
ঈশ্বরদী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে প্রধান ফটক তালাবদ্ধ করে পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধির প্রতিবাদে প্রধান ফটকের সামনে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে কর্মরত শ্রমিকরা। এতে ঈশ্বরদী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
শনিবার (৯ মে) সকাল সাড়ে ৭টা থেকে সাড়ে ৯টা পর্যন্ত প্রায় দুই হাজার মহিলা ও পুরুষ শ্রমিক-কর্মচারী একযোগে কারখানা থেকে বেরিয়ে রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের প্রধান ফটকের সামনে বর্ধিত পরিবহন ভাড়া দ্রুত প্রত্যাহারের দাবিতে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। এতে কয়েক ঘণ্টার জন্য ভেতরে প্রবেশ ও বের হওয়ার কার্যক্রম ব্যাহত হয়। এ সময় ফটকের বাইরে কয়েক হাজার শ্রমিক অবস্থান নেন।
বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারী শ্রমিকরা জানান, আমাদের সঙ্গে কোনো প্রকার আলোচনা ছাড়াই পরিবহন ভাড়া ৫০০ টাকা করে বৃদ্ধি করা হয়েছে। অথচ আমাদের বেতন বৃদ্ধি করা হয়নি। অল্প বেতনে অনেক ঘণ্টা কাজ করতে হয়। আবার সেখান থেকেই যাতায়াতের ভাড়া দিতে হয়। দ্রুত বর্ধিত ভাড়া প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। আমাদের বেতন-বোনাস বাড়াতে হবে। না হলে বৃহৎ আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। এ সময় শ্রমিকরা প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে স্লোগান দেন।
আন্দোলনের খবর পেয়ে রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও শ্রমিক প্রতিনিধিরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করেন। পরে শ্রমিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে কর্তৃপক্ষের আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনায় শ্রমিকদের দাবিগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়।
ঈশ্বরদী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের নির্বাহী পরিচালক এবিএম শহিদুল ইসলাম বলেন, “শ্রমিকদের কিছু দাবি এবং ভাড়া বৃদ্ধির বিষয় নিয়ে সাময়িক অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। আমরা শ্রমিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করেছি। তাদের দাবিগুলো গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হচ্ছে। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে এবং উৎপাদন কার্যক্রমও স্বাভাবিকভাবে চলছে।”
কর্তৃপক্ষের আশ্বাসের পর শ্রমিকরা প্রধান ফটকের তালা খুলে দেন। এরপর পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসে। আন্দোলনের সময় বাইরে কয়েক হাজার শ্রমিক অবস্থান করলেও এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।
ঈশ্বরদী থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আসাদুর রহমান জানান, শ্রমিকদের পরিবহন ভাড়া নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে। এজন্য তারা বিক্ষোভ মিছিল করে। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।
উল্লেখ্য, পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার পাকশীর রেলওয়ের অব্যবহৃত জমিতে ২০০১ সালে ঈশ্বরদী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের যাত্রা শুরু হয়। ২০১৩ সালে রানা প্লাজা ধসের পর শিল্পে নিরাপত্তা ও পরিবেশ সচেতনতা বাড়ে। তখন থেকেই উদ্যোক্তারা নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব শিল্প গড়ে তুলতে ব্যাপক বিনিয়োগ শুরু করেন।
এখানে অবস্থিত ভিনটেজ ডেনিম স্টুডিও নামের একটি কারখানা নিজস্ব বর্জ্য শোধনাগারের মাধ্যমে বর্জ্য শোধন করে এবং পানি শোধনাগারের মাধ্যমে পানি পরিশোধন করে তা বাগানে ব্যবহার করে। কারখানার অভ্যন্তরে রয়েছে সবুজের সমারোহ, যা শ্রমিকদের জন্য সুন্দর কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করে।
দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কর্মসংস্থানের অন্যতম কেন্দ্র এখন ঈশ্বরদী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল। এখানে প্রায় ২১ হাজারের বেশি দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিক-কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন, যাদের ৭০ শতাংশই নারী শ্রমিক।
শ্রমিকদের অধিকাংশই স্থানীয় ও আশপাশের গ্রামের বাসিন্দা। অনেক নারী শ্রমিকের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটেছে। কেউ বাড়ি তৈরি করেছেন, কেউ সন্তানদের লেখাপড়া করাচ্ছেন।
গোপালপুর গ্রামের শ্রমিক হাসি খাতুন বলেন, এখানে কাজের পরিবেশ, বেতন-ভাতা ও নিরাপত্তা ভালো। ঢাকা শহরে কাজ করতে পরিবার অনুমতি দিতে চায় না, কিন্তু এখানে সুযোগ তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, এখানে কাজ করে তিনি সংসার চালাচ্ছেন এবং সন্তানের পড়াশোনা ও পরিবারের খরচ বহন করতে পারছেন।
এখানে শুধু পোশাক শিল্প নয়, ব্যাটারি, শিল্পে ব্যবহৃত দস্তানা, তাঁবু ও ক্যাম্পিং সামগ্রীসহ বহুমুখী পণ্য উৎপাদন হচ্ছে।