প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৩ জানুয়ারি, ২০২৬
মুসা (আ.) তখন টগবগে যুবক। তখনও নবুয়াত লাভ করেননি। ছোটবেলা থেকে লালিত-পালিত হয়েছেন মিশর সম্রাট ফেরাউনের ঘরে। খোদাদ্রোহী ফেরাউন ছিল কিবতি বংশের। সেই সূত্রে কিবতিরা মিশরের শাসক গোষ্ঠী। এক ঘটনায় মুসা (আ.)-এর এক ঘুষিতে একজন কিবতি মারা যায়। রাষ্ট্রের সর্বত্র রেড এলার্ড জারি হয় ঘাতককে ধরার জন্য। রাজসভার এক সত্যাশ্রয়ী লোকের গোপন পরামর্শে মুসা মিশর থেকে পলায়ন করেন নিরুদ্দেশে। ঘটনা প্রবাহের মধ্য দিয়ে তিনি উপনীত হন মাদায়েনে। মাদায়েন এলাকায় আল্লাহর নবী ছিলেন হজরত শোয়াইব (আ.)। বিস্তারিত শোনার পর তিনি মুসাকে অভয় দিলেন, আশ্রয় দিলেন। বললেন, আমি আমার দুই মেয়ের একজনকে তোমার সাথে বিবাহ দিতে চাই। শর্ত হচ্ছে আট বছর বা কমবেশি সময় আমার ভেড়ার পালের রাখালি করতে হবে। সেই থেকে মুসা শ্বশুর এর ঘরে রাখালি করেন।
রাখাল মুসা ভেড়ার পাল নিয়ে মাঠে ছিলেন। হঠাৎ একটি ভেড়া দলছুট হয়ে পালিয়ে দৌড় দিল। মুসা ভেড়াটির পেছনে দিলেন দৌড়। কিন্তু ধরতে পারলেন না। দৌড়ের মধ্যে সন্ধ্যা নেমে এল। মুসা এতখানি দৌড়ালেন যে, মূল ভেড়ার পাল তার দৃষ্টির আড়ালে চলে গেল। যেকোনো সময় দলছুট ভেড়া বা ভেড়ার পালে নেকড়ের হামলার আতঙ্ক ছিল। সেই ভয় কি ভেড়ার মনে ছিল। দৌড়াতে দৌড়াতে ভেড়া এক সময় ক্লান্ত হয়ে বসে পড়ে। মনে করা হয় মুসা (আ.)-এর স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি রাগি ছিলেন। এখানে তিনি কী করলেন দেখার বিষয়।
ক্লান্ত চলৎশক্তিহীন ভেড়া তাকিয়ে আছে মুসার দিকে, অপরাধী মন। কারণ, তার পেছনে মুসাকেও দৌড়তে হয়েছে দীর্ঘক্ষণ। তিনিও পরিশ্রান্ত। নিশ্চয় ক্ষুব্ধ। না জানি কী শোধ নেন। দৌড়াতে গিয়ে মুসার পা দুটি ফুলে গেছে। তারপরও তিনি এখন অচঞ্চল, শান্তচিত্ত। তার অন্তর অভাবিত দয়া-মায়ায় আপ্লুত। মুসা ভেড়াটি কোলে তুলে নিলেন। গায়ের ধুলোবলি ঝেড়ে আদর করতে লাগলেন।
কাফ হামি মালিদ বর পোশত ও সরস
মি নওয়াখত আজ মেহ্র হামচোন মাদরশ
হাত বুলাচ্ছিলেন শুধু তার পিঠে ও মাথায়
আদর মেখে দিচ্ছেন গায়ে তার মায়ের মায়ায়।
নিম জাররা তায়রগি ও খশম নেই
গাইরে মেহরো রাহমো আবে চশম নেই
আধা রত্তি রাগ কিংবা অসন্তুষ্টি ছিল না তার প্রতি
আদর দয়া, চোখের পানির মমতা দিলেন মাখি।
ভেড়ার গায়ে মাথায় মুসা শুধুই হাত বুলান। এমন আদর যত্ন; যেন মা-ভেড়া শাবকের গায়ে আদর মেখে দিচ্ছে। এত দৌড়ালেন, ক্লান্ত শ্রান্ত হলেন, তারপরও মনে এতটুকুন রাগ নেই। দয়া-মায়া ছাড়া যেন মুসার অন্তরে কিছুই নেই। তিনি ভেড়ার গায়ে হাত বুলাতে বুলাতে বললেন, ধরে নিলাম, আমার প্রতি তোমার মনে দরদ নেই। কিন্তু তুমি নিজেকে কেন কষ্ট দিলে, আমাকে বল। কেন এভাবে দৌড়ালে। তুমি তো নেকড়ের খপ্পড়ে পড়তে পারতে। চোর ডাকাতের হাতে পড়লেও দয়া দেখাতো না তোমাকে। আরও কত বিপদ আসতে পারত। কেন এভাবে খামখা দৌড় দিয়েছ।
নবী রাসুলগণ (আ.), আউলিয়া-বুযুর্গানে দ্বীন, সংস্কারকগণ মানুষের পরিণতির ব্যাপারে খুবই দরদিপ্রাণ। পথহারা মানুষের জন্য তাদের প্রাণ কাঁদে। তাদের মন্দ ব্যবহারে রুষ্ট হয়ে কখনও কঠোর আচরণ করেন না, প্রতিশোধপ্রবণ হন না। বরং দয়া-মায়া, মনের স্বচ্ছতা দিয়ে নানা কৌশলে তাদের ধ্বংসের কবল থেকে উদ্ধার করেন আর প্রেমের আবহে মিলনমেলায় সমবেত করেন।
নবী করিম (সা.)-এর সুমহান চরিত্রের এই গুণটির ভূয়সী প্রশংসা করেছেন স্বয়ং আল্লাহতায়ালা। বলেছেন, আপনি যদি রুক্ষ স্বভাবের, কর্কশভাষী হতেন তাহলে আপনার চারপাশ থেকে লোকরা সরে যেত। ‘আল্লাহর দয়ায় আপনি তাদের প্রতি কোমল-হৃদয় হয়েছিলেন; যদি আপনি রূঢ় ও কঠোরচিত্ত হতেন তবে তারা আপনার আশপাশ হতে সরে পড়ত। সুতরাং আপনি তাদেরকে ক্ষমা করে দিন এবং তাদের জন্য (আল্লাহর কাছে) ক্ষমা প্রার্থনা করুন এবং কাজে-কর্মে তাদের সাথে পরামর্শ করুন, অতপর আপনি কোনো সংকল্প করলে আল্লাহর উপর নির্ভর করবেন; যারা নির্ভর করে আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আলে ইমরান : ১৫৯)।
এমন স্বভাব আল্লাহর খাস রহমত। সেই রহমত বরণ ও ধারণ করার জন্য কঠিন পরিস্থিতিতে ধৈর্যের অনুশীলন প্রয়োজন। নবী রাসুলগণ (আ.) সেই অনুশীলন করেছেন ভেড়ার পালের রাখালি করে। মুসা (আ.)-এর জীবনেও সেই অনুশীলন চলছিল ভেড়ার পাল চরানো আর দলছুট ভেড়া সুপথে আনতে চরম ধৈর্যের পরাকাষ্ঠা দেখানোর মধ্য দিয়ে।
মুসা (আ.) ভেড়ার পেছনে দৌড়ানোর পর বাগে পেয়ে রাগ উজাড় করার পরিবর্তে যখন আদর মমতার পরশ বুলিয়ে দিলেন, তখন আল্লাহতায়ালা ফেরেশতাদের সম্বোধন করে বললেন, ‘দেখ আমার মুসা নবুয়তের যোগ্য হলো। মানব সম্প্রদায়ের নেতৃত্ব তার জন্য শোভন এখন।’ যে মুসা একটি দলছুট ভেড়াকে পাওয়ার জন্য এমন জানকান্দানী করলেন, বাগে পাওয়ার পর রাগ দেখানোর পরিবর্তে মায়া-মমতা দেখালেন তিনি উম্মতের পথপ্রদর্শক হওযার যোগ্য। এমন যোগ্য পথপ্রদর্শকই মানুষকে নফসে আম্মারার খপ্পড়ে পড়ার হাত থেকে রক্ষা করতে পারেন।
এ সত্যটিই বিবৃত হয়েছে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিসে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) ইরশাদ করেন, আল্লাহতায়ালা কোনো নবীকে প্রেরণ করেননি; বরং তিনি বেড়ার পালের রাখালি করেছেন। এ বাণী শোনার পর সাহাবায়ে কেরাম জানতে চাইলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনিও কি রাখালি করতেন? তিনি বলেন, হ্যাঁ, আমিও কারারিত এলাকায় আমি মক্কী লোকদের রাখালি করতাম। (কারারিত- মক্কার উপকণ্ঠে উহুদের কাছে একটি এলাকার নাম। (বোখারি)।
এ হাদিসের বিষয়বস্তু বিবৃত হয়েছে নিম্নের বয়েতে।
মোস্তফা ফরমুদ খোদ কে হার নবী
কর্দ চুপানিশ বুরনা য়া সবি
নবী মুস্তফা ফরমান, যত নবী-রাসুল ছিলেন
বয়সে কিংবা কৈশোরে তারা রাখালি করেছেন।
মওলানা রুমি (রহ.) আরও পরিষ্কার ভাষায় বলেন,
বি শোবানি কর্দনো অন এমতেহান
হক নদাদশ পিশওয়াইয়ে জাহান
রাখালি করা ও সে পরীক্ষায় উত্তরণ ব্যতিরেকে
দেননি নেতৃত্ব কাউকে আল্লাহ এ জগতের বুকে।
তা শওয়াদ পয়দা ওয়েকার ও সবরেশান
কর্দেশান পিশ আজ নবুয়াত হক শোবান
যাতে হয় তাদের ধৈর্য, সহনশীলতার বিকাশ প্রমাণ
নবুয়াতের আগে করেন তাদের রাখালিতে নিয়োগ দান।
মওলানা আরও বলেন, যে শাসক, জনদায়িত্বশীল যেভাবে আদেশ দেয়া হয়েছে, সেভাবে মানুষের রাখালি করে, নিজের আকল বুদ্ধি দূরদর্শিতা, বিচক্ষণতা কাজে লাগিয়ে মুসা (আ.)-এর মতো ধৈর্য সহ্যের পরিচয় দেন, তাকে নিশ্চয়ই চাঁদ সূর্য ছেড়ে উর্ধ্বলোকে সম্মানিত করা হয়। মানব সম্প্রদায়ের নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতার জগতে রাখালি করার মর্যাদায় অভিষিক্ত করেন। লাগামছাড়া ভেড়ার পাল নিয়ন্ত্রণ করা, দলছুট ভেড়াদের নেকড়ের হাত থেকে রক্ষা করা চরম ধৈর্যের পরাকাষ্ঠা দেখানো ছাড়া কারও পক্ষে সম্ভব নয়। সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন নবী-রাসুলগণ। তারা গবাদি পশুর রাখালি করে পরীক্ষায় পাস করেছেন। পুরস্কার হিসেবে আল্লাহতায়ালা তাদের করেছেন সত্যান্বেষী মানুষের পথপ্রদর্শক দিশারী, আধ্যাত্মিক রাহবর। তারা মন্দের বদলায় মন্দ নয়; বরং ভালোর মাধ্যমে মন্দের বদলা দিয়েছেন। কোরআনে এমন গুণের প্রশংসা করেছেন আল্লাহতায়ালা। ‘ভালো ও মন্দ সমান হতে পারে না। মন্দ প্রতিহত কর উৎকৃষ্ট দ্বারা; যদি তাই কর, তাহলে তোমার সঙ্গে যার শত্রুতা আছে, সে তোমার অন্তরঙ্গ বন্ধু হয়ে যাবে। এই গুণের অধিকারী করা হয় শুধু তাদেরই যারা ধৈর্যশীল, এই গুণের অধিকারী করা হয় শুধু তাদেরই যারা মহাভাগ্যবান।’ (সুরা হামিম সেজদা : ৩৪- ৩৫)। ধৈর্যের বদৌলতে গবাদিপশুর রাখালি হতে মানবজাতির দিশারির পদে উন্নীতদের জীবনালখ্যের প্রতি ইঙ্গিত করে মওলানা রুমি (রহ.) বলেন-
আনচুনান কে আম্বিয়া রা যিন রেআ
বরকশিদ ও দাদ রা-য়ে আসফিয়া
নবী-রাসুলদের যেভাবে উন্নীত করে রাখালি হতে
আসীন করেছেন সত্য সন্ধানীদের দিশারী পদে।
ধৈর্যের এই গুণ, এমন চরিত্র বৈশিষ্ট্য ধারণ করার সাধনার নামই আধ্যাত্মিক সাধনা। এ মুহূর্তে আমাদের মোনাজাত, আল্লাহর সেই রহমত, ধৈর্যের মহানেয়ামত ছায়াপাত করুক আমাদের জীবনে, আমাদের চেতনা ও মননের গহিনে।
(মওলানা রুমির মসনবি শরিফ, খণ্ড : ৬, বয়েত : ৩২৮১-৩২৯৫)।
(ড. মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী রচিত মসনবি শরিফের গল্প ১-৬ খণ্ড প্রকাশ করেছে ছায়াপথ প্রকাশনী, মসজিদ বায়তুশ শরফ কমপ্লেক্স, ১৪৯/এ, এয়ারপোর্ট রোড, ফার্মগেট, ঢাকা। ফোন ০১৭১১১১৫৮২৯। মসনবির গল্পভিত্তিক আলোচনা শুনতে ইউটিউবে ভিজিট করুন- CHAYAPATH PROKASHONI)