
গাজীপুরের কাপাসিয়ার সদর ইউনিয়নের রাউৎকোনা গ্রামে স্ত্রী, তিন মেয়ে ও তার শ্যালকসহ পাঁচজনকে গলা কেটে হত্যা করে স্বজনদের ফোনে লাশ নিয়ে যেতে আহ্বান জানায় এক পাষণ্ড যুবক। এ ঘটনার পর ঘাতক মো. ফোরকান (৪০) পলাতক রয়েছে। গত শুক্রবার দিবাগত রাতে রাউৎকোনা পূর্বপাড়া গ্রামের প্রবাসী মনির হোসেনের বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে। ওই ভাড়াটিয়া মো. ফোরকান গোপালগঞ্জ জেলার সদর থানার মেরী গোপীনাথপুর গ্রামের আতিয়ার রহমান মোল্লার ছেলে।
নিহতরা হলেন ফোরকান মিয়ার স্ত্রী শারমিন খানম (৩৫), তিন মেয়ে মীম খানম (১৪), উম্মে হাবিবা (৮), ফারিয়া (২) এবং ফোরকান মিয়ার শ্যালক রসুল মিয়া (২২)।
আজ শনিবার দুপুরে কাপাসিয়া থানা পুলিশ নিহতদের লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য গাজীপুর মর্গে পাঠিয়েছে।
নিহত শারমিনের চাচা মো. উজ্জ্বল মোল্লা জানান, প্রায় ষোল বছর আগে পারিবারিকভাবে বেকার যুবক মো. ফোরকানের সঙ্গে শারমিনের বিয়ে হয়। পরে ফোরকান গাড়ি চালানো শিখে নিজের সঞ্চিত কিছু টাকা, শ্বশুরবাড়ি ও স্বজনদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা ধার করে একটি ব্যক্তিগত গাড়ি কিনে রাজধানীর উত্তরা এলাকায় শারমিনকে নিয়ে বসবাস করতে থাকে।
তাদের সংসারে পরপর তিনটি কন্যাসন্তান জন্ম নিলে ফোরকান আবার বিয়ের পাঁয়তারা শুরু করে এবং শারমিনের ওপর শারীরিক নির্যাতন করতে থাকে। উত্তরার বাসায় একটানা বেশ কিছু দিন আটক রেখে নির্যাতনের ফলে মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়লে প্রায় সাত মাস আগে শারমিন গোপালগঞ্জে পিতার বাড়িতে চলে যান।
সেখানে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হওয়ার কিছুদিন পর ফোরকান সবার কাছে ক্ষমা চেয়ে শারমিনকে নিয়ে কাপাসিয়ার রাউৎকোনা গ্রামে মনির হোসেনের বাড়িতে ভাড়াটিয়া হিসেবে বসবাস করতে থাকে।
ওই বাড়ির আশপাশের লোকজন জানায়, প্রায় ছয় মাস আগে থেকে ফোরকান মিয়া রাউৎকোনা গ্রামের প্রবাসী মনির হোসেনের বাড়িতে ভাড়াটিয়া হিসেবে বসবাস করতে থাকে। এখানে আসার পর থেকে ফোরকান ও শারমিনের মধ্যে পারিবারিক কলহের জেরে প্রায়ই মারামারির ঘটনা ঘটত। ফোরকান মাদকাসক্ত ও মাদক কারবারি বলেও অনেকে অভিযোগ করেন।
রাত একটার দিকে ফোরকান নিজেই তার ছোট ভাই মিশকাতকে ফোনে স্ত্রী-সন্তানদের হত্যা করার বিষয়টি জানিয়ে স্বজনদের লাশ নিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানায়। গভীর রাতে শারমিনের স্বজনরা ফোনে এই হত্যাকাণ্ডের খবর পান। পরে শনিবার খুব ভোরে তারা ওই বাড়িতে এসে দরজা হালকা খোলা পেয়ে ঘরে গিয়ে সবার লাশ দেখতে পান। এ সময় তারা ৯৯৯-এ ফোন করে বিষয়টি জানান এবং কাপাসিয়া থানায় খবর দিলে পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে।
কাপাসিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহীনুর আলম জানান, নিহত পাঁচজনের লাশের পাশে গোপালগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বরাবরে লিখিত স্বাক্ষর ও তারিখবিহীন একটি অভিযোগপত্র পাওয়া গেছে। এতে মো. ফোরকান তার স্ত্রী, শ্বশুর-শাশুড়িসহ ১১ জনের নাম উল্লেখ করে আরও ৪-৫ জন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ করেন। লিখিত অভিযোগে তিনি দাবি করেন, তার শ্বশুর তার উপার্জনের ১০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়ে স্থানীয় এলাকায় জমি কিনেছেন। তিনি এখন সেই টাকা পরিশোধ করছেন না।
এ ছাড়া শারমিন বেশ কিছু দিন যাবৎ তার আপন খালাতো ভাই গোপালগঞ্জের মকসুদপুর এলাকার রাজু মিয়ার সঙ্গে গভীর পরকীয়ায় আসক্ত বলে অভিযোগ করেন ফোরকান। রাজু ছাড়াও একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে শারমিন পরকীয়া ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত বলেও ওই অভিযোগে দাবি করা হয়। বিষয়টি তিনি তার মেঝে মেয়ে উম্মে হাবিবার কাছ থেকে জানতে পেরে শারমিনকে জিজ্ঞেস করলে গত ৩ মে শারমিন ও তার স্বজনরা একটি কক্ষে হাত-পা বেঁধে তাকে মারাত্মক শারীরিক নির্যাতন করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
এ ঘটনার পর তারা তাকে আরও ভয়ভীতি দেখাচ্ছে এবং মারপিটের হুমকি দিচ্ছে বলেও জানানো হয়। ওই ঘটনায় তার বড় মেয়ে মীম খানম এবং উম্মে হাবিবা প্রত্যক্ষ সাক্ষী বলেও দাবি করা হয়। তাই এসব ঘটনায় তিনি আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।
এই অভিযোগের কপি ও তার স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে শারমিন ও ফোরকান দম্পতির পারিবারিক কলহের কারণেই এই জঘন্য হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে ধারণা করছে পুলিশ।