
শেখ আহমদ খেযরুবিয়া ছিলেন উঁচু দরজার আল্লাহর ওলি। তার উদার মন, দানশীলতা ও গরিব-দুঃখীর প্রতি দয়া ও দরদের খ্যাতি ছিল দেশজুড়ে। সমস্যাকবলিত অভাবী মানুষকে তিনি অকাতরে দান করতেন। ওদিকে নিজের প্রয়োজন মেটাতে বিত্তবানদের কাছ থেকে কর্জ নিতেন। কখনও মানুষের কাছ থেকে ধার নিয়ে তিনি অভাবী লোকদের সাহায্য করতেন। তিনি ছিলেন অনাথ-অভাবী মানুষের ঠিকানা। মওলানা রুমি শেখ খেযরুবিয়ার বদান্যতার কারণ বিশ্লেষণ করে বলছেনÑ
গোফত পয়গাম্বর কে দর বাযা’রহা
দো ফেরেশতে মী কুনাদ দা’য়েম নেদা
নবীজি বলেন, বাজারে দু’জন ফেরেশতা দাঁড়িয়ে
করে হরদম এই আহ্বান মুক্ত ঘোষণা দিয়ে।
কায় খোদা মুনফেকা’ন রা’ দেহ খলফ
ওয়েই খোদা মুমসেকা’ন রা’ দেহ তলফ
হে খোদা! দাও দানশীলদের প্রতিদান তাদের
দাও খোদা ধ্বংস পতন যত কৃপণদের।
হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী, দানশীলরাই আল্লাহর বন্ধু। আর কৃপণদের ধ্বংস ও অধঃপতন অনিবার্য। আল্লাহর রাহে দানের ফজিলতের মহিমা বর্ণনায় মওলানা আরও গভীরে গিয়ে বলেন, যারা মালের বদলায় আল্লাহর রাহে নিজের প্রাণ বিলায় তাদের মর্যাদার কথা চিন্তা করে দেখ। কোরআন মজিদে শহীদদের সম্পর্কে বলা হয়েছে : তাদের তোমরা মৃত বলো না; তারা জীবিত কিন্তু তোমরা তা বুঝতে পার না। (সুরা বাকারা : ১৫৯)। কারণ, তারা শুধু মাল নয়; হজরত ইসমাঈল (আ.) এর মতো নিজের জানটাই দিয়ে দিয়েছেন আল্লাহর রাহে, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। তাদের বস্তুগত প্রাণ নিয়ে আল্লাহ তাদের দিয়েছেন অপার্থিব প্রাণ।
যাহোক, আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের সাধনায় অসহায় মানুষের সেবায় এভাবেই কেটে যাচ্ছিল আহমদ খেযরুবিয়ার জীবনকাল। অসহায় মানুষের সাহায্য করতে গিয়ে তিনি ঋণ করেন আর আল্লাহ তায়ালাও কোনো না কোনোভাবে তার ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা করেন। এভাবে বছর বছর তার দেনার পরিমাণ জমে যায় অনেক দিনার। তবে আল্লাহর পক্ষ থেকে ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা হবে এ ব্যাপারে তার আস্থা ছিল অবিচল। এভাবে যখন তার জীবনকাল ঘনিয়ে এলো, বার্ধক্যের অচলায়তনে বেঁচে থাকার আশা ফুরিয়ে এলো, পাওনাদাররা চঞ্চল হয়ে উঠল। চারদিক থেকে তারা জড়ো হলো শেখের বাড়িতে। বলল, আপনার শেষ অবস্থা, আমাদের পাওনা পরিশোধ করুন। নচেৎ আপনার মৃত্যুর পর আমাদের হক গায়েব হয়ে যাবে। আমাদের পাওনা ফেরত পাওয়ার আশা নেই। শেখ তো কপর্দকশূন্য। তাই তাদের নানাভাবে সান্তনা দেওয়ার চেষ্টা করলেন। বললেন, ৪০০ দিনার তো বড় অঙ্ক নয়, আল্লাহ চাইলে ব্যবস্থা করে দিতে পারেন। আমি তো আল্লাহর বান্দাদের জন্যেই ব্যয় করেছি। তবে এ মুহূর্তে আমার কাছে টাকা নেই, যা দিয়ে আপনাদের ঋণ পরিশোধ করতে পারি। কিন্তু পাওনাদাররা ছিল নাছোড়বান্দা।
হঠাৎ বাইরে থেকে এক কিশোরের আওয়াজ ভেসে এলো, হালুয়া নেবেন! হালুয়া। হালুয়া-মিষ্টান্নের প্রতি লোভ মানুষের সহজাত। শেখ ভাবেন, আল্লাহর রহমতের দুয়ার যেন খুলছে না। এতগুলো মানুষের পাওনা মাথায় নিয়ে আমি কীভাবে চলে যাব। পাওনাদার মেহমানদের আপ্যায়নের ব্যবস্থাও তো ঘরে নেই। কী চিন্তা করে খাদেমকে ডেকে বললেন, ওই যে হালুয়া বিক্রেতা কিশোর, তার কাছ থেকে হালুয়াগুলো কিনে নাও। মেহমানদের আপ্যায়নের ব্যবস্থা কর। দামদর ঠিক হলো, আধা দিনারে সব হালুয়া কিনে মেহমানদের পরিবেশন করা হলো। কিশোর বলল, এবার আমার টাকা দিয়ে দেন। শেখের ইশারায় খাদেম বলল, তোমার টাকাটা পরে নিও। একথা শুনেই কিশোর কান্না জুড়ে দিল। খাদেম বলল, আমাদের তো এ মুহূর্তে টাকা নেই। তোমার টাকা অবশ্যই পরিশোধ করব। এত লোক দেখছ না, ওনারাও পাওনা চাইতে এসে বসে আছেন এভাবে। একথা শুনেই কিশোর কান্নায় ফেটে পড়ল। চিৎকার, তোলপাড়, চারদিকে হৈচৈ। শেখের কাছে গিয়ে বলল, আপনি জানেন, আমার উস্তাদ আছে। টাকা ছাড়া গেলে আমাকে মারধর করবে, মেরে ফেলবে। হায়, আমার কি কপাল, হাম্মামের দিকে না গিয়ে কেন এদিকে এলাম হালুয়া নিয়ে?
সুফিয়া’নে তাবলে খা’রে লোকমে জু
সগ দিলা’ন ও হামচো গোরবে রুয় শো
সুফিরা মোফতখোর, পেটপূজারি খাদ্যলোভী ভবঘুরে
হিংস্র কুকুর, বিড়ালের মতো চেটে লেপাপা দোরোস্ত তবে।
আয গরিবে কুদাক আ’ঞ্জা খাইরো শর
গেরদ আ’মদ গশত বর কুদক হাশর
কিশোরের কান্নায় সেথা কেয়ামতকা- তোলপাড়
চারদিকে শোরগোল কিশোরের ক্রন্দন যারযার।
অবস্থা দেখে পাওনাদাররা আরও চটে গেল। বলে, আমাদের টাকা নিয়ে দিতে পারেন না, আবার আপ্যায়নের নামে কেন তামাশা দেখালেন। আমাদেরই তো অপমান করলেন। এত লোকের প্রতি তো জুলুম করেছেন। আখেরাতের জন্যও জুলুমের দায় নিয়ে যেতে চান কবরে?
এত কথা সমালোচনায় শেখ কিন্তু সম্পূর্ণ নির্বিকার। আল্লাহর সাহায্য আসবে এ ব্যাপারে তিনি অবিচল। দীর্ঘ জীবনে তিনি বহুবার এমন পরীক্ষা দিয়েছেন, লাভ করেছেন আল্লাহর সাহায্য ও অনুগ্রহ অপার। আল্লাহর ওপর যার অবিচল আস্থা, আল্লাহর প্রতি যে সর্বাবস্থায় রাজি, সত্য ও ন্যায়ের পথ ধরেই যে চলছে তো চলছে, মানুষের সমালোচনা ও নিন্দায় তার কিসের পরোয়া।
আ’নকে জা’ন বুসা দাহাদ বর চশমে উ
কেই খোরদ গম আয ফলক ওয়ায খশম উ
প্রাণের প্রাণ যার নয়নে চুমো দেয় এঁকে
পরোয়া করে না দুর্বিপাকে কারও রক্তচোখে।
দর শবে মাহতা’ব মাহ রা’ দর সেমা’ক
আয সগা’নো ওয়াউ ওয়াউয়ে ঈশা’ন ছে বা’ক
পূর্ণিমা রাতে চাঁদ ভাসে আকাশের নীলিমায়
কুকুরের ঘেউ ঘেউ, চাঁদনির কিসের ভয় তায়।
মওলানা রুমি বলেন, এমন পরিস্থিতিতে উপস্থিত সবাই মিলে কিশোরের পাওনা টাকা পরিশোধ করে দিতে পারত। তাতে কিশোরকে শান্ত করে বিদায় করতে পারত। কিন্তু শেখ আধ্যাত্মিক শক্তি বলে তাদের মনের ওপর প্রভাব বিস্তার করলেন। তাদের বদান্যতা দেখানোর পথে বাধা দিলেন। ফলে কেউ কিশোরের পাওনা টাকা নিজের পকেট থেকে দিল না। মওলানা আরও বলেন, এই যে উপস্থিত সবার মনের ওপর এমন প্রভাব বিস্তার করাÑ এটি কোনো ব্যাপার নয়; যারা আল্লাহওয়ালা, পীর ও দরবেশ তাদের শক্তি এর চেয়ে আরও অনেক বেশি। যাহোক, পরিস্থিতি এভাবেই চলতে থাকল।
দুপুর গড়িয়ে আসর এলো। আসরের নামাজ শেষে এক খাদেম এসে একটি পোটলা শেখের সামনে রেখে বলল, অমুক বিত্তশালী দরবারের এ কাহিনি শুনে এই হাদিয়াটুকু পাঠিয়েছেন হুজুরের হাতে দেওয়ার জন্য। পোটলায় ছিল ৪০০ দিনার আর একটি কাগজে মুড়িয়ে দিনারের এক আধুলি। শেখ তখনই সবার পাওনা পরিশোধ করে দিলেন। এ দৃশ্য দেখে সবাই তো হতবাক।
আ’হ ও আফগা’ন আয হামে বরখা’স্ত যুদ
কাই সরে শেখা’ন ও শাহা’ন ইন চে বুদ
তখনই হাহুতাশ ওঠে কান্নারোল অন্যরকম
শেখ শিরোমণি, শাহানশাহ! এর হেকমত বলুন ।
আমাদের মাফ করুন। না বুঝে অনেক কথা বলেছি আপনার শানে। আমরা তো নিজেদের জ্ঞানে ও অনুমানে অনেক মন্তব্য করেছি। রাতের আঁধারে অন্ধের লাঠি ঘুরানোর মতো অনেক আলোর প্রদীপ ভেঙেছি। আমরা মুসা (আ.) ও খিজির (আ.) এর ঘটনা থেকে শিক্ষা নেইনি; অথচ এই ঘটনা পবিত্র কোরআনে বর্ণিত। (সুরা কাহফ : ৬০-৮২)। আল্লাহর নবী মুসা (আ.) এর দৃষ্টিশক্তি এমন প্রখর ছিল, তিনি যদি আকাশের পানে তাকাতেন আকাশের ওপারে ঊর্ধ্বলোকে কী আছে তা দীপ্তিমান অবলোকন করতেন। এরপরও খিজির (আ.) এর কাজের রহস্য তিনি বুঝতে অক্ষম ছিলেন। আমাদের অবস্থাও আজ তা-ই।
শেখ উপস্থিত লোকদের উদ্দেশে বললেন, তোমরা আমার ব্যাপারে যত কথা বলেছ, যত বিরূপ আচরণ করেছ, তা আমি মাফ করে দিলাম। এক্ষণে এই ঘটনার পেছনে কী রহস্য ছিল তা তোমাদের খুলে বলছি শুনো। আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলাম, এই পরিস্থিতিতে কী করতে পারি, আমাকে পথ বাতলে দাও। তিনি দয়া করে সঠিক পথটি আমাকে বাতলে দিয়েছেন। সে অনুযায়ী আমি কাজ করেছি। আসল ব্যাপার হলো,
গোফত আ’ন দিনার আগরছে আন্দক আস্ত
লে কে মওকুফে গারিবে কুদাক আস্ত
বলেন, যদিও সেই দিনার অতি নগণ্য ক্ষুদ্র
কিন্তু তা কিশোরের বিলাপের ঋণে আব
হালুয়ার মূল্য আধা দিনার যদিও অতি নগণ্য ছিল; কিন্তু কিশোরের বুকফাটা কান্নার বদৌলতে এসেছে এই অর্থ। কাজেই মানের দিক থেকে তা অমূল্য।
তা’ নগিরয়াদ কুদাকে হালওয়া ফুরুশ
বাহরে রাহমত দর নেমি আয়াদ বে জুশ
হালুয়া বিক্রেতা কিশোর যতক্ষণ কাঁদেনি বুক ফেটে
আসেনি জোয়ার ঢেউ তরঙ্গ রহমতের দরিয়ার বুকে।
মওলানা বলেন, শেখ আহমদ খেজরুবিয়ার কাছে হালুয়া বিক্রেতা যে কিশোরের গল্প শুনলেন আপনার আমার সবার কাছেই আছে সেই কিশোর।
আয় বেরাদর তিফল তিফলে চশমে তোস্ত
কাম খোদ মওকুফে যারি দা’ন দুরোস্ত
হে ভাই! সে কিশোর তো তোমার চোখের পুতুল
অশ্রু ঝরাও তবেই মিলবে মনস্কাম জানো নির্ভুল।
গর হামি খা’হি কে আ’ন খেলআত রসদ
পস বে গিরয়া’ন তিফলে দিদে বর জসদ
যদি চাও সেই উত্তরীয় আসুক তোমার ভাগ্য খুলে
বুক ভেসে দাও চোখের পুতুল জাগুক কান্নারোলে।
মসনবির কবিতার এই আহ্বান মওলানা রুমির নিজস্ব নয়, তিনি হাদিসের বাণীরই ভাষ্যকার। হাদিসের বাণী ও আবেদনকেই আরও প্রাণবন্ত করেছেন কবিতার আঙ্গিকে সাজিয়ে। হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, একবার হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের উদ্দেশে এমন ভাষণ দিলেন যে রকম ভাষণ এর আগে আমরা কখনও শুনিনি। ভাষণে তিনি বললেন, আমি যা জানি তোমরা যদি তা জানতে তাহলে তোমরা খুব কম পরিমাণে হাসতে এবং বেশি বেশি ক্রন্দন করতে। এরপর পরিস্থিতি এমন হলো যে, রাসুলুল্লাহ (সা.) এর সাহাবিরা তাদের চেহারা ঢেকে ফেললেন, তখন তারা অঝোরে কাঁদছিলেন। (বোখারি ও মুসলিম)।
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দন করেছে সে কখনও দোজখে প্রবেশ করবে না, যতক্ষণ না দুধ বের হওয়ার পর স্তনে ফিরে না যায়। (অর্থাৎ দোহন করা দুধ যেমন স্তনে ফিরে যাওয়া অসম্ভব, তদ্রুপ আল্লাহর ভয়ে কেঁদেছে এমন লোকের দোজখে যাওয়াও অসম্ভব)। আর আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের ময়দানে উত্থিত ধুলোবালি এবং জাহান্নামের ধোঁয়া একত্রিত হবে না। (অর্থাৎ যুদ্ধের ময়দানে যাদের পদাঘাতে ধূলি উড়েছে, তারা দোজখে প্রবেশ করবে না।) (তিরমিজি)
(সূত্র : মসনবি শরিফ : ২/৩৭৬-৪৪৪)