ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০২ এপ্রিল ২০২৬, ১৯ চৈত্র ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

অলি হওয়ার পঞ্চ বুনিয়াদ

মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ খান
অলি হওয়ার পঞ্চ বুনিয়াদ

‘অলি’ তাসাউফের গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিভাষা। অলি হওয়া একজন মুসলমানের সফলতার চূড়ান্ত ধাপ। যে অলি হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করবে তিনিই হবেন আল্লাহর প্রিয়পাত্র। কেননা, আল্লাহর অলিগণ উভয় জগতেই সফল। মহান আল্লাহ অলিদের সম্পর্কে বলেন : ‘জেনে রাখো! আল্লাহর অলিদের কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না।’ (সুরা ইউনুস : ৬২)। আল্লাহর অলি বা প্রিয়পাত্র হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করতে প্রয়োজন বিশেষ মেহনত বা মুজাহাদা।

আল্লাহ ওয়ালাদের সোহবত : মানুষ সঙ্গ ও পরিবেশের প্রভাবে প্রভাবিত। কোনো ব্যক্তি যদি কখনো ভালো পরিবেশ বা সৎ মানুষের সংস্পর্শে থাকে তাহলে সেও সৎ হবে। ঠিক তেমনি যদি সে অসৎ মানুষের সঙ্গে চলাচল করে তাহলে তার অসৎ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কথায় আছে ‘সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ’। এ জন্য আল্লাহর অলি হতে প্রয়োজন আল্লাহ ওয়ালাদের সোহবত। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ কোরআনে বলেন : ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যনিষ্ঠদের সঙ্গে থাক।’ (সুরা তাওবা : ১১৯)।

রাসুলের সুন্নাহর অনুসরণ : রাসুলের সুন্নাত আমাদের জন্য মান্য করা আবশ্যক। সুন্নাত পরিপন্থি সব কাজেই রয়েছে ঝুঁকি। জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে রাসুলের সুন্নাহ আঁকড়ে ধরার মধ্যেই রয়েছে সফলতা। সুন্নাহ পরিপন্থি কোনো কাজে কখনোই সফলতা আসবে না। আর আল্লাহর অলি হওয়ার অন্যতম শর্ত হলো, সুন্নাহ অনুসারে জীবনযাপন করা। কেননা, সুন্নাহর যথার্থ অনুসরণ করার মাধ্যমেই অলি হওয়া যায়। লাভ করা যায় কাঙ্ক্ষিত জান্নাত। হজরত আনাস (রা.) বলেন রাসুল (সা.) আমাকে বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমার সুন্নাতকে ভালোবাসে সে আমাকেই ভালোবাসে, আর যে আমাকে ভালোবাসে সে আমার সঙ্গে জান্নাতে থাকবে। (তিরমিজি : ২৬৭৮)।

জিকিরের পাবন্দি : জিকির আল্লাহ ও বান্দার মাঝে সেতুবন্ধন। বান্দা জিকিরের দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য হাসিল করে। জিকিরে দূর হয় অন্তরের কালিমা। ঈমানের মধ্যে তৈরি হয় সজীবতা। আর জিকির আল্লাহর অলি হওয়ার অন্যতম মাধ্যম। কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘যারা ঈমানদার তারা এমন লোক যে, যখন আল্লাহর জিকির করা হয়, তখন তাদের অন্তর ভীত হয়ে পড়ে। আর যখন তাদের সামনে আল্লাহর আয়াত পাঠ করা হয়, তখন তাদের ঈমান বেড়ে যায় এবং তারা স্বীয় প্রভুর ওপর ভরসা করে।’ (সুরা আনফাল : ২)। শয়তান মানুষকে গোনাহের কাজে উৎসাহিত করে। মানুষ গোনাহে লিপ্ত হলে অন্তরে গোনাহের দাগ পড়ে। জিকিরের মাধ্যমে সে দাগ দূর হয়। হাদিসে এসেছে ইবনে ওমর (রা.) বলেন রাসুল (সা.) বলেছেন, প্রত্যেক বস্তু পরিষ্কার করার উপকরণ আছে। আর অন্তরের ময়লা পরিষ্কার করার উপকরণ হলো আল্লাহর জিকির। (আত-তারগিব ওয়াত তারহিব : ২/৩২৭)।

গোনাহ পরিত্যাগ করা : আল্লাহর অলি হতে চাইলে সর্বপ্রথম হারাম খাবার, হারাম বস্তু অর্জন ও ব্যবহার বর্জন করতে হবে। হালাল খেতে হবে। আর অবশ্যই সর্বপ্রকার গোনাহ ত্যাগ করতে হবে। চাই সে গোনাহ যতই ছোট হোক না কেন। কেননা, ছোট গোনাহও পাপের খাতায় লিপিবদ্ধ করা হয়।

হজরত আয়েশা (রা.) বলেন রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘হে আয়েশা! তুমি ছোট ছোট গোনাহ থেকেও নিজেকে রক্ষা করো। কেননা, সেটা লেখার জন্যও আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন ফেরেশতা নিযুক্ত আছেন। (মিশকাত হাদিস : ৫৩৫৬)।

মুহাসাবা করা : মুহাসাবা যার বাংলা অর্থ হিসাব-নিকাশ নেওয়া। পরিভাষায়, প্রতিদিন রাতে বিছানায় শুয়ে ঘুমের আগে সারাদিনের আমলের হিসাব করা অর্থাৎ আজকের সারাদিনে কী পরিমাণ গোনাহ বা নেকি হলো তা নিজে হিসাব করা। কোনো গোনাহ হয়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গে তওবা করে নেওয়া। কোনো আমল ছুটে গেলে তা যনে আর না ছুটে সে ব্যাপারে পরবর্তীতে সতর্কতা অবলম্বন করা। এভাবে নিত্যদিন এ ধরনের মুহাসাবা অব্যাহত থাকলে অলি হওয়ার পথ সহজ হয়।

পবিত্র কোরআনেও আল্লাহ তার বান্দাদের দৈনন্দিন আমলের হিসাব নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, ‘হে মোমেনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। আর প্রত্যেক ব্যক্তির উচিত এ বিষয়ে ভেবে দেখা যে, সে আগামী দিনের জন্য অগ্রিম কী প্রেরণ করেছে? আর তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে সম্যক অবহিত। (সুরা হাশর : ১৮)। অন্য আরেক হাদিসে শাদ্দাদ ইবনে আউস (রা.) বলেন রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি, যে নিজের মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে এবং মৃত্যুর পরবর্তী জীবনের জন্য কাজ করে। আর নির্বোধ সেই ব্যক্তি যে নিজের মনকে তার কামনা-বাসনার অনুগামী বানিয়ে দেয় এবং আল্লাহর কাছে অহেতুক আশা করে’। (তিরমিজি : ২৪৫৯)। ইমাম তিরমিজি (রহ.) ‘মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার’ ব্যাখ্যায় বলেছেন, ‘কেয়ামত দিবসে হিসাবের মুখোমুখি হওয়ার আগে কোনো ব্যক্তি দুনিয়াতে নিজ মনের হিসাব নেওয়া।’

লেখক : তরুণ আলেম

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত