প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বাদশাহ-বাঁদীর দীর্ঘ গল্পে বাদশাহ গায়বি হেকিমের পরামর্শে স্লো-পয়জন প্রয়োগে স্বর্ণকারকে হত্যা করেন এবং বাঁদীকে স্বর্ণকারের প্রেমের শিকল থেকে মুক্ত করেন। মওলানা রুমি (রহ.)-এর ভাষ্যে, গায়বি হেকিম আল্লাহর ওলি ছিলেন, বাদশাহও ছিলেন। অর্থাৎ একই সঙ্গে পার্থিব ও ধর্মীয় কর্তৃত্বের অধিকারী ছিলেন। এরপরও তিনি কীভাবে স্বর্ণকারকে বিষপ্রয়োগে হত্যা করলেন? তার পক্ষে যুক্তি দিয়ে মওলানা বলেছেন, স্বর্ণকারের হত্যাকাণ্ড ইলহামযোগে আল্লাহর হুকুমে হয়েছে। স্বার্থের লোভে বা কোনো ভয়ের কারণে বাদশাহ্ এ কাজ করেননি। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, অলী-আল্লাহদের কাজকে কেউ নিজের সাথে তুলনা করলে মারাত্মক ভুল করবে। কারণ, দুনিয়াতে এমন অনেক কিছুই আছে, যা আকৃতিতে এক রকম দেখালেও স্বরূপ ও প্রকৃতিতে সম্পূর্ণ আলাদা। কিন্তু বস্তুবাদে অন্ধ আহমকরা এই ভিন্নতা ও তফাৎ বুঝতে অক্ষম। ফলে সবকিছুকে নিজের মতো ভেবে আত্ম-প্রবঞ্চনার শিকার হয় এবং মহাপুরুষদের শিক্ষা ও সাহচর্য থেকে বঞ্চিত হয়। আত্মভোলা মানুষের সামনে বিষয়টি পরিষ্কারভাবে তুলে ধরার জন্য মওলানা অবতারণা করেছেন মুদির দোকানি ও তোতা পাখির অভিনব গল্পের। ছোট্ট গল্পটিকে উপলক্ষ করে তিনি ব্যক্ত করেন জীবন ও জগতের অনেক সত্য তথ্য, আধ্যাত্মিক সাধনার পথের অমূল্য নির্দেশনা।
কাহিনি সংক্ষেপ
এক ছিল মুদির দোকানি। তার দোকানে শাক-সবজিও বিক্রি হতো। সেই সুবাদে তার নাম ছিল বাক্কাল বা সবজি বিক্রেতা। বাক্কাল-এর একটি সুন্দর তোতা পাখি ছিল। তোতা দোকানের মাঝখানে বসে থাকত। পাখিটি দেখতে যেমন সুন্দর সবুজ রংয়ের ছিল, তেমনি তার কণ্ঠস্বরও ছিল সুরেলা মন-মাতানো। তোতা দোকানের পাহারাদারির কাজ করত, আর মিষ্টি মিষ্টি কথায় ক্রেতাদের আনন্দ দিত। সে মানুষের মতো করে কথা বলতে পারত, আবার সুকণ্ঠি টিয়াদের সুরে গান গাইতেও পটু ছিল।
দোকানদার একদিন বাইরে গিয়েছিল বাড়িতে বা অন্য কোনো কাজে। এরি মধ্যে এক বিপত্তি ঘটে গেল। একটি ইঁদুর ধরতে এক বিড়াল লাফ দিল। আচমকা ভয়ে তোতা দোকানের একদিক থেকে ওড়াল দিয়ে অন্যদিকে গেল। এ সময় তার পাখার ঝাপটায় সরিষার তেলের কাচের বোতলগুলো নিচে পড়ে গেল। তোতা ভয়ে জড়োসড়ো হতবাক হয়ে গেল। একটু পরেই সওদাগর ফিরে এলেন। তিনি জানতেন না এরিমধ্যে কী ঘটে গেছে। মহাজনি কায়দায় যখন গদিতে বসলেন, বুঝতে পারলেন কী অঘটন ঘটে গেছে। তার জামা-কাপড় তেলে ভিজে চুপচুপে। চারদিকে ছড়িয়ে ছিঁটিয়ে আছে তেল। তিনি রাগে ক্রোধে তোতার মাথার পালক ধরে টান দিলেন। তাতে পালকগুচ্ছ ওঠে গেলে তোতা একেবারে টাকু বনে গেল। তোতা এখন দেখতে এক্কেবারে বেখাপ্পা, বেমানান। তার চেয়েও দুঃখের-দুর্ভাগ্যের ব্যাপার তোতা আর কথা বলে না।
এখন দোকানদারের দুঃখ-অনুতাপের অন্ত নেই। তিনি হা হুতাশ করতে লাগলেন— হায় কী করলাম? কী হলো! দুঃখে বেসামাল হয়ে তিনি নিজের দাঁড়ি নিজে টেনে ছিঁড়েন আর বলেন— যে তোতার আকর্ষণে দোকান জমজমাট ছিল, যে ছিল আমার সৌভাগ্যের সূর্য, কোন পাপে তা ডুবে গেল, আমার ব্যবসার ভবিষ্যৎ কী হবে? হায়! আমার প্রাণপ্রিয় তোতার মাথায় যখন আঘাত করছিলাম তার আগে যদি আমার হাতটাই ভেঙে যেত। হায়! আমার তোতার এখন কী হলো? কেন কথা বলে না?
দোকানি তোতার মুখে আবার বুলি ফুটাবার চেষ্টায় ফকির-দরবেশকে অকাতরে দান করেন। হয়তো বা কোনো ওছিলায় আবার ভাগ্য তার সুপ্রসন্ন হবে। তোতা হঠাৎ কথা বলে উঠবে। একাধারে তিনদিন তিন রাত এই অবস্থা চলতে থাকে।
দোকানদার অন্যভাবেও তোতার মুখের বুলি ফোঁটানোর চেষ্টা করেন। তোতার সামনে গিয়ে নানা অঙ্গভঙ্গি দেখান। হয়তো বা হঠাৎ মুখ খুলবে সৌভাগ্যের এই পাখি। কিন্তু না, দোকানদারের সব চেষ্টাই ব্যর্থ-বিফল।
একদিনের ঘটনা। এক নেড়ামাথা ভবঘুরে যাচ্ছিল দোকানের সম্মুখ দিয়ে। তোতার মতো তার মাথায়ও চুল ছিল না। একেবারে টাকু। পাতিল বা বাসনের পিঠের মতো তেলতেলে। তাকে দেখে হঠাৎ তোতা বলে ওঠল, ওহে তুমিও কি তাহলে বোতলের তেল ফেলে এমন হলে? আমার মতো মার খেয়ে টাকু বনে গেছ? দোকানে অনেক লোকজন ছিল। তোতার মুখে এমন তুলনা শুনে লোকেরা সবাই হেসে উঠল। সে যে আলখেল্লা পরা ভবঘুরে দরবেশ লোকটিকেও নিজের মতোই ভাবছে, তা শুনে সবার হাসি পেল! গল্পের এখানেই ইতি।
মওলানা রুমির বিশ্লেষণের ধারাভাষ্য
'মানুষ অন্যকেও নিজের মতো মনে করে'— সমাজে প্রচলিত এই প্রবাদ ও ধারণাকে উপলক্ষ করে মুদির দোকানি ও তার পোষা টিয়াপাখির তেল ফেলার গল্পের ছলে মওলানা রুমি (রহ.) আধ্যাত্মিক তত্ত্ব-রহস্যের এক সৌধমালা রচনা করেছেন।
মুদির দোকানি ও তার পোষা টিয়া পাখির গল্পের কাঠামো বলতে গেলে একেবারে সাদামাটা। এই গল্পকে উপলক্ষ করে মওলানা যে আধ্যাত্মিক ও নৈতিক শিক্ষা দিয়েছেন এবং একের পর এক উপমা-উদাহরণের সমাহার ঘটিয়েছেন তা অনুপম, অতুলনীয়। মওলানা অত্যন্ত বলিষ্ঠ ভাষায় বলছেন— 'কা'রে পা'কা'ন রা' কেয়া'স আয্ খোদ মগীর'— 'পবিত্রজনদের কাজকে নিজের সাথে তুলনা করো না'।
ফারসি ভাষায় 'শীর' মানে দুধ ও বাঘ। লিখতে এক দেখালেও অর্থে বিস্তর তফাৎ। এক 'শীর'কে মানুষ খায়, আরেক 'শীর' মানুষকে খায়। কাজেই শব্দের বাহ্যিক আকৃতি এক দেখে একরকম অনুমান করলে মারাত্মক ভুল হবে।
মওলানা বলছেন, মানুষ আবদালদের সম্পর্কে অজ্ঞাত-বেখবর। এ জন্যই জগতে এত গুমরাহী। তারা নবী-রাসুলদেরও নিজেদের মতো মানুষ ভেবে মারাত্মক ভ্রমে পতিত হয়। অথচ উভয়ের মধ্যে জমিন ও আসমানের ব্যবধান। দুই ধরনের মৌমাছি একই ফুলের রস আহরণ করে' অথচ বোলতা থেকে বিষ জন্মায় আর মৌমাছি মধুর ভাণ্ডার জমায়। উভয় ধরনের হরিণ বনে একই গাছগাছালি আহার করে; অথচ বিশেষ জাতের হরিণের নাভিতে কস্তুরি জন্মায়, তার সুগন্ধি জগৎ বিমোহিত করে। আর সাধারণ হরিণের পেটে বিষ্ঠাই জন্মায়। উভয় বাঁশ একই পানির উৎস থেকে রস চুষে খায় অথচ একটি মাঝখানে ফাঁকা, আরেকটির মধ্যখান রসে ঠাসা। এভাবে অগণিত উদাহরণ দেওয়া যায় সৃষ্টিজগতের নানা উপাদান থেকে।
আসলে আল্লাহর নবী (আ)-অলীগণ আহার করলে আল্লাহর নুর জন্মায় আর সাধারণ লোকেরা একই আহার করলে শুধু মল-মূত্রই নির্গত হয়। একই আহারে একশ্রেণির মনে হিংসা-বিদ্বেষ লোভের জন্ম নেয়, আর একশ্রেণির অন্তরে আল্লাহর প্রেমের নুর পয়দা হয়। মওলানা এর কারণ ব্যাখ্যা করে বলছেন, একটি যেন পাক জমি আরেকটি নোনা জমি। তাই ফল-ফসলও ভিন্ন ভিন্ন হয়। মওলানা এ পর্যায়ে নবী-রাসূলদের মুজেযা এবং জাদুকরদের ভেল্কিবাজি আর মূসা (আ.) ও ফেরআওনের জাদুকরদের লাঠির পার্থক্য বর্ণনা করেন।
মওলানা এক পর্যায়ে বনের ধারে করাতকলে গাছ চেরাই হতে দেখে তার অনুকরণ করতে গিয়ে বানর গ্যাড়াকলে আটকে পড়ার রসালো গল্পের অবতারণা করে বলেন, কাফিররা বানর চরিত্রের মুনাফিকী বেশ ধারণ করে ধোকা দেয়। এরপর তিনি মুনাফিক ও মোমিনদের নামাজ-ইবাদতে পার্থক্য নির্দেশ করেন এবং ঈমান ও মুনাফিকীর উৎস সম্পর্কে এক অতুলনীয় দার্শনিক ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, কষ্টিপাথর না হলে খাঁটি ও ভেজাল স্বর্ণের পার্থক্য করা যায় না। তাই অন্তরে ইয়াকীনের (প্রত্যয়ের) কষ্টিপাথর চাই। বিষয়টি মুখের রুচির মতোই। রুচি ঠিক থাকলেই ভালো খাবার আর পচা খাবারের পার্থক্য অনুভব করা যায়।
মওলানা রুমি (রহ.) তারপর সেই কষ্টিপাথর লাভের পথ বাৎলে দেন। বলেন যে, দেহ সত্তাকে বিধ্বস্ত করলেই তার দেয়ালের নিচে গচ্ছিত গোপন ভাণ্ডার আবিষ্কার করা সম্ভব হবে।
হাজামজা পুকুর পরিষ্কার করে মাটি দূরে ফেলে দিলেই নিচ থেকে পানির স্বচ্ছ ঝর্ণা উৎসারিত হবে। কাফিরদের হাত থেকে কিল্লা দখল করতে হলে আগে কামানের গোলায় তা ভাঙতে হবে। তারপরই মনের মতো পুনঃনির্মাণ করা যাবে। উপমার সম্রাট মওলানা রুমি (রহ.) অগণিত উপমার সাহায্যে এ সত্যটি প্রতিষ্ঠিত করতে চান যে, আত্মার শক্তির উদ্বোধন চাইলে আগে দেহের চাহিদাকে অস্বীকার করতে হবে। এভাবে নফস পুরো কাবু হয়ে গেলে পরে দেহের চাহিদা মেটালেও বিভ্রান্তির আশংকা নেই। আত্মিক শুদ্ধি ও উন্নতির বিধিবদ্ধ নিয়ম হিসেবে মওলানা এ পথ বাৎলিয়েছেন। নচেৎ আল্লাহ্র ইচ্ছা হলে ভিন্ন কোনো পন্থায়ও তিনি বান্দাকে নিজের কাছে টেনে নেন বলে মওলানার অভিমত।
মওলানা সতর্ক করে দিয়ে বলছেন, সাধনার পথে শুধু পাগল হলে চলবে না। সজাগ সতর্কও থাকতে হবে। এ পথে একজন মুরব্বি দরকার। তবে সে মুরব্বি চিনতে হবে। অনেকে আছে আল্লাহমুখী, অনেকে ইবলিস চরিত্রের, বুযুর্গানে দ্বীনের বুলি ও আচরণ নকল করে মুরিদ শিকারের ফাঁদ পেতে থাকে। এরা ভণ্ডনবী মুসায়লামা কাযযাবের দোসর। তবে সুগন্ধি ও দুর্গন্ধ দেখলেই বুঝা যাবে কোনটি খাঁটি আতর আর কোনটি দুর্গন্ধের ভণ্ড-তাপস। এরপর মওলানা ইহুদী সম্প্রদায়ের এক ভণ্ডপীরের কাহিনির অবতারণা করেন, যে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ে চিরস্থায়ী রক্তপাতের নীলনকশা এঁটেছিল। আমরা এখন মওলানার যবানীতে মুদি দোকানি ও টিয়া-পাখির গল্পটি হৃদয়ঙ্গম করার চেষ্টা করব।
(ড. মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী রচিত মসনবি শরিফের গল্প ১-৬ খণ্ড প্রকাশ করেছে, ছায়াপথ প্রকাশনী ৩১/১, পুরানা পল্টন, (শরীফ কমপ্লেক্স) লিফট-৪, ঢাকা-১০০০। ফোন ০১৭১১১১৫৮২৯। মসনবির গল্পভিত্তিক আলোচনা শুনতে ইউটিউবে ভিজিট করুন— CHAYAPATH PROKASHONI)