
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার জন্য আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ নিয়েছেন ১ হাজার ৩৩৬ জন বাংলাদেশি বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদ। তবে প্রকল্পটিতে বর্তমানে প্রায় ৫ হাজার বিদেশি বিশেষজ্ঞ ও দক্ষ শ্রমিক কর্মরত রয়েছেন বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের ২৪তম কার্যদিবসে জামালপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. মোস্তাফিজুর রহমান বাবুলের লিখিত প্রশ্নের জবাবে তিনি এ তথ্য জানান।
মন্ত্রী বলেন, রাশিয়ান ঠিকাদারের ব্যবস্থাপনায় রাশিয়ান ফেডারেশন এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে বাংলাদেশি বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে প্রকল্পের আওতায় ফুল-স্কেল সিমুলেটরসহ আধুনিক প্রযুক্তি সমৃদ্ধ একটি পূর্ণাঙ্গ প্রশিক্ষণ কেন্দ্রও স্থাপন করা হয়েছে।
তিনি জানান, রাশিয়ায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বাংলাদেশি প্রশিক্ষকেরা বর্তমানে রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের কমন প্ল্যান্টের জনবলকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। এসব কর্মী ভবিষ্যতে কেন্দ্রটির পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করবেন।
ফকির মাহবুব আনাম বলেন, ধীরে ধীরে বিদেশি বিশেষজ্ঞদের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনার লক্ষ্যেই দক্ষ দেশীয় জনবল গড়ে তোলা হচ্ছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ চালু করা হয়েছে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনও টেকনিক্যাল সাপোর্টিং অর্গানাইজেশন (টিএসও) হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
এর আগে জাতীয় সংসদে দেওয়া আরেক বক্তব্যে মন্ত্রী জানান, চলতি বছরের আগস্টের শেষ দিকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে প্রথম ইউনিট থেকে ১ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
অন্যদিকে, নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (এনপিসিবিএল)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মো. জাহেদুল হাসান জানিয়েছেন, কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট ২০২৭ সালের শুরুতে এবং দ্বিতীয় ইউনিট ২০২৮ সালের শুরুতে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
নিরাপত্তা ও পরিচালনায় বহুস্তরীয় তদারকি
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তা, কমিশনিং ও পরিচালনাগত প্রস্তুতি নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে ড. জাহেদুল হাসান বলেন, একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কোনো একক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত হয় না। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক, কারিগরি ও নিরাপত্তা সংস্থার তদারকিতে এর প্রতিটি ধাপ সম্পন্ন হয়।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন (বিএইসি) প্রকল্পের মালিক হিসেবে নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন ও স্থাপনা গ্রহণের দায়িত্বে রয়েছে। আর নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (এনপিসিবিএল) অপারেটিং অর্গানাইজেশন হিসেবে কমিশনিং, পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও ভবিষ্যৎ ডিকমিশনিংয়ের দায়িত্ব পালন করবে।
এছাড়া বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বিএইআরএ) স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে প্রকল্পের বিভিন্ন ধাপ মূল্যায়ন ও লাইসেন্স প্রদান করছে। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান ভিও সেফটি কমিশনিং কার্যক্রমের কারিগরি মূল্যায়ন করছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) বিভিন্ন পিয়ার রিভিউ ও কারিগরি মূল্যায়নের মাধ্যমে প্রকল্পের নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ করছে।
সক্ষমতা নিয়ে সমালোচনার জবাব
এনপিসিবিএলের সক্ষমতা নিয়ে সমালোচনার বিষয়ে ড. জাহেদুল হাসান বলেন, গত এক দশকে শত শত প্রকৌশলী, অপারেটর, রিঅ্যাক্টর বিশেষজ্ঞ, রসায়নবিদ ও বিকিরণ সুরক্ষা কর্মকর্তাকে দেশ-বিদেশে দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তারা আন্তর্জাতিক মানের সিমুলেটর ও অন-দ্য-জব প্রশিক্ষণ সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন।
তিনি বলেন, প্রতিটি অপারেটরকে বিএইআরএর কঠোর লাইসেন্সিং ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া অতিক্রম করতে হয়। পাশাপাশি রাশিয়ার কনসার্ন রোসএনারগোঅ্যাটমের বিশেষজ্ঞরা কমিশনিং পর্যায়ে বাংলাদেশি কর্মীদের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছেন।
স্পেন্ট ফুয়েল ব্যবস্থাপনা নিয়ে ব্যাখ্যা
ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি বা স্পেন্ট ফুয়েল ব্যবস্থাপনা নিয়ে নানা আলোচনার বিষয়ে ড. জাহেদুল হাসান বলেন, এ বিষয়ে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে প্রয়োজনীয় চুক্তি ইতোমধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছে।
তার মতে, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবহৃত জ্বালানি রিঅ্যাক্টর থেকে অপসারণের পর তাৎক্ষণিকভাবে অন্য দেশে পাঠানো হয় না। প্রথমে কেন্দ্রের নিজস্ব স্পেন্ট ফুয়েল পুলে নির্দিষ্ট সময় নিরাপদে সংরক্ষণ ও শীতলীকরণ করা হয়। পরবর্তী সময়ে বিদ্যমান আন্তঃরাষ্ট্রীয় চুক্তি ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
উল্লেখ্য, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে রাশিয়ার ভিভিইআর-১২০০ মডেলের দুটি তৃতীয় প্রজন্মের রিঅ্যাক্টর স্থাপন করা হচ্ছে। প্রতিটি ইউনিটের উৎপাদন ক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। দুটি ইউনিট চালু হলে কেন্দ্রটির মোট উৎপাদন ক্ষমতা দাঁড়াবে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট।