ঢাকা সোমবার, ০৩ আগস্ট ২০২৬, ১৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

উখিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সেবার মানোন্নয়ন, স্বস্তিতে স্থানীয়রা

উখিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সেবার মানোন্নয়ন, স্বস্তিতে স্থানীয়রা

কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাসেবায় আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. এহেচান উল্লাহ সিকদার যোগদানের পর চিকিৎসাসেবায় এমন পরিবর্তন ঘটেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সেবাপ্রার্থীরা। যার ফলে স্থানীয়দের মাঝে স্বস্তি বিরাজ করছে। একই সঙ্গে আলোচিত উখিয়ার শরণার্থী শিবিরের ক্যাম্পের লোকজনও সহজেই সেবা পাচ্ছে।

উখিয়া স্বাস্থ্য কেন্দ্রের আন্তরিক প্রচেষ্টায় মরণঘাতী মারাত্মক ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত রোহিঙ্গা যুবক মোক্তার আহমদ ফিরে পেয়েছে নতুন জীবন।

স্থানীয় বাসিন্দা আয়েশা বেগম জানিয়েছেন, উখিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আগের চেয়ে সেবার মান অনেক উন্নত হয়েছে। তিনি বলেন, সেবার মানের পাশাপাশি হাসপাতালের পরিবেশ ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতায় ব্যাপক উন্নতি ঘটেছে।

সূত্র মতে, আলোচিত উখিয়ার শরণার্থী শিবিরের ৪ নম্বর ক্যাম্পের সি-৪ ব্লকের ২৩ বছরের রোহিঙ্গা যুবক মোক্তার আহমদ মিয়ানমারের জান্তা বাহিনীর হাতে ৬ মাস বন্দি থাকার পর গত ২৪ জুন আশ্রয়শিবিরে ফিরে আসেন। দীর্ঘ প্রায় ৬ মাস বন্দি থাকার পর আশ্রয়শিবিরে ফিরে দুই দিনের মাথায় ক্যাম্প-২০ এক্সটেনশনে এক আত্মীয়ের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। আর সেই যাওয়াটাই তার জন্য কাল হয়ে আসে। ওখান থেকে ফিরে তিনি প্রচণ্ড জ্বর ও দুর্বলতায় পড়ে যান। অবস্থার দ্রুত অবনতি হলে তাকে দ্রুত নেওয়া হয় আশ্রয়শিবিরে স্থাপিত ফ্রেন্ডশিপ স্বাস্থ্য কেন্দ্রে (হাসপাতাল)। সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে ধরা পড়ে তিনি মরণঘাতী মারাত্মক ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত।

মারাত্মক ম্যালেরিয়া শনাক্তের পর ফ্রেন্ডশিপ স্বাস্থ্য কেন্দ্রের স্বাস্থ্যকর্মীরা দ্রুত ব্র্যাক ম্যালেরিয়া টিমকে জানান। তারা একটি র‌্যাপিড ডায়াগনস্টিক টেস্ট (আরডিটি) করেন, যাতে নিশ্চিত হওয়া যায় রোহিঙ্গা যুবক মোক্তার আহমদ প্লাজমোডিয়াম ফ্যালসিপেরাম ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত।

তার শারীরিক অবস্থা এবং গুরুতর জটিলতার ঝুঁকি বিবেচনা করে জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচির (এনএমইপি) চিকিৎসা নির্দেশিকা অনুযায়ী রোগীকে অবিলম্বে উখিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে (ইউএইচসি) পাঠানো হয়। হাসপাতালের মেডিকেল টিমের তত্ত্বাবধানে রোগীকে ইনজেকশনযোগ্য আর্টেসুনেট, শিরায় তরল, নিবিড় পর্যবেক্ষণ এবং অন্যান্য সহায়ক চিকিৎসা দেওয়া হয়।

ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল, ব্র্যাক ম্যালেরিয়া টিম ও উখিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রের অবিশ্বাস্য দ্রুত চিকিৎসায় মোক্তারের শারীরিক অবস্থার ক্রমাগত উন্নতি হতে থাকে। তার জ্বর কমে আসে, শারীরিক শক্তি ধীরে ধীরে ফিরে আসতে শুরু করে এবং নিয়মিত ক্লিনিক্যাল মূল্যায়নে চিকিৎসায় ইতিবাচক সাড়া মেলে।

নির্ধারিত চিকিৎসা পদ্ধতি সফলভাবে শেষ করার পর মোক্তারকে ১ জুলাই স্থিতিশীল অবস্থায় হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়। যেন মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসেন রোহিঙ্গা যুবক মোক্তার আহমদ।

উখিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্র সূত্র বলছে, মোক্তার এখন সম্পূর্ণ সুস্থ। তিনি পরিবারের সঙ্গে স্বাভাবিক দৈনন্দিন কাজকর্ম আবারও শুরু করেছেন।

তারা দাবি করছে, রোহিঙ্গা যুবকের এই প্রাণ ফিরে পাওয়া মূলত প্রাথমিক রোগ নির্ণয়, দ্রুত রেফারেল, মানবিক স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় এবং মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার কারণেই সম্ভব হয়েছে।

এই ঘটনাটি দেখায়, কীভাবে সময়োপযোগী হস্তক্ষেপ এবং জাতীয় চিকিৎসা প্রোটোকল মেনে চলা জীবন বাঁচাতে পারে এবং ঝুঁকিপূর্ণ শরণার্থী জনগোষ্ঠীর মধ্যে গুরুতর ম্যালেরিয়ার বোঝা কমাতে অবদান রাখতে পারে।

যেভাবে সমন্বয় হলো ম্যালেরিয়া চিকিৎসাসেবায়

কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরগুলোতে ম্যালেরিয়া রোগী ব্যবস্থাপনা জোরদার করতে এবং রেফারেল ব্যবস্থার উন্নতি সাধনে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) কারিগরি সহায়তায় চলতি বছরের ১২ থেকে ১৪ মে কক্সবাজারে তিন দিনের ‘ম্যালেরিয়া রোগী ব্যবস্থাপনা ও নজরদারি ব্যবস্থা কর্মশালা’ আয়োজন করেছিল।

রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরগুলোর বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে ৯০ জন চিকিৎসক এই কর্মশালায় অংশগ্রহণ করেছিলেন। কক্সবাজারের সিভিল সার্জন এবং উখিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচঅ্যান্ডএফপিও) এই অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন।

সূত্র বলছে, ওই কর্মশালাতেই অংশগ্রহণকারীদের দ্রুত রোগ নির্ণয় ও তাৎক্ষণিক চিকিৎসা (ইডিপিটি) কৌশল, জাতীয় ম্যালেরিয়া চিকিৎসা নির্দেশিকা এবং গুরুতর ম্যালেরিয়া রোগীদের জন্য প্রতিষ্ঠিত রেফারেল পদ্ধতি সম্পর্কে জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

অংশগ্রহণকারী সকল চিকিৎসককে ম্যালেরিয়াজনিত অসুস্থতা ও মৃত্যুহার কমাতে দ্রুত শনাক্তকরণ, তাৎক্ষণিক রেফারেল এবং সমন্বিত রোগী ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব সম্পর্কে জানানো হয়।

আয়োজকরা মনে করছেন, এই উদ্যোগের আগে রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরগুলোতে শনাক্ত হওয়া সকল গুরুতর ম্যালেরিয়া রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য নিয়মিতভাবে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে পাঠানো হতো। সময়মতো চিকিৎসার সুযোগ উন্নত করতে এবং বিলম্ব কমাতে গুরুতর ম্যালেরিয়া রোগী ব্যবস্থাপনায় উখিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের (ইউএইচসি) সক্ষমতা জোরদার করার লক্ষ্য নিয়েই ব্র্যাক পরবর্তীতে ২০২৬ সালের মে মাসে উখিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. এহেচান উল্লাহ সিকদার এবং হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা দলের সঙ্গে একটি সমন্বয় সভার আয়োজন করেছিল।

বৈঠকের পর জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচির (এনএমইপি) নির্দেশিকা অনুযায়ী উখিয়া ইউএইচসিতে গুরুতর ম্যালেরিয়া রোগীদের ভর্তি ও ব্যবস্থাপনার জন্য হাসপাতালের ক্লিনিক্যাল টিমকে নির্দেশনা দেন ডা. এহেচান উল্লাহ সিকদার।

উখিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. এহেচান উল্লাহ সিকদার জানিয়েছেন, ক্যাম্প স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো থেকে রোগী শনাক্তকরণ, গ্রহণকারী হাসপাতালের সঙ্গে যোগাযোগ, পরিবহন সহায়তা এবং রেফারেলের ফলোআপসহ রেফারেল প্রক্রিয়াটি ব্র্যাক সমন্বয় করবে। ম্যালেরিয়া চিকিৎসায় সম্পৃক্ত সব পক্ষই এ বিষয়ে একমত হয়েছে।

জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচির কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের সার্ভিল্যান্স মেডিকেল অফিসার ডা. মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয়, দ্রুত রেফারেল এবং জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচির গাইডলাইন অনুসরণের মাধ্যমে মুমূর্ষু ম্যালেরিয়া রোগীর জীবন বাঁচানো সম্ভব—এই সাফল্য তারই প্রমাণ।

তিনি বলেন, উখিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মারাত্মক ম্যালেরিয়া চিকিৎসার সুব্যবস্থা করে রোগীটির জীবন রক্ষায় অসামান্য অবদানের জন্য জাতীয় কর্মসূচির পক্ষ থেকে আমি উখিয়ার ইউএইচএন্ডএফপিও ডা. এহেচান উল্লাহ সিকদারের প্রতি বিশেষ ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।

স্বস্তিতে স্থানীয়রা,মানোন্নয়ন,স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স,উখিয়া
আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত