ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০ ভাদ্র ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

চুয়াডাঙ্গায় বদলাচ্ছে মাদকের ধরন, নতুন চ্যালেঞ্জ ট্যাপেন্টাডল ও ইনজেকশন

চুয়াডাঙ্গায় বদলাচ্ছে মাদকের ধরন, নতুন চ্যালেঞ্জ ট্যাপেন্টাডল ও ইনজেকশন

সীমান্তবর্তী জেলা চুয়াডাঙ্গায় দীর্ঘদিন ধরে ফেনসিডিল, গাঁজা ও ইয়াবার মতো প্রচলিত মাদকের কারবার চলে আসছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে জেলার মাদক পরিস্থিতিতে পরিবর্তনের আভাস মিলছে। প্রচলিত মাদকের পাশাপাশি ট্যাপেন্টাডলসহ বিভিন্ন নেশাজাতীয় ট্যাবলেট এবং বুপ্রেনরফাইন ইনজেকশনের ব্যবহার ও কারবার বাড়ছে।

চুয়াডাঙ্গা-৬ বিজিবির কয়েক বছরের অভিযানের তথ্যেও মাদকের ধরন পরিবর্তনের এ প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

২০২৩ সালের আগস্ট থেকে ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত ১১ হাজারের বেশি নেশাজাতীয় ট্যাবলেট ও ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছিল। এর পরের এক বছরে ২৫ হাজার ৪৮৫টি ট্যাপেন্টাডল ও নেশাজাতীয় ট্যাবলেট উদ্ধারের তথ্য পাওয়া গেছে। একই সময়ে ১০ হাজার ৬১৭ বোতল ফেনসিডিল এবং ২৩৮ কেজির বেশি গাঁজা উদ্ধার করেছে বিজিবি।

অভিযানের সংখ্যা, নজরদারি এবং পাচারের কৌশলের ওপর উদ্ধার হওয়া মাদকের পরিমাণ নির্ভর করে। তবে বিপুলসংখ্যক ট্যাপেন্টাডলসহ নেশাজাতীয় ট্যাবলেট এবং বুপ্রেনরফাইন ইনজেকশন উদ্ধারের ঘটনা মাদকের ধরন পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বলে মনে করা হচ্ছে।

বিজিবির একাধিক অভিযানে শত শত থেকে হাজার হাজার পিস ট্যাপেন্টাডল উদ্ধার হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন সময় বুপ্রেনরফাইন ইনজেকশনও উদ্ধার করা হচ্ছে। ফলে ফেনসিডিল, গাঁজা ও ইয়াবার মতো প্রচলিত মাদকের পাশাপাশি ওষুধজাত নেশাদ্রব্য নিয়ন্ত্রণও নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ব্যথানাশক হিসেবে ব্যবহৃত ট্যাপেন্টাডল ওষুধকে ২০২০ সালে মাদকদ্রব্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়। মাদকসেবীরা এই ধরনের ওষুধকে মাদকের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করায় সরকার এটিকে ‘খ’ শ্রেণির মাদকদ্রব্য হিসেবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করে গেজেট প্রকাশ করে। অন্যদিকে, বুপ্রেনরফাইন ইনজেকশন ১৯৯০ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের শুরু থেকেই ‘ক’ শ্রেণির নিষিদ্ধ মাদক হিসেবে তালিকাভুক্ত রয়েছে।

চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা, দর্শনা ও জীবননগর সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় এসব অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরেই মাদক পাচারের ঝুঁকি রয়েছে। সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে ফেনসিডিল, গাঁজা, ইয়াবা ও ট্যাপেন্টাডলসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক উদ্ধারের ঘটনা ঘটছে। তবে মাদকের বিস্তার এখন আর শুধু সীমান্ত এলাকাতেই সীমাবদ্ধ নেই। জেলার অভ্যন্তরেও বিভিন্ন সময়ে মাদক উদ্ধারের ঘটনা ঘটছে।

গত বছরের সেপ্টেম্বরে চুয়াডাঙ্গা শহরের একটি কুরিয়ার সার্ভিসের সামনে থেকে ৫ হাজার ৭০০ পিস ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনা থেকে ধারণা করা যায়, সীমান্ত দিয়ে প্রবেশের পর বিভিন্ন পরিবহন ও যোগাযোগব্যবস্থার মাধ্যমে মাদক জেলার অভ্যন্তরে ছড়িয়ে পড়ছে। তাই সীমান্তে নজরদারির পাশাপাশি জেলার ভেতরের সরবরাহব্যবস্থার ওপরও নজরদারি বাড়ানোর প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

মাদকের ধরন পরিবর্তনের পাশাপাশি কিশোর ও তরুণদের মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও বাড়ছে। সম্প্রতি জীবননগরে আয়োজিত একটি মাদকবিরোধী সচেতনতামূলক সভায় চুয়াডাঙ্গার জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহার বলেন, সীমান্তবর্তী এলাকায় পঞ্চম থেকে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদেরও মাদক বহনের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। একই সঙ্গে উচ্চমাধ্যমিক ও অনার্সপড়ুয়া তরুণ-তরুণীদের মধ্যে মাদকাসক্তি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।

চুয়াডাঙ্গা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের প্রসিকিউটর আকুব্বার আলী বলেন, মাদক প্রতিহত করতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। মাদক কারবারি ও সেবনকারী উভয়ের বিরুদ্ধেই মামলা করা হচ্ছে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হচ্ছে। দ্রুত বিচার শেষ করতে সামারি ট্রায়ালের মাধ্যমেও মাদক কারবারি ও এর সঙ্গে জড়িতদের শাস্তির ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, মাদক এমনভাবে বিস্তার লাভ করেছে যে একার পক্ষে এটি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। মাদকের বিরুদ্ধে সবাইকে কাজ করতে হবে।

চুয়াডাঙ্গার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ রুহুল কবির খান বলেন, মাদক কারবারিদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করা হচ্ছে। এতে অপরাধীদের মধ্যে আইনের প্রতি ভীতি তৈরি হয়েছে। চুয়াডাঙ্গাকে মাদকমুক্ত জেলা হিসেবে গড়ে তুলতে জেলা পুলিশ বদ্ধপরিকর। এ জন্য সামারি ট্রায়ালের পাশাপাশি মাদক কারবারিদের আত্মসমর্পণেরও সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। আগে অনেকেই সহজে জামিন পেয়ে যেতেন। এখন দ্রুত সাজা হওয়ায় মাদক কারবারি ও সেবনকারীদের মধ্যে ভয় তৈরি হয়েছে।

চুয়াডাঙ্গা জেলা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মারুফ সরোয়ার বাবু বলেন, মাদক নিয়ন্ত্রণে সামারি ট্রায়াল কার্যকর ভূমিকা রাখছে। দ্রুত বিচার ও শাস্তির ফলে অপরাধীরা নিরুৎসাহিত হচ্ছে।

চুয়াডাঙ্গা-৬ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাজমুল হাসান জানান, সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মাদক ও চোরাচালান প্রতিরোধে বিজিবি সর্বদা সতর্ক ও তৎপর রয়েছে। সীমান্ত এলাকায় সব ধরনের অবৈধ কার্যক্রম দমনে গোয়েন্দা নজরদারি, নিয়মিত টহল ও বিশেষ অভিযান ভবিষ্যতে আরও জোরদারভাবে অব্যাহত থাকবে।

ট্যাপেন্টাডল ও ইনজেকশন,নতুন চ্যালেঞ্জ,মাদকের ধরন,চুয়াডাঙ্গা
আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত