ঢাকা মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬, ৩ ভাদ্র ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

মোংলা বন্দর শুধু বন্দর নয়, পূর্ণাঙ্গ শিল্প হাবে পরিণত হবেঃ নৌপরিবহন মন্ত্রী

মোংলা বন্দর শুধু বন্দর নয়, পূর্ণাঙ্গ শিল্প হাবে পরিণত হবেঃ নৌপরিবহন মন্ত্রী

বন্দরকে আধুনিক, বিশ্বমানের ও ব্যবসাবান্ধব বন্দরে রূপান্তরের পাশাপাশি বন্দরকেন্দ্রিক দক্ষিণাঞ্চলে একটি জাতীয় অর্থনৈতিক হাব গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।

তিনি বলেন, মোংলা বন্দরে নতুন জেটি নির্মাণ, নতুন ইপিজেড বা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল স্থাপন, কোল্ড স্টোরেজ ও শিল্প অবকাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আকরাম পয়েন্টে এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে মোংলা বন্দর শুধু একটি বন্দর হিসেবে নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্প হাবে পরিণত হবে। এর ফলে দক্ষিণাঞ্চলে শিল্প-কারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানের ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টি হবে। সোমবার সন্ধ্যায় খুলনার হোটেল সিটি ইনে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ আয়োজিত ‘মোংলা বন্দরকে আধুনিক ও বিশ্বমানের বন্দর হিসেবে গড়ে তুলতে অংশীজন সম্মেলনে’ প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী এসব কথা বলেন। এর আগে বিকেলে একই স্থানে বন্দর ব্যবহারকারীদের সঙ্গে পৃথক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়।

মন্ত্রী বলেন, মোংলা বন্দরের বিদ্যমান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা নিয়ে আগামী এক মাসের মধ্যে এসব সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে। বন্দরের কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় সর্বোচ্চ সহযোগিতা করবে।

নাব্যতা রক্ষায় নিয়মিত ড্রেজিং

অংশীজনদের বক্তব্যে মোংলা বন্দরের প্রধান সমস্যা হিসেবে বন্দর চ্যানেলের ড্রাফট বা গভীরতা ধরে রাখার বিষয়টি উঠে আসে। এর পরিপ্রেক্ষিতে শেখ রবিউল আলম বলেন, বন্দরের নাব্যতা রক্ষায় নিয়মিত প্রয়োজনীয় ড্রেজিং করা হবে এবং এ বিষয়ে তিনি দায়িত্ব নিচ্ছেন।

তবে ড্রেজিং কার্যক্রমে দুর্নীতির অভিযোগের অবসান ঘটানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। তার ভাষায়, ড্রেজিংয়ে ব্যাপক দুর্নীতি হচ্ছে—এ ধরনের অনিয়ম বন্ধ করতে হবে। বন্দরের উন্নয়নে বরাদ্দ অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করারও তাগিদ দেন তিনি।

কাস্টমসকে সেবাবান্ধব হওয়ার নির্দেশ

মোংলা বন্দরে কাস্টমসের কার্যক্রম নিয়েও কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেন নৌপরিবহন মন্ত্রী। তিনি বলেন, রাষ্ট্রের কর্মচারীদের জনগণকে সেবা দিতে হবে এবং রাষ্ট্রের স্বার্থে কাজ করতে হবে। সরকারি দপ্তরকে কোনোভাবেই ব্যক্তিগত রাজত্বে পরিণত করা যাবে না।

তিনি কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে ব্যবসাবান্ধব ও সেবামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, নীলকরদের মতো করে কাস্টমস পরিচালনা করা যাবে না। সরকারি দপ্তরগুলোতে সেবাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা গেলে বন্দরের কার্যক্রম যেমন বাড়বে, তেমনি সরকারের রাজস্ব আদায়ও বৃদ্ধি পাবে।

বন্দরকেন্দ্রিক জাতীয় অর্থনৈতিক হাব

মন্ত্রী বলেন, মোংলা বন্দরের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে বন্দরকেন্দ্রিক সমন্বিত অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে। অর্থনৈতিক অঞ্চল, এলএনজি স্টেশন, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, সেতু, সড়ক ও নৌপথের উন্নয়নসহ বিভিন্ন প্রকল্প দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে।

তিনি বলেন, এসব অবকাঠামো উন্নয়ন একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়া গেলে মোংলা বন্দরকে ঘিরে দক্ষিণাঞ্চলে একটি শক্তিশালী জাতীয় অর্থনৈতিক হাব গড়ে উঠবে। এতে স্থানীয় জনগণের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং খুলনা-বাগেরহাটসহ দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও সম্প্রসারিত হবে।

অংশীজনদের বিভিন্ন দাবি

সম্মেলনে মোংলা বন্দরের ব্যবহারকারীরা বন্দরের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, সেবার মান বৃদ্ধি, পণ্য খালাসে গতি আনা, নাব্যতা রক্ষা এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরিসহ বিভিন্ন বিষয়ে মতামত ও সুপারিশ তুলে ধরেন। সভায় বন্দরের বর্তমান কার্যক্রম, ড্রেজিং, চলমান ও প্রস্তাবিত উন্নয়ন প্রকল্প, জাহাজ আগমন, কার্গো ও কনটেইনার হ্যান্ডলিং, গাড়ি আমদানি এবং বন্দরের সার্বিক কার্যক্রমের বার্ষিক পরিসংখ্যান নিয়ে পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করা হয়। বন্দরের হারবার মাস্টার ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম মোংলা বন্দরের সম্ভাবনা ও বিভিন্ন দিক নিয়ে একটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।

আলোচনায় সিএনএফ এজেন্ট, শিপিং এজেন্ট, নৌযান মালিক, চেম্বার অব কমার্সের নেতা, আমদানি-রপ্তানিকারক, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি এবং সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা অংশ নেন।

আকরাম পয়েন্টে এলএনজি টার্মিনালের সম্ভাব্যতা

এর আগে রোববার, ১৬ আগস্ট, মোংলা বন্দরের অদূরে আকরাম পয়েন্ট পরিদর্শন করেন নৌপরিবহন মন্ত্রী। সেখানে এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের সম্ভাব্যতা এবং বন্দর ও সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলো সরেজমিনে পরিদর্শন করেন তিনি। টার্মিনাল নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় ড্রেজিংয়ের বিষয়টিও তিনি পর্যালোচনা করেন।

অনুষ্ঠানে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল আরিফ আহমেদম মোস্তফা স্বাগত বক্তব্য দেন। এছাড়া খুলনা-২ আসনের সংসদ সদস্য শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলাল, খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এস এম শফিকুল আলম, খুলনা মহানগর পুলিশ কমিশনার মো. সাজ্জাদুর রহমান, খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি মো. মোস্তাফিজুর রহমান, জেলা প্রশাসক হুরে জান্নাত, মোংলা কাস্টমস হাউসের কমিশনার ড. আবু নূর রাশেদ আহম্মেদ এবং খুলনা জেলা পরিষদের প্রশাসক এস এম মনিরুল ইসলাম বাপ্পিসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা ও প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

অংশীজনদের মধ্যে বক্তৃতা করেন, বন্দরের ট্রাফিক কন্ট্রোলার কামাল হোসেন, শিপিং এ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যাপ্টেন মোঃ রফিকুল আলম, বন্দর বার্থ এ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদ মোঃ জুলফিকার আলী, সিএন্ডএফ এজেন্ট এ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোশারফ হোসেন, ফ্রোজেন ফুড এ্যাসেসিয়েশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট কামরুল আহসান, খুলনা চেম্বার এন্ড কমার্স’র প্রশাসক অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মঞ্জুর আলম, কাজি হাফিজুর রহমান, মফিজুর রহমান প্রমুখ।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, মোংলা বন্দরের নাব্যতা রক্ষা, আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণ, দ্রুত ও সহজতর সেবা নিশ্চিতকরণ এবং বন্দরকেন্দ্রিক শিল্পায়ন সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়া গেলে দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতিতে নতুন গতি সৃষ্টি হবে। বিশেষ করে পদ্মা সেতু ও আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নের সঙ্গে মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো গেলে দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে এ বন্দরের গুরুত্ব আরও বাড়বে।

মোংলা বন্দর,নৌপরিবহন মন্ত্রী
আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত