প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
মাদারবাঁশ বলতে বিশেষভাবে সজ্জিত সাতটি বাঁশকে বোঝায়। বাঁশ যারা বহন করেন তাদের বাঁশাইল বলে। এ বাঁশাইলরা বাদ্যযোগে বাড়ি বাড়ি গিয়ে উঠানে নৃত্য পরিবেশন করেন যাকে বলে দামাইল। সাধারণত দোহারের নুরুল্লাপুরের শানাল শাহ (র.)-এর মাজারকে কেন্দ্র করে এ সময়ে সবচেয়ে বড় ও বেশি সংখ্যায় দামাইল নামে। যার প্রভাব কেরানীগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, নবাবগঞ্জসহ আশপাশের এলাকাতেও দেখা যায়। মাঘ মাসের পূর্ণিমায় এই অঞ্চলে নামে মাদার বাঁশের দামাইল। তবে এর প্রস্তুতি কিন্তু চলে আসে আগে থেকেই। প্রতি সন্ধ্যায় গ্রামের সকলেই কাজকর্ম সেরে বাড়ির আঙ্গিনায় ঢোল, মন্দিরা, ঘণ্টা, খঞ্জনি নিয়ে মজমা বসে, চলে মধ্যরাত পর্যন্ত।
সদ্য প্রস্তুত করা সাতটি বাঁশ রঙিন কাপড়ে সাজানো হয়। মাথায় বাঁধা হয়— আয়না ও ঘোড়ার লেজের চুলের চুমুর। দম দম রব করে পূর্ণিমার ১৫ দিন আগে বাড়ি থেকে মাদার বাঁশের দামাইল বের হয়। সকালে ঘুম থেকে উঠেই চলে মিছিলে যাওয়ার প্রস্তুতি। নিজেদের গ্রামের আশপাশের গ্রামগুলোতে পালা করে মিছিল করা হয়।
রঙিন কাপড়ে সাজানো সাতটি বাঁশ ও ঢোল, করতাল, বাঁশি সহযোগে বাড়ি বাড়ি গিয়ে দামাইল করে চাউল, ডাল, টাকা সংগ্রহ করা হয়। পরে সংগৃহীত চাল-ডাল দিয়ে রান্না হয় শিরনি। এ উপলক্ষে বসে মেলা। নুরুল্লাপুরের মাদারবাঁশের মেলা নিয়ে এবারে মেলা-পার্বণ।
গ্রামের পর গ্রাম প্রদক্ষিণ করে ভক্তের বাড়ি বাড়ি ঘুরে, পূর্ণিমার রাতে দামাইল ফিরে আসে নিজ আসনে। পরবর্তী তিনদিন নিজ গ্রাম ও বাড়িতে নানা আনুষ্ঠানিকতা ও ক্ষণে ক্ষণে দামাইল নাচের মধ্য দিয়ে শেষ হয় মাদারবাঁশের দামাইল। বাঁশগুলোকে সাজানো হয়। সাত রংয়ের কাপড় দিয়ে মুরিয়ে নিয়ে, বাঁশের মাথায় বাঁধা থাকে ঘোড়ার লেজের চুল। চুলগুলোকে চুমুর বলে। সাতটা বাঁশ সাতজন পীরকে নির্দেশ করে এবং তাদের মহিমা মতো সাজানো হয় বাঁশগুলো। যে বাঁশটা যত বড় পীরকে নির্দেশ করে. সেটার সাজ হয় বেশি জাঁকজমকপূর্ণ। কালো কাপড় দিয়ে মোড়ানো বাঁশটা বড় পীরকে নির্দেশ করে। বাঁশের মাথায় আয়না থাকে, এই আয়নায় পীর মুখ দেখেন বলে জানা যায়। কালো কাপড়ের বাঁশে সয়ং মাদার পীরের অল্প চুল লাগানো হয়। যা পীরের মাথা থেকে সংগ্রহ করা। প্রত্যেকটা বাঁশে লাগানো থাকে লাল গামছা বিভিন্ন রংয়ের রোমাল। সাত রংয়ের বাঁশগুলো যারা বহন করেন, তাদের পরনে ও থাকে নানা রংয়ের কাপড়। তবে সবার কোমরে একটা করে লাল গামছা থাকা চাই। কারো কারো মাথায়ও বাঁধা থাকে লাল রংয়ের গামছা। এ সাতটা বাঁশকে একজন পরিচালনা করেন। কাশার ঘটির ভেতর দুধ মিশানো পানিতে আমের ডাল সমেত পাতা চুবিয়ে ঘটিটি হাতে করে ঘুরে বেরান তিনি। ঘটির গলায় গাধা ফুলের মালা লাগানো থাকে। মিছিলের আগে আগে চলেন তিনি। সাথে থাকে ঢোল, ঘন্টাসহ বাদক দল। থাকে ধুপদানি হাতে একজন। এ বাড়ি ও বাড়ি থেকে চাল, ডাল, সবজি যে যা দেয় তাই সংগ্রহ করার কাজে একজন থাকেন দলের পেছনে পেছনে। নতুন ফসল উঠেছে, যে যতটা পারে দিয়ে দেন মাদারবাঁশ দলকে। কেউ কেউ আবার টাকাও দেন। দেওয়ার বিনিময়ে মাদারবাঁশের রাজা কালোমাদার বাঁশের পা চুবিয়ে পানি সংগ্রহ করেন ভক্তরা। এ পানি খাওয়ালে রোগবালাই থাকলে সেরে যায়, রোগবালাই কখনোই কাছে আসে না। এ বাড়ি শেষ করে ঐ বাড়ির উঠানে ঢুকে বাদক দল। বাদ্যের তালে তালে মাদারবাঁশ বহনকারিরা গোল হয়ে নাচতে থাকেন। কখনও কখনও নাচ এক অতিজাগতিক আবহের জন্ম দেয়। যেন মাদারবাঁশ বহনকারিরা নশ্বর জগৎ ছেরে অন্য কোথাও পারি জমিয়েছেন। প্রলয় নাচনে কারো কারো জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পরে যান। তখন কাশার ঘটিতে চুবিয়ে রাখা আমপাতা দিয়ে দুধের পানি ছিটিয়ে তার অচেতনতা কাটানো হয়। নাচ শেষ হলে বাঁশের মাথা সারি করে নামিয়ে দেওয়া হয় সামনের দিকে। সামনে থেকে একজন সাতটা বাঁশ ধরে অন্য বাড়িতে নিয়ে যায় এবং আবার ও উঠিয়ে দেয় আকাশে। কোন কোন বাড়িতে খাবার দাবার তৈরি করে রেখে দেওয়া হয়, বাইশালদের খাওয়ার জন্য। বাড়ির দাওয়ায় বসে খেতে খেতে চলে গীত গাওয়া— 'যে জন আলেক চিন্নাছে। তার কিরে ভয়, যে জন আলেক চিন্নাছে।'
ভক্তরা অবশ্য মাদারবাঁশের আগমন উপলক্ষে বাড়িতে সকাল থেকেই খিচুরি রান্না করে প্রস্তুত থাকেন। মাদারবাঁশ বাড়িতে আসলে গ্রামের সকলকে খিচুরি পরিবেশন করা হয়। এভাবে সারাদিন এ বাড়ি থেকে ও বাড়ি নাচের মিছিল শেষ করে রাত গভীরে ঘরে ফিরে মাদারবাঁশের দামাইল। নিজ বাড়িতে এসে পূর্ণিমার দিন শেষ হয় দামাইল। সেদিন ঘরে ফিরে, থাকে গানের আসর। রাতে চলে আগুনের বিভিন্ন খেলা। মাদারবাঁশের বাঁশগুলোকে আগুনে জ্বালিয়ে দেয়া হয়। আগুনের উপরে হেটে যাওয়া, মুখ থেকে আগুন জ্বালানো সব আগুন নিয়ে খেলা। সেদিন সারারাত গান বাজনায় কাটে পীর-মুরিদদের। চলে নতুন শিষ্যদের শিষ্যত্ব নেওয়ার অনুষ্ঠান। খাঁটি মুরিদ যারা আলেক চিনেন তারা, পীরের সান্নিধ্যে চলে যান সে রাতে। তাদের জন্য মহান রাত সেটা। একমাত্র তারাই পীরের সান্নিধ্যে যেতে পারেন গুরুর প্রতি ভক্তি যাদের অশেষ। পীরের সান্নিধ্যে এসে মহানুভবতা অর্জন করে সকলে ঘরে ফেরেন।
অনেক বিশেষজ্ঞ গবেষক মাদারবাঁশ বা মাদারবাঁশের দামাইল ও মাদার পীরের গান এই দুটিকে এক করে পেলেন। এমনই একবার বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত পত্রিকা 'ধানশালুকের দেশ' এর ৪৩বর্ষ ১ম-৪র্থ সংখ্যা, জানুয়ারি-ডিসেম্বর ২০১৫ সংখ্যায় 'মাদারবাঁশের দামাইল' নামে একটা লেখা দিয়েছিলাম। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা নির্বাহী সম্পাদক যেতে বললেন। গিয়ে প্রথমে বিল এর চেক তুলে নিয়ে নির্বাহী সম্পাদকের কাছে গেলাম। সংখ্যাটা হাতে নিলাম, ৪৩ থেকে ৪৭৫ পৃষ্ঠাব্যাপী আমার লেখার ছাপানো রূপ দেখে বেশ খুশিই লাগছিল। তবে পড়ার পর তো আমার চক্ষু চড়কগাছ। জানতে চাইলাম 'মাদারবাঁশের দামাইল' 'মাদারপীরের গান' হলো কীভাবে? তিনি যা বললেন, তার জন্য আমি একেবারেই প্রস্তুত ছিলাম না। তিনি যা বললেন তার সারমর্ম দাঁড়ায়, দীর্ঘদিন মাদারপীরের গান নিয়ে কাজ করছেন। আমার লেখায় যে সমস্ত ভুল ছিল উনি শোধরে তার পর লেখাটা ছেপেছেন। আমি হাসব না কাঁদব বুঝতে পারছিলাম না। কতক্ষণ চুপ করে বসে রইলাম। শেষে কিছু না বলে সোজা উঠে বাংলা একাডেমির বাউন্ডারী ছেড়ে চলে এলাম। এর পরে বাংলা একাডেমিতে আর লেখা দেইনি কোনো দিন।
এখানে উল্লেখ্য মাদারপীরের গান বা জারি নাটোর জেলার নিজস্ব লোকসংগীত হিসাবে পরিচিত। বাংলাদেশের অন্য কোনো অঞ্চলে এই গানের আসর বসলেও তা মূলত নাটোর জেলা থেকেই ধার করা। বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, কুষ্টিয়া, নেত্রকোনায়সহ আরও কয়েকটি অঞ্চলে মাদারপীরের গান বা দমের মাদার নামে গান প্রচলিত আছে। মাদারপীর নামক কোনো পীরের দরগা বা মাজার নেই কোথাও, তবু মাদারপীরের নামে মানত বা মানসিক করার চল আছে ঐ অঞ্চলে। সাধারণত উঠানে বিছানা পেতে দুটি বাঁশকে জোড়া লাগানোর মতো করে গান করা হয়। এ মাদারপীরের গান আর ঢাকা অঞ্চলের মাদারবাঁশের দামাইল এক নয়। এভাবে অবচেতনে মাদার পীর ও মাদারের দামাইল নিয়ে আরো একটি বিভ্রাট ঘটেছে— বাংলা একাডেমি প্রকাশিত 'বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি গ্রন্থমালা মুন্সীগঞ্জ' বইতে। ১০৫ পৃষ্ঠায় লোকউৎসবের নামে আছে 'দমের মাদার' নামের একটি নিবন্ধ। নিবন্ধটি পড়লেই যে কারও বুঝতে অনুবিধা হবে না, লেখাটি দায়সারা গোছের। লেখাটি আসলে 'মাদারবাঁশের দামাইল'-এর, কিন্তু বলা হয়েছে দমের মাদার। মুন্সীগঞ্জ অঞ্চলে দমের মাদার চর্চিত হয় না।
লেখক : সাংবাদিক ও গবেষক