ঢাকা শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১ আশ্বিন ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

সংবাদচিত্র

বাংলাদেশে সংবাদচিত্রের সংকট

সুদীপ্ত সালাম
বাংলাদেশে সংবাদচিত্রের সংকট

ঊনিশ বিংশ শতাব্দীর গোড়া থেকে সংবাদপত্রে সংবাদের পাশাপাশি ইলাস্ট্রেশন ছাপা শুরু হয়। সংবাদপত্রগুলো অনুধাবন করতে শুরু করল, শুধু কথায় কাজ হচ্ছে না। লিখে সব কথা বলা যায় না, সব বললেও যথাযথভাবে বলা হয় না। সংবাদের উৎস যে ঘটনাস্থল বা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান, তার ছবিও দেখানো জরুরি হয়ে পড়ে। সেই ভাবনা থেকেই পত্রিকায় শিল্পীদের ডাক পড়া শুরু। তারা সংবাদদাতা বা প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা অনুযায়ী ছবি আঁকতেন, সে ছবি গুরুত্ব দিয়ে কাগজে ছাপা হতো। তাতে করে পাঠকের আগ্রহ বেড়ে যায়, সঙ্গে বাড়তে থাকে পত্রিকার পসার।

হাতে আঁকা ছবি দিয়ে পত্রিকা চলল ঊনবিংশ শতাব্দীর চল্লিশের দশক পর্যন্ত। ওই চল্লিশের দশকেই আধুনিক ফটোগ্রাফির জন্ম। এই দশকের একদম শেষ দিক থেকে পত্রিকায় ছাপা হতে শুরু করে আলোকচিত্র। সংবাদ তো বাস্তবতানির্ভর, সংবাদের সঙ্গে আলোকচিত্র ছাপা হওয়া শুরু হলে পাঠক সংবাদের বাস্তবতার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করতে পারল। তখন থেকেই বোঝা হয়ে গেল, একটি ছবি সত্যিই 'হাজার কথার চেয়েও বেশি কিছু বলে'।

একবিংশ শতাব্দীতে এসে সারা দুনিয়াতেই ফটোসাংবাদিকতা নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। তার সামনে এখন সবচেয়ে বড় হুমকি এআই। কিন্তু বাংলাদেশে ফটোসাংবাদিকতার অবস্থা একটু ভিন্ন। এআই আসার আগে থেকেই নানা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল সংবাদচিত্র। সংকটগুলো পুরোনো। সমাধানের দিকে না গিয়ে দেশের সংবাদচিত্র খাদের কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছে বলা যায়। বিস্ময় নিয়ে লক্ষ্য করছি, এখন পত্রিকা অফিসগুলোতে ফটোসাংবাদিকদের চাহিদা কমে যাচ্ছে, কোনো কোনো হাউসে চাহিদা একদমই নেই।

হাতেগোনা দু-একটি পত্রিকা বাদে বেশিরভাগ পত্রিকা অফিসে একজন রিপোর্টারের চেয়ে ফটোসাংবাদিকের বেতন কম। যুগের সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে, রাজনৈতিক ফায়দা নিতে গিয়ে এবং মালিকপক্ষের লাঠিয়াল হয়ে বেশিরভাগ পত্রিকা পাঠকের বিশ্বাস হারিয়েছে। একে তো পত্রিকা চলছে না, তারওপর রাজনৈতিক কারণে সরকারি বিজ্ঞাপন বন্ধ। সুতরাং সাংবাদিকরা পড়ছেন আর্থিক অনিশ্চয়তায়। আর যারা তাঁবেদারি করে সরকারি বিজ্ঞাপন পাচ্ছে তাদের পাঠকের প্রতি কোনো দায়বদ্ধতা নেই। সেই মিডিয়া হাউসে প্রকৃত সাংবাদিকদেরও কোনো গুরুত্ব থাকে না, আখের গোছাতে ব্যস্ত থাকছে মুষ্টিমেয় মানুষ। পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ তা সম্প্রতি বরিশালে পত্রিকা কার্যালয়ে সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জির ঝুলন্ত লাশ দেখেই অনুমান করা যায়। ফটোসাংবাদিকরা এই বৃত্তের বাইরের কেউ নয়। প্রতিবেদকদের সঙ্গে বহু ফটোসাংবাদিকও নিজেদের পাওনা টাকার জন্য নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে বারবার ধর্না দিচ্ছেন।

