ঢাকা শুক্রবার, ০৭ আগস্ট ২০২৬, ২৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

দ্বিতীয় তিস্তা সেতুতে ভারী যান চলাচল বন্ধ, বাড়ছে সময় ও পরিবহন ব্যয়

দ্বিতীয় তিস্তা সেতুতে ভারী যান চলাচল বন্ধ, বাড়ছে সময় ও পরিবহন ব্যয়

বিভাগীয় নগরী রংপুরের সঙ্গে লালমনিরহাটের যোগাযোগ সহজ করতে ৯ বছর আগে তিস্তা নদীর ওপর ১২৩ কোটি ৮৬ লাখ টাকা ব্যয়ে সেতু এবং প্রায় ২৮ কোটি টাকা ব্যয়ে আঞ্চলিক মহাসড়ক নির্মাণ করা হলেও, তা কাঙ্ক্ষিত সুফল দিচ্ছে না। সেতুর ওপর দিয়ে ভারী যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় বুড়িমারী থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ ঘুরে লালমনিরহাট সদর হয়ে রংপুরে চলাচল করছে ট্রাকসহ বিভিন্ন ভারী যানবাহন। এতে বাড়ছে পরিবহন ব্যয়, নষ্ট হচ্ছে অতিরিক্ত সময়।

জানা গেছে, বুড়িমারী স্থলবন্দরসহ লালমনিরহাটের পাটগ্রাম, হাতীবান্ধা, কালীগঞ্জ ও আদিতমারী উপজেলার সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে ‘দ্বিতীয় তিস্তা সেতু’ নির্মাণ করা হয়। সেতুটি লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার কাকিনা এলাকার সঙ্গে রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার মহিপুর এলাকাকে যুক্ত করেছে। ৮৫০ মিটার দৈর্ঘ্যের এ সেতু নির্মাণে ব্যয় হয় ১২৩ কোটি ৮৬ লাখ টাকা।

অন্যদিকে, রংপুর নগরীর বুড়িরহাট থেকে গঙ্গাচড়ার শংকরদহের সিরাজুল বাজার পর্যন্ত ১১ কিলোমিটার দীর্ঘ আঞ্চলিক মহাসড়ক নির্মাণে ব্যয় হয় প্রায় ২৮ কোটি টাকা।

লালমনিরহাট এলজিইডি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১২ সালে সেতুটির নির্মাণকাজ শুরু হয় এবং ২০১৮ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর এটি উদ্বোধন করা হয়। তবে নাজুক সড়কের কারণে চালুর পর প্রথম চার বছর সেতুটি দিয়ে ভারী যানবাহন চলাচল করতে দেওয়া হয়নি। পরে ২০২২ সালের ১১ জানুয়ারি সব ধরনের যানবাহন চলাচলের জন্য সেতুটি খুলে দেওয়া হয়। কিন্তু বছর না ঘুরতেই সড়কের বিভিন্ন স্থানে ভাঙন দেখা দিলে স্থানীয় শিক্ষার্থী ও থ্রি-হুইলার মালিক সমিতির সদস্যরা ভারী যানবাহন চলাচল বন্ধের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন।

আন্দোলনের মুখে রংপুর বিভাগীয় কমিশনারের আদেশে ২০২৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর থেকে সেতুর উত্তর প্রান্তে প্রতিবন্ধক খুঁটি বসিয়ে আবারও ভারী যানবাহন চলাচল বন্ধ করা হয়। ফলে বাস ও ট্রাকসহ সব ধরনের ভারী যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সে সময় বলা হয়েছিল, চলাচলের উপযোগী করে আঞ্চলিক মহাসড়ক পুনর্নির্মাণ না করা পর্যন্ত এই প্রতিবন্ধক বহাল থাকবে।

অন্যথায় পণ্যবাহী যানবাহনের চাপে সড়ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তবে চলাচল বন্ধের দেড় বছর পার হলেও সড়ক পুনরায় চালুর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

অভিযোগ রয়েছে, থ্রি-হুইলার মালিক সমিতির সিন্ডিকেটের একচ্ছত্র আধিপত্যের কারণেই সেতু দিয়ে ভারী যানবাহন চলাচলের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, লালমনিরহাট জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার কাকিনা ইউনিয়নের রুদ্রেশ্বর এলাকায় সংযোগ সড়কে আড়াআড়িভাবে লোহার পাইপ দিয়ে তৈরি প্রতিবন্ধক বসানো হয়েছে। ফলে সড়কে কোনো বাস বা ট্রাক চলাচল করতে পারছে না।

পিকআপ, প্রাইভেটকার ও মাইক্রোবাস কোনোরকমে চলাচল করলেও বুড়িমারী স্থলবন্দর থেকে আসা পণ্যবাহী ট্রাক ও বাসগুলো কালীগঞ্জের কাকিনা বাজার হয়ে লালমনিরহাট জেলা সদর ঘুরে রংপুরের কাউনিয়া তিস্তা সেতুর ওপর দিয়ে চলাচল করছে।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) রংপুর কার্যালয় জানায়, রংপুর নগরীর বুড়িরহাট থেকে গঙ্গাচড়ার শংকরদহের সিরাজুল বাজার পর্যন্ত ১১ কিলোমিটার দীর্ঘ আঞ্চলিক মহাসড়কের কাজ প্রায় ২৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০২৩ সালের নভেম্বরে শুরু হয়ে পরের বছরের মার্চে শেষ হয়।

দরপত্র অনুযায়ী কার্পেটিং করা পাকা সড়কটির প্রস্থ ১৮ ফুট। এর বাইরে দুই পাশে ৩ ফুট করে ইট বিছানো এবং আরও ৩ ফুট করে মাটি ভরাট করে মোট ১২ ফুট প্রশস্তকরণ করা হয়। নির্মাণের পর ভারত থেকে আমদানি করা পাথরসহ পণ্যবাহী ভারী ট্রাক ও যাত্রীবাহী বাস চলাচল শুরু হলেও সড়কের দুই পাশে ইট ও মাটি ধসে পড়ার অভিযোগ উঠলে ভারী যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়।

আমদানিকারক ব্যবসায়ী ও ট্রাক-ট্যাংক লরি শ্রমিক নেতাদের ভাষ্য, বুড়িমারী স্থলবন্দর থেকে আসা আমদানিকৃত পণ্যের ট্রাকগুলোকে এখন লালমনিরহাট জেলা সদর ঘুরে রংপুরের কাউনিয়া তিস্তা সেতু দিয়ে যেতে হচ্ছে। এতে প্রায় ৫০ কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ অতিক্রম করতে হয়।

রংপুর থেকে লালমনিরহাট শহর হয়ে বুড়িমারীর দূরত্ব প্রায় ১৪০ কিলোমিটার, অথচ গঙ্গাচড়ার এই সেতু ব্যবহার করলে দূরত্ব নেমে আসে প্রায় ৯০ কিলোমিটারে।

ব্যবসায়ীরা জানান, বুড়িমারী থেকে লালমনিরহাট হয়ে রংপুর আসতে ট্রাকপ্রতি ভাড়া পড়ে ১৭ থেকে ১৮ হাজার টাকা। অথচ শেখ হাসিনা সেতু (দ্বিতীয় তিস্তা সেতু) ব্যবহার করলে ভাড়া পড়ত ৯ থেকে ১০ হাজার টাকা। সেই সঙ্গে চালক ও শ্রমিকদের অতিরিক্ত প্রায় দুই ঘণ্টা সময় নষ্ট হচ্ছে।

ট্রাকচালক সাকিব বলেন, সড়কটি বন্ধ থাকায় আমাদের ভোগান্তি বেড়েছে। সবার দিক বিবেচনা করে সড়কটি খুলে দেওয়া উচিত।

রংপুর নগরীর চেকপোস্ট এলাকার ব্যবসায়ী রাজ মাহমুদ বলেন, শতকোটি টাকা ব্যয়ে সেতু নির্মাণ করা হলেও তা ব্যবসায়ীদের কোনো কাজে আসছে না। পণ্য পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর। দ্রুত ভারী যান চলাচলের অনুমতি দেওয়া দরকার।

রংপুর জেলা ট্রাক, ট্যাংক লরি ও কাভার্ডভ্যান শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মো. হাফিজুর রহমান হাফিজ বলেন, ‘আমরা আশা করেছিলাম মহিপুর সেতু হলে শ্রমিকদের কষ্ট কমবে। কিন্তু সেতু হওয়ার পরও কোনো সুবিধা পাচ্ছি না। সেতুটি কি শুধু পথচারী, ভ্যান, অটো আর টেম্পুর জন্য করা হয়েছে? ভারী যানবাহন কেন বন্ধ রাখা হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো পক্ষই আমাদের স্পষ্ট করে কিছু জানায়নি। জনস্বার্থ ও শ্রমিক-মালিকদের সুবিধার্থে এটি অবিলম্বে খুলে দেওয়া উচিত।’

লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলা থ্রি-হুইলার মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুস সাত্তার বলেন, হাতীবান্ধা-রংপুর রুটে প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ জন দরিদ্র মানুষ থ্রি-হুইলার চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। হাইওয়েতে এসব যান চলাচল নিষিদ্ধ হওয়ায় তারা এই বিকল্প রুট ব্যবহার করেন। মাঝেমধ্যেই পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা পথটি খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়ে আমাদের সমস্যায় ফেলছেন।

এর আগেও পথটি খুলে দেওয়া হয়েছিল। তখন বাস-ট্রাক চলাচলের কারণে সড়ক ভেঙে যায় এবং ব্যাপক যানজট সৃষ্টি হয়। সড়ক প্রশস্ত ও মজবুত করা হলে বাস-ট্রাক চলাচলে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। তা ছাড়া এই ভাঙা সড়কে ভারী যান চললে পাঁচ থানার হাজার হাজার রোগীর যাতায়াতে চরম ভোগান্তি হবে। এসব বিষয় বিবেচনা করেই ভারী যানবাহন বন্ধ রাখা হয়েছে।

এলজিইডি লালমনিরহাট জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. কাওছার আলম বলেন, আন্দোলনের পর বিভাগীয় কমিশনারের সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে সেতুর ওপর দিয়ে ভারী যানবাহন চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। এখানে সেতু বা সড়কের মূল কাঠামোয় কোনো সমস্যা নেই।

সময় ও পরিবহন ব্যয়,ভারী যান চলাচল,দ্বিতীয় তিস্তা সেতু
আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত