ঢাকা মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৪ ভাদ্র ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

তিস্তা অববাহিকায় উন্নয়নের ছোঁয়া, স্বাবলম্বী হচ্ছেন প্রান্তিক মানুষ

তিস্তা অববাহিকায় উন্নয়নের ছোঁয়া, স্বাবলম্বী হচ্ছেন প্রান্তিক মানুষ

তিস্তা নদীবেষ্টিত রংপুর বিভাগের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দুর্যোগ সহনশীল অবকাঠামো গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) ‘প্রভাতী’ প্রকল্প।

উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে স্থানীয় মানুষকে সরাসরি সম্পৃক্ত করায় শুধু অবকাঠামোর উন্নয়ন নয়, বদলে যাচ্ছে মানুষের জীবন-জীবিকাও।

এলজিইডি সূত্রে জানা যায়, ‘অবকাঠামোগত দক্ষতা উন্নয়ন ও তথ্যের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সহনশীলতা বৃদ্ধি’ শীর্ষক প্রভাতী প্রকল্পটি ইন্টারন্যাশনাল ফান্ড ফর অ্যাগ্রিকালচারাল ডেভেলপমেন্ট (ইফাদ)-এর অর্থায়নে ২০১৮ সালের জুলাই মাসে শুরু হয়।

বর্তমানে রংপুর বিভাগের গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, রংপুর, নীলফামারী ও লালমনিরহাট জেলার ২৫টি উপজেলায় প্রকল্পটির বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

প্রকল্পের আওতায় গ্রামীণ সড়ক উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ, হাটবাজার উন্নয়ন, বিদ্যালয় কাম বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, জলবায়ু সহিষ্ণু অবকাঠামোর নকশা প্রণয়ন এবং বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে উন্নয়ন কাজে সম্পৃক্ত করে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হচ্ছে।

রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার টেপামধুপুর, ভাইয়ারহাট, হারাগাছ ও মীরবাগ এলাকায় বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র এবং হাটবাজার উন্নয়নকাজ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। গঙ্গাচড়া উপজেলায়ও বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র ও হাটবাজার উন্নয়নকাজ বাস্তবায়ন করা হয়েছে।

প্রকল্পটির একটি ব্যতিক্রমধর্মী দিক হলো, বাজার উন্নয়নের ক্ষেত্রে ঠিকাদারের পরিবর্তে স্থানীয় হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীকে চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক দল হিসেবে কাজের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। এসব দলের প্রায় ৮০ শতাংশ সদস্য নারী। নির্মাণকাজ শুরুর আগে তাদের পাঁচ দিনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণে নির্মাণসামগ্রী ক্রয়, শ্রম ব্যবস্থাপনা এবং কাজের আর্থিক হিসাব-নিকাশ সম্পর্কে হাতে-কলমে শিক্ষা দেওয়া হয়।

কাউনিয়ার খানসামা হাট নির্মাণের আগে মাইকিং করে স্থানীয়দের কাছ থেকে আবেদন গ্রহণ করা হয়। পরে লটারির মাধ্যমে শ্রমিক নির্বাচন করে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। ফলে উন্নয়ন প্রকল্পের সুফল সরাসরি পৌঁছে যাচ্ছে স্থানীয় মানুষের কাছে।

এ ছাড়া দুই উপজেলায় প্রায় ১০ হাজার বেকার যুবক ও যুব নারীকে ৪৫ দিনের আবাসিক কারিগরি প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। প্রশিক্ষণ শেষে অনেকে নিজস্ব উদ্যোগে ব্যবসা শুরু করে স্বাবলম্বী হয়েছেন। পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে বন্যার পূর্বাভাস প্রচার, জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে গবেষণা এবং দুর্যোগ প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রমও পরিচালিত হচ্ছে।

সরেজমিনে কাউনিয়া উপজেলার পল্লীমারী এলাকায় দেখা যায়, বন্যাপ্রবণ অঞ্চলে নির্মিত হয়েছে তিনতলা বিশিষ্ট আধুনিক বিদ্যালয় কাম বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র। ভবনটিতে বন্যার সময় আশ্রয় নেওয়া মানুষের জন্য খাদ্য সংরক্ষণ কক্ষ, রান্নাঘর, কমিউনিটি ক্লিনিক, নারী-পুরুষের পৃথক টয়লেট এবং গবাদিপশু রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে এটি পল্লীমারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

বিদ্যালয়ের শিক্ষক শায়লা সাঈদ বলেন, “ভবনটি অত্যাধুনিক। পর্যাপ্ত আলো-বাতাস, নতুন বেঞ্চ, আলাদা টয়লেট এবং বন্যাদুর্গত মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় সব সুবিধা রয়েছে। এটি এলাকাবাসী ও শিক্ষার্থীদের জন্য আশীর্বাদ।”

স্থানীয় কৃষক আফজাল হোসেন বলেন, “বন্যার সময় হামার সব ডুবি যায়। থাকার জায়গা থাকে না। এখন বড় একটা সুন্দর বিল্ডিং হইছে। গরু-ছাগল নিয়াও আশ্রয় নেওয়া যাবে।”

আরেক কৃষক মমিনুল মিয়া বলেন, “এই প্রজেক্ট হামার এলাকায় বাজার করছে, রাস্তা করছে। ছাওয়াগুলাক ট্রেনিং দিচ্ছে। এলাকার উন্নতি হইতেছে।”

ইফাদের কর্মসূচি ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহ-সভাপতি ড. ডোনাল ফ্রান্সিস ব্রাউন বলেন, “প্রত্যন্ত এলাকায় এটি একটি চমৎকার উদ্যোগ। বন্যার সময় আশ্রয়কেন্দ্র এবং অন্য সময়ে বিদ্যালয় হিসেবে ব্যবহার হওয়ায় অবকাঠামোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হচ্ছে। এটি মানুষের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।”

এলজিইডি রংপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মুসা বলেন, “প্রভাতী প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা বন্যাপ্রবণ এলাকায় টেকসই অবকাঠামো নির্মাণ, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির কাজ করছি। বিশেষ করে নারী ক্ষমতায়ন ও বেকারত্ব দূরীকরণে প্রকল্পটি ইতোমধ্যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।”

তিস্তা অববাহিকার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে বন্যা, নদীভাঙন ও দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে আসছেন। প্রভাতী প্রকল্পের মাধ