও পরের ৫০ রান তুলেছেন মাত্র ৬২ বলে। পরিস্থিতি বুঝে নিজের ব্যাটিংয়ের গতি বদলেছেন। বাজে বলের শাস্তি দিয়েছেন, ভালো বলের বিপক্ষেও দেখিয়েছেন আত্মবিশ্বাস। শতকের পর দেড় শ, এরপর ডাবল সেঞ্চুরি-প্রতিটি ধাপেই ছিল দায়িত্বশীলতার ছাপ।
হৃদয়ের এই প্রত্যাবর্তনের পেছনে সুযোগের গল্পও আছে। মুমিনুল হক ছিটকে যাওয়ায় সিলেট টেস্টে একাদশে জায়গা পেয়েছিলেন তিনি। সুযোগটি ছিল নিজেকে প্রমাণের, আগের ভুল শুধরে নেওয়ার। সেই সুযোগকে এমনভাবে কাজে লাগালেন, যা হয়তো নিজেও কল্পনা করেননি। যে টেস্টে তাঁর খেলা নিয়েই ছিল অনিশ্চয়তা, সেই টেস্টই হয়ে উঠল ক্যারিয়ারের সবচেয়ে স্মরণীয় অধ্যায়।
সবচেয়ে বড় কথা, হৃদয়ের ডাবল সেঞ্চুরি বাংলাদেশের জন্যও স্বস্তির উপলক্ষ। যে দল একসময় দুই শত রান করতে পারবে কি না, তা নিয়েই সংশয়ে ছিল, সেই দল এখন শক্ত অবস্থানে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে লড়াইয়ে বাংলাদেশকে নতুন করে আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে এই ইনিংস। ব্যক্তিগত অর্জনের বাইরেও তাই হৃদয়ের ডাবল সেঞ্চুরির মূল্য অনেক বেশি। ক্রিকেটে ব্যর্থতা আসবেই। কখনো একটি ভুল শট, কখনো একটি বাজে দিন একজন খেলোয়াড়কে কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। কিন্তু বড় ক্রিকেটারদের আলাদা করে চেনা যায় তাদের ফিরে আসার ক্ষমতায়।
মিরপুরে সমালোচনার মুখে পড়া হৃদয় সিলেটে ফিরেছেন রাজকীয়ভাবে। তার ব্যাটে এবার শুধু রান নয়, ছিল জেদ, আত্মবিশ্বাস আর নিজের ভুল শুধরে নেওয়ার গল্প।
সিলেটের এই ইনিংস হয়তো হৃদয়ের ক্যারিয়ারের নতুন দরজা খুলে দেবে। সামনে আরও অনেক পরীক্ষা অপেক্ষা করছে। তবে প্রথম ডাবল সেঞ্চুরির এই দিনটি তিনি মনে রাখবেন আজীবন। বাংলাদেশের ক্রিকেটও মনে রাখবে এমন এক ইনিংস, যেখানে একজন ব্যাটার নিজের স্বপ্ন পূরণের পাশাপাশি বিপদের মুখে থাকা দলকে দিয়েছেন বেচে থাকার নতুন শক্তি। মিরপুরে যে হৃদয় প্রশ্নের মুখে পড়েছিলেন, সিলেটে সেই হৃদয়ই হয়ে উঠলেন ইতিহাসের নায়ক!