এই যে সাংবাদিকরা পাওনা টাকা পাচ্ছে না, কথায় কথায় চাকরি যায়, হুট করে প্রতিষ্ঠান বন্ধ হচ্ছে— এ নিয়ে সরকারেও কোনো মাথাব্যথা নেই। রাজনৈতিক সরকারগুলো কখনোই সাংবাদিকদের অধিকার নিশ্চিত করতে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। আমরা আশা করেছিলাম একটি গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আসা অন্তর্বর্তী সরকার কিছু করবে। করেনি। গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন করা হয়েছিল। সেই কমিশনেরও কোনো সুপারিশ আলোর মুখ দেখেনি। কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদই বলেছেন, কমিশনের দেওয়া শতাধিক প্রস্তাবের একটিও অন্তর্বর্তী সরকার বাস্তবায়ন তো দূরের কথা, বাস্তবায়নে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপও নেয়নি। (দৈনিক ইত্তেফাক, ১৪ ডিসেম্বর ২০২৬)।

সরকারকে যারা চাপ দেবে তারাই তো মাঠে নেই। দেশে ফটোসাংবাদিকদের একটি ঐতিহ্যবাহী সমিতি আছে। তাদের কাজ বার্ষিক পিকনিক ও প্রদর্শনী আয়োজনে সীমাবদ্ধ। ফটোসাংবাদিকের অধিকার নিয়ে কথা বলতে এই সংগঠনকে দেখা যায় না বললেই চলে। আর যখন যে সরকার থাকে, সে সরকারের মন যুগিয়ে চলতে ব্যস্ত থাকেন সমিতির কর্তারা। ফটোসাংবাদিকরা চাকরি হারায়, মাসের পর মাস বেতন পায় না, সমিতি চুপ। অনেক ফটোসাংবাদিক জাতীয় প্রেসক্লাবেরও সদস্য, কেউ কি কখনো প্রেসক্লাবকে ফটোসাংবাদিকদের অধিকার নিয়ে কথা বলতে দেখেছে?

বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের (পিআইবি) দেশের ফটোসাংবাদিকতা নিয়ে একটি গবেষণা করেছিল, সেখানে ফটোসাংবাদিকদের প্রশ্ন করা হয়েছিল, সরঞ্জামের দিক থেকে ফটো সেকশন স্বয়ংসম্পূর্ণ কি না। ৭৫ শতাংশ ফটোসাংবাদিকের উত্তর ছিল, স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। গবেষণাটি নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকের হলেও, পরিস্থিতি কিন্তু খুব একটা বদলায়নি। এখনও চাকরির আগে জানতে চাওয়া হয়, নিজের ক্যামেরা আছে কি না। না থাকলে চাকরি হয় না। এমনও হয়েছে, নিজের ক্যামেরা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে ক্যামেরা নষ্ট হলে পত্রিকা তার দায় নেয়নি। হয় নিজের টাকাতেই ক্যামেরা সারাতে হয়েছে, নতুবা চাকরি গেছে।

ওই একই গবেষণায় দেখা গেছে, ৩৪ শতাংশ ফটোসাংবাদিককে অ্যাসাইনমেন্ট দেন পত্রিকার চিফ রিপোর্টার। ৩২ শতাংশকে দেন বার্তা সম্পাদক, ১৩ শতাংশকে দেন সম্পাদক নিজেই আর মাত্র ৮ শতাংশকে অ্যাসাইনমেন্ট দেন প্রধান ফটোসাংবাদিক। শুধু তাই নয়, অভিজ্ঞতা থেকে জানি, চিফ রিপোর্টার ও বার্তা সম্পাদকরা শুধু ছবি তোলার হুকুমই দেন না, কোন ছবি কীভাবে ছাপা হবে বা আদৌ ছাপা হবে কিনা— তাও ঠিক করেন। দু-একটি পত্রিকা ছাড়া, প্রায় সবগুলো পত্রিকাতেই কোনো ফটো-এডিটর নেই। যদিও ৮২ শতাংশ ফটোসাংবাদিক মনে করেন, পত্রিকায় একজন ফটো-এডিটর থাকা উচিত। তাদের কথা শুনতে পত্রিকার কর্তাদের বয়েই গেছে! ওই যে বললাম, দু-একটি পত্রিকাতে ফটো-এডিটর আছে, তারাও কিন্তু তাদের কাজটি ঠিকমতো করেন না বা করতে পারেন না। শুধু পদেই তারা ফটো-এডিটর, আসলে ঠুঁটো জগন্নাথ।

ফটো-এডিটর না থাকা ভয়াবহ ব্যাপার। শুরুতে বলেছি, পত্রিকা একসময় ইলাস্ট্রেশনের যুগ পার করেছে। তখনও ছবি ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বড় বড় ছবি ছাপা হতো— হোক তা হাতে আঁকা। বাংলাদেশে একবিংশ শতাব্দীতেও পত্রিকায় আলোকচিত্র ছাপা হয় আক্ষরিক অর্থে ইলাস্ট্রেশনের মতো করে। এখানে ছবির আলাদা কোনো সত্ত্বা নেই। ছবি প্রতিবেদনের অলংকরণ মাত্র! দেশের শীর্ষস্থানীয় পত্রিকাতেও কখনও দেখিনি, পাতায় আগে ছবি বসিয়ে বাকি কম্পোজিশন করতে। সংবাদ ও বিজ্ঞাপন বসিয়ে যদি জায়গা থাকে তাহলে ছবি বসবে। জায়গা যদি ছোট হয়, ছবি ছোট করেই বসানো হবে, মূল ছবিটি কি খাড়া (ভার্টিক্যাল) না অনুভূমিক (হরিজন্টল) তাতে কিচ্ছু যায় আসে না, জায়গা কতটুকু ও কোনো আকৃতির রাখা হয়েছে সে অনুযায়ী ছাপা হবে। এদিক-ওদিক হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কোনো ছবি বড় করে ছাপা হয়ে যাওয়া ভীষণ দুর্লভ ঘটনা। ছবির জন্য পত্রিকায় জায়গায়ই নেই। পুরো পত্রিকার মাত্র ৬ থেকে ১০ শতাংশ থাকছে ছবির জন্য। সেই জায়গাগুলোরও সুষ্ঠু ব্যবহার হচ্ছে কই!

সংবাপত্রের জন্য ছবির বিষয় অনেক। কিন্তু আমাদের এখানে প্রধানত ছাপা হয় সংকটের ছবি। আরও নির্দিষ্ট করে বললে 'অ্যাকশন ছবি'। এর বাইরে অন্য কোনো বিষয়ের ছবি ছাপা হয় সংবাদের ঘাটতি মেটাতে। কলাম ভরতেই 'ফিচার ছবি' বসিয়ে দেওয়া হয়। যখন পর্যাপ্ত লেখা থাকে তখন এসব ফিচার ছবি মাঠে মারা পড়ে। এই যে অ্যাকশন ছবির নামে একঘেয়ে ছবি ছাপানো হয়, তাতে করে ফটোসাংবাদিকরাও বৈচিত্র্যময় ছবি তোলার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। ওদিকে পাঠকও বিরক্ত হতে থাকে।

সব সময় যে ছবির মান ভালো থাকে তাও না। ছাপানোরও যোগ্য নয়, এমন ছবিও ফটোসাংবাদিকরা উৎপাদন করে থাকেন। এর পেছনে অনেক কারণ থাকতে পারে, যেমন ১. শিক্ষার (ভিজ্যুয়াল লিটারেসি) অভাব, ২. সরঞ্জামের ঘাটতি, ৩. অনভিজ্ঞতা, ৪. ছবি সম্পাদনায় অপারদর্শিতা, ৫. সঠিক নির্দেশনার অভাব, ৬. কাজের অতিরিক্ত চাপ, ৭. মানসিক অস্থিরতা, ৮. সময় না দেওয়া, ৯. ছবির বিষয় সম্পর্কে হোমওয়ার্ক না করা এবং ১০. সঠিক সময়ে ছবি না তোলা। বাংলাদেশে পত্রিকায় ভালো মানের ছবি অপর্যাপ্ত হওয়ার প্রধান কারণ দৃশ্যগত শিক্ষার অভাব। হাতে একটি ক্যামেরা থাকলেই যে কেউ 'ফটোসাংবাদিক' হয়ে যাচ্ছেন। অনেকের যোগ্যতা একটিই, ঠিকঠাক ছবি তুলতে পারা। কিন্তু ভালো ছবি তো এভাবে হয় না, ছবির ভাষা, শক্তি ও রাজনীতি সম্পর্কে জ্ঞানও তো জরুরি। ছবি কীভাবে পাঠ করব, দর্শক কীভাবে নেবে, সমাজে এর প্রভাব কী ইত্যাদি ভাবনাও তো দরকারি। কম টাকায় ক্যামেরাওয়ালা পেতে পত্রিকাগুলোও এ নিয়ে একদম ভাবে না। নিজেদের ছবির মান ভালো না হলেও সমস্যা নেই, মুশকিল আসান করতে 'গুগল বাবা' তো আছেই। বেশিরভাগ গণমাধ্যম গুগলে সার্চ দিয়ে নির্বিগ্নে তুলে নিচ্ছে পছন্দের ছবি। দিনেদুপুরে চুরি হয়ে যাচ্ছে অন্য ফটোসাংবাদিকদের মেধাস্বত্ব। এটিও সংবাদচিত্রের সংকটের আরেকটি দিক। গুগলের জোরে অনেক মিডিয়া হাউস ফটোসাংবাদিক নিয়োগই দেয় না— একজনও না। ভিডিও করার লোক নেবে, কারণ ভিডিও বেশি চুরি করা কঠিন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে কপিরাইট দাবি করা যায়। ছবি যেন এতিম! তার কোনো অভিভাবক নেই!

সবশেষ যোগ হয়েছে এআই— 'মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা'। দেশের সংবাদচিত্রের কফিনে শেষ পেরেক হতে পারে এআই-এর ব্যবহার ও অপব্যবহার। এরইমধ্যে সংবাদের সঙ্গে ছবির বদলে ব্যবহার হওয়া শুরু হয়েছে— এআই জেনারেটেড ইলাস্ট্রেশন। পত্রিকাগুলো এখনও সেভাবে শুরু না করলেও— করবে। এআই দিয়ে নকল আলোকচিত্রও উৎপাদন করা যাচ্ছে। ছবি না কিন্তু দেখতে হুবহু ছবি। এই নকল আলোকচিত্রের ব্যবহারও বাড়বে। সুতরাং ফটোসাংবাদিকদের টিকে থাকা কঠিন হবে। ফটোসাংবাদিকদের পেছনে যে ব্যয় হতো, তা যাবে এআই, ভিডিও ও অন্যান্য ক্ষেত্রে।

এত কিছুর পরও বাংলাদেশে ফটোসাংবাদিকরা যে ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেন তা খুব কম দেশেই হয়। নিজের টাকায় কেনা ক্যামেরা ও ক্যামেরা সরঞ্জাম ধ্বংস হওয়ার ঝুঁকি তো আছেই, ফটোসাংবাদিকদের প্রাণের ঝুঁকিও অন্যান্যদের চেয়ে বেশি। দূর থেকে লেখা যায়, দূর থেকে ছবি হয় না। ভালো ছবির জন্য একজন ফটোসাংবাদিককে ঘটনার গর্ভে থাকতে হয়। ফলে ঝুঁকি ফটোসাংবাদিকদের পায়ে পায়ে। প্রায় সব অফিসেই জীবন বিমা তো দূরের কথা— ফটোসাংবাদিকদের জন্য নেই গ্যাস মাস্ক, ভেস্ট ও হেলমেট।

লেখক : সাংবাদিক, লেখক ও শিক্ষক।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত