
চট্টগ্রামে গ্যাস সংকট ক্রমেই নগরবাসীর ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নগরজুড়ে চলমান গ্যাস সংকট এখনও কাটেনি। এর প্রভাবে চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন এলাকায় সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও গণপরিবহনের সংকট দেখা দিয়েছে।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় অনেক যানবাহন সড়কে নামতে পারছে না। এর প্রভাব পড়েছে সাধারণ যাত্রীদের ওপর। এ সংকটকে পুঁজি করে অনেক চালকের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগও উঠেছে। বন্ধ রাখা হয়েছে অনেক সিএনজি ফিলিং স্টেশন।
সোমবার (৩ আগস্ট) নগরের অক্সিজেন, বহদ্দারহাট, কর্ণফুলী, আগ্রাবাদ, হালিশহর, বাকলিয়া, মইজ্জার টেক, চান্দগাঁও, পতেঙ্গাসহ বিভিন্ন এলাকার সিএনজি ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ পাম্পে যানবাহনের দীর্ঘ সারি। অনেক চালককে গভীর রাত থেকে পরদিন সকাল, এমনকি দুপুর পর্যন্ত গ্যাসের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে। গরমের মধ্যে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে গ্যাস নিতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে চালকদের।
এ পরিস্থিতিতে গ্যাস সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক করে জনদুর্ভোগ কমাতে জরুরি ও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী যাত্রী, চালক ও পরিবহন সংশ্লিষ্টরা।
সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালক মো. কামাল জানান, সারারাত লাইনে দাঁড়িয়ে সকালে মাত্র ২০০ টাকার গ্যাস পেয়েছি। এভাবে চললে মালিককে জমার টাকা দিতে পারব না।
বাড়তি ভাড়া নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে অল্প গ্যাস পাচ্ছি। সেগুলো দিয়ে কোনোরকম গাড়ি চালাচ্ছি। কিছু টাকা বাড়তি না নিলে দিন শেষে শূন্য হাতে বাসায় ফিরতে হবে।
গ্যাস সংকটের কারণে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও বাসের বড় একটি অংশ সড়কে নামতে পারছে না। যার কারণে সকাল থেকেই নগরের গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও বাসস্ট্যান্ডগুলোতে যাত্রীদের দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী ও রোগীরা সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে না পেরে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
অক্সিজেন থেকে নিউমার্কেটগামী এক যাত্রী বলেন, অন্যদিন কিছুক্ষণ দাঁড়ালেই সিএনজি অটোরিকশা পাওয়া যায়। কিন্তু আজ এক ঘণ্টার বেশি অপেক্ষা করেও কোনো খালি গাড়ি পাইনি। অফিসে যেতে দেরি হয়ে গেছে।
অনার্স পড়ুয়া শিক্ষার্থী সোহানা আক্তার জানান, মুরাদপুর মোড়ে প্রায় আধাঘণ্টা গাড়ির জন্য অপেক্ষা করে যাচ্ছি। দুয়েকটি বাস এলেও যাত্রীদের চাপে সেখানে তিনি উঠতে পারেননি। পরীক্ষা শুরুর সময় ঘনিয়ে আসায় ২৫০ টাকায় সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তিনি গন্তব্যে গিয়েছেন।
শুধু সোহানা আক্তার নন, স্কুল-কলেজগামী অনেক শিক্ষার্থীকে গণপরিবহন সংকটের কারণে দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে। যানবাহনের সংকটকে পুঁজি করে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা।
তাদের দাবি, অধিকাংশ সিএনজিচালিত অটোরিকশা মিটারে চলাচল করছে না। চুক্তিভিত্তিক ভাড়াও স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় দ্বিগুণ, কোথাও কোথাও তিনগুণ পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। বিকল্প না থাকায় অনেকেই বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে গন্তব্যে যাচ্ছেন।
পরিবহন সংশ্লিষ্টদের দাবি, নিয়মিত গ্যাস না পাওয়ায় অর্ধেকের বেশি সিএনজিচালিত যানবাহন সড়কে নামতে পারছে না। এতে চালক ও মালিক—উভয়েই আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করা না হলে চট্টগ্রামে জনভোগান্তি আরও বাড়বে।
চলমান সংকটে নগরের বিভিন্ন এলাকায় দিনের অধিকাংশ সময় গ্যাসের চাপ না থাকায় রান্না করতে পারছেন না বাসিন্দারা। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে হোটেলের খাবারের ওপর নির্ভর করছেন, আবার কেউ গভীর রাত বা ভোরে গ্যাস এলে রান্না করে রাখছেন। শুধু বাসাবাড়িই নয়, ছোট ব্যবসা ও শিল্পকারখানার কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।
কাপাসগোলা এলাকার বাসিন্দা লাভলী বেগম জানান, দুইদিন ধরে বাসায় গ্যাস নেই। বাচ্চারা কষ্ট পাচ্ছে। দুইদিন ধরে হোটেল থেকে খাবার কিনে খেতে হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, কক্সবাজারের মহেশখালীতে ২১ জুলাই একসিলারেট এনার্জি পরিচালিত একটি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। আরেকটি টার্মিনাল থেকে সরবরাহের কাজ চললেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।
কেজিডিসিএল সূত্রে জানা গেছে, ৩৫ কোটি ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে রোববার ১৯ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া গেছে। যার প্রভাব পড়েছে আবাসিক গ্রাহক, শিল্পকারখানা এবং সিএনজি ফিলিং স্টেশনে।