প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ৩০ ডিসেম্বর, ২০২৩
ফিলিস্তিনে মসজিদুল আকসা নির্মাণ করেন আল্লাহর নবী দুনিয়ার বাদশাহ হজরত সুলায়মান (আ.)। রোজ সকালে তিনি মসজিদ পরিদর্শনে যেতেন। একদিন লক্ষ্য করেন, মসজিদের এক কোণায় একটি চারা গজিয়ে উঠছে। সবুজ লিকলিকে কিশলয়টি বড় সুন্দর, দৃষ্টিকাড়া। সুলায়মান (আ.) এগিয়ে গেলেন সেদিকে। চারাগাছ সালাম করল আল্লাহর নবীকে কাছে পেয়ে। সুলায়মান (আ.) মুগ্ধ নয়নে তার সালামের জবাব দিয়ে বললেন, তোমার নাম কী? কী গুণাগুণ তোমার? চারাগাছ বলল, হে দুনিয়ার বাদশাহ! আমার নাম হলো খাররুব, বিনাশী।
গোফত আন্দর তো ছে খা’ছিয়্যাত বুয়াদ
গোফত মন রোস্তম মকান ওয়েইরা’ন শওয়াদ
বলল, তোমার গুণাগুণ কী আছে বলো তো শুনি
বলল, বিরান হয়ে যায় যে স্থানে জন্মাই আমি।
আমি যেখানে জন্মাই অচিরেই সে স্থান ধ্বংস ও বিরান হয়ে যায়। তাই আমার নাম খাররুব, বিধ্বংসী, বিনাশী। আল্লাহর নবী চারাগাছটির কাছ থেকে একটি বার্তা পেয়ে গেলেন। তিনি বুঝতে পারলেন, তার সফরের সময় হয়ে গেছে, মৃত্যুর পারাপার সম্মুখে। কারণ, তিনি যতদিন আছেন মসজিদুল আকসার কোনো ক্ষতি হবে না। তাই মসজিদুল আকসার ক্ষতি হওয়ার বার্তা নিয়ে চারাগাছ জন্মানোর অন্য অর্থ সুলায়মান (আ.)-এর চিরবিদায়।
মওলানা রুমি বলেন, যতদিন আমাদের মৃত্যু না হবে, ততদিন আমাদের মনের মসজিদুল আকসা ধ্বংস হতে পারবে না। নিজের ওপর, নিজের মনের ওপর যেদিন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলব সেদিনই আমার মৃত্যু। তোমার দেহের অভ্যন্তরে যে দিল-মন, সেটিই তোমার মসজিদুল আকসা। তোমার দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সেই মসজিদে নামাজ পড়ে। তার মানে, দেহ-দিলের হুকুম মেনে চলে। মানুষের কাজকর্ম প্রকাশ পায় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দ্বারা। আর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ চালিত হয় চিন্তার মাধ্যমে। অভিজ্ঞতা হলো, কাজ করার জন্য মানুষ আগে চিন্তা করে, তারপর সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর কাজটি করে। চিন্তার উদয় হয় মন বা অন্তর থেকে। কাজেই দেহ ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ মূলত দিলের অনুগত। এ কারণে দিলের জমিনে যখন চারাগাছ জন্মাবে, তার ব্যাপারে সতর্ক হতে হবে।
মনের জমিনে চারাগাছ বলতে কী বুঝায়? নিশ্চয়ই তার উদ্দেশ্য মনের নানারূপ চিন্তা ও ভাবনা। যদি দেখ, চারাগাছরূপ চিন্তাভাবনা বিষাক্ত কাঁটাযুক্ত। তাহলে তা উপড়ে ফেলতে হবে। তোমার মনের মধ্যে যখন দুষ্ট বন্ধুর ভালোবাসা উদ্গত হয়, কুধারণা কুভাবনার প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় তৎক্ষণাৎ তা ঝেড়ে ফেল। তার কাছ থেকে পালিয়ে যাও। মনের জমিন থেকে শিকড়সুদ্ধ উপড়ে ফেল। কারণ, যদি শিকড় গজায়, গোড়া শক্ত হয়, তাহলে তোমার দিলকে ধ্বংস করবে। তোমার অস্তিত্বকে বিরানভূমিতে পরিণত করবে।
ওহে নফসের কামনা বাসনায় প্রলুব্ধ! তোমার যত বাঁকা চিন্তা, যত অহমিকা সব তোমার দিলের বিনাশী উদ্ভিদ। খুব সতর্কতার সঙ্গে সেসবের মোকাবিলা করো। নিজেকে অপরাধী বলে ভাব, সব জান্তা হওয়ার বাতিক যেন তোমাকে আক্রান্ত না করে। অনেক সময় আমি জানি না বলা, জ্ঞানের বাহাদুরী দেখানোর চেয়ে উত্তম।
আয পেদার আ’মূয আই রওশন জবীন
রব্বনা গোফতো যালামনা পীশ আযীন
বাবার কাছ থেকে শেখ হে আলোকিত কপাল
রব্বানা যালামনা বললেন তিনি হয়ে গেল কতকাল।
নিজের দুর্বলতা স্বীকার করা, নিজেকে দোষী ভাবা, নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করার মধ্যে অনেক উপকার নিহিত। এই উপকার যদি উপলব্ধি করতে চাও তোমার বাবার কথা স্মরণ করো। বাবা আদম (আ.)-এর কাছ থেকে শেখ।
বেহেশতে নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল খাওয়ার পর যখন আল্লাহ কৈফিয়ত চাইলেন, আদম কেন তুমি আমার আদেশ অমান্য করলে? সঙ্গে সঙ্গে তিনি বললেন, ‘তারা (আদম ও হাওয়া) বলল, হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা নিজেদের প্রতি অন্যায় করেছি, যদি তুমি আমাদের ক্ষমা না করো এবং দয়া না করো, তবে তো আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হব।’ (সুরা আরাফ, আয়াত-২৩)।
ন বাহা’না কর্দো ন তযবীর সা’খত
ন লেওয়ায়ে মকরো হীলত বর ফরাখত
টালবাহান করেননি তিনি, আশ্রয় নেননি মিথ্যা কথার
ফন্দি কৌশলের পতাকা তুলে নিজেকে করেননি আড়াল।
আল্লাহর সামনে কৈফিয়ত দিতে গিয়ে আদম (আ.) কুশলি কথাবার্তা ও মিথ্যার আশ্রয় নিতে পারতেন। তিনি তা করেননি। অথচ সে কাজটি ইবলিস করেছিল। তাকে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছিলেন আদমের সামনে সিজদায় নত হও। সে সিজদা করেনি। আল্লাহর পক্ষ হতে কৈফিয়ত চাওয়া হলো, কেনো আমার আদেশ অমান্য করলে? কেনো আদমকে সিজদা করলে না? ইবলিস তখন তর্কজুড়ে দিল আল্লাহর সঙ্গে। নিজের অপরাধের দোষ চাপাল আল্লাাহর ওপর। বলল, আমি আগুনের তৈরি। আমার চেহারা ছিল উজ্জ্বল। তুমিই আমাকে লজ্জিত করেছ। সে কারণে আমি অভিশপ্ত, আমার মলিন বদন।
হীন বখা’ন রাব্বী বিমা আগওয়াইতানী
তা নগর্দী জবরী ও কয কম তনী
সাবধান! পড় বিমা আগওয়াইতানী আয়াত
না হও যেন জবরী মতবাদী না ধর বক্রপথ।
লক্ষ্য করো, ইবলিস আল্লাহতায়ালার ওপর কীভাবে দোষ চাপাল,
‘সে (ইবলিস) বলল, (খোদা) তুমিই আমাকে বিভ্রান্ত করেছ। তাই আমিও তোমার সরলপথ হতে মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য ওঁতপেতে থাকব।’ (সুরা : আরাফ : ১৬)।
নিজে বিভ্রান্ত হওয়ার দোষটা চাপাল আল্লাহর ওপর। বলল, তুমি ইচ্ছা করলে আমার মধ্যে আদমকে সিজদা করার মনোভাব জাগিয়ে দিতে পারতে। আমার মনের নিয়ন্ত্রণ তোমার হাতে। আমি তো তোমার হাতের পুতুল। আমার কী ক্ষমতা আছে? মওলানা রুমির ভাষায় এই যুক্তি জবরী মতবাদের। ইসলামের ইতিহাসে জবরিয়া মতবাদ এক ধ্বংসাত্মক, মারাত্মক মতবাদ। আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুলের অপব্যাখ্যা করে তারা বলতে চায়, আল্লাহর হুকুম ছাড়া গাছের পাতা নড়ে না। আমরাও নড়তে পারি না। ‘যেমনে নাচাও তেমনি নাচি পুতুলের কী দোষ।’ আমরা পুতুল, স্রষ্টার হাতের ক্রীড়নক। কাজেই ভালো কাজ করি বা মন্দ, তার আসল কর্তা আল্লাহ।
মওলানা বলেন, তুমি দ্বীনের দায়িত্ব এড়ানো আর ভোগ ও বিলাসিতায় মত্ত হওয়ার জন্য এই মতবাদের দোহাই দাও। এহেন মতবাদ চর্চা করে আনন্দের মওজে হাবুডবু খাও। আচ্ছা বলো তো, তুমি যদি আল্লাহর হাতের ক্রীড়নক হও, তোমার কর্মক্ষমতা যদি না থাকে, যদি নিয়তির বাধ্য হয়েই সব কাজ কর, তাহলে ভোগের রাজ্যে তোমার এত আনন্দ কেন। বাধ্য হয়ে কোনো কাজ করলে তাতে তো আনন্দ করার কিছু নেই।
তোমার কথা সত্য হলে কারো জীবনে আনন্দ নিরানন্দ বলতে কিছুর অস্তিত্ব থাকবে না। তকদিরের দোহাই দেয়ার পেছনে তোমার প্রতারণাটা লক্ষ কর, ধর্মের দায়িত্ব পালনের কথা এলে তুমি তকদিরের বাধ্যতার দোহাই দাও। অথচ দুনিয়াবী স্বার্থের কথা যখন আসে তখন বাধ্যতার কথা ভুলে যাও। লুটেপুটে খাওয়ার জন্য বেসামাল হয়ে পড়।
মওলানা বলেন, তত্ত্ব-জ্ঞানীরা জানে, ইবলিসের যুক্তিতে চালাকি আর মারপ্যাঁচ। কিন্তু আদম যুক্তিতর্কের ধার ধারেনি। তিনিও তকদিরের লিখনের দোহাই দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি যে আল্লাহর প্রেমে একাকার। তাই সরাসরি নিজেকে সঁপে দিলেন আল্লাহর কাছে। কাজেই তুমি শয়তানি চালাকি আর চাতুর্য ছেড়ে দাও। প্রেমের সবক নাও। তার সামনে আত্মভোল হয়ে যাও। দুনিয়ার প্রতি উদাসীন, আল্লাহর নির্দেশ পালনে সদা সজাগ সতর্ক থাক। তোমার জ্ঞান বুদ্ধি যুক্তিতর্ক কোরবান করে দাও বন্ধুর পায়ে। তোমার মধ্যে যত অহংকার, পদ ও সম্পদের লোভ নিজেকে নির্দোষ ভাবার ব্যারাম, তা দমন করো। তাহলেই তুমি নফসে আম্মারার অশুভ চক্রান্ত হতে রেহাই পাবে। তোমার নফস মোটা হয়ে গেছে। আর বাড়তে দিও না। তার হাতে অস্ত্র দিও না। কারণ,
বদ গোহার রা’ ইলমো ফন আ’মূখতন
দা’দনে তীগী বে দস্তে রা’হযন
অপদার্থকে জ্ঞান ও বিদ্যা শিক্ষা দান
ডাকাতের হাতে তরবারি দেয়ার সমান।
যার জন্মগত স্বভাব নষ্ট। নৈতিক, চারিত্রিক দিক দিয়ে যে অশুদ্ধ, সে ‘বদ গোহার’। তাকে জ্ঞান দান মানে ডাকাতের হাতে অস্ত্র তুলে দেয়া। ধারালো ছুরি ডাক্তার সার্জনের হাতে মানুষের প্রাণ রক্ষা করে। চোর ডাকাতের হাতে পড়লে মানুষকে প্রাণে বধ করে। কাজেই চোর-ডাকাতের হাতে তরবারি তুলে দেয়ার মতো তোমার নফসকে লাগামহীন ছেড়ে দিও না। আগে নফসকে শুদ্ধ করো। সাধনার কষাঘাতে তার অবাধ্যতা দমন করো। তার অন্যায়, মন্দ চিন্তা ও কামনা-বাসনাগুলোর বিরোধিতা করো।
মওলানা বলেন, নফসের কামনা বাসনাকে প্রশ্রয় দেয়া অপদার্থ লোককে জ্ঞান শিক্ষা দেয়ার মতো। এ কাজ এতই জঘন্য যে, তার চেয়ে মাতাল কাফ্রির হাতে ধারালো ছুরি দেয়া অনেক উত্তম।
ইলমো মালো মনসবো জা’হো ও কেরা’ন
ফিতনা আ’মদ দর কফে বদগওহারা’ন
অপদার্থের হাতে জ্ঞান, ধন, পদ, প্রতিপত্তি
ফিতনা, বিপর্যয় ডেকে আনবে যত দুর্গতি।
মওলানা পরিশেষে ইসলামে আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ ও লড়াই ফরজ হওয়ার দর্শনটি ব্যাখ্যা করেছেন অতি সংক্ষেপে তবে বলিষ্ঠ ভাষায়। তিনি বলেন, দুষ্টের হাত থেকে তীরবল্লম কেড়ে নেয়ার জন্যেই ইসলামে জিহাদ ফরজ করা হয়েছে।
পস গযা’ যিন ফরয শুদ বর মুমেনা’ন
তা’ সেতা’নন্দ আয কফে মজনুন সেনা’ন
যুদ্ধ ফরজ হয়েছে মোমেনের ওপর এই কারণে
তীর-বল্লম যেন কেড়ে নেয় মাতালের হাত থেকে।
(মওলানা রুমির মসনবি শরিফ, ৪খ. বয়েত, ১৩৭৩-১৪৫২)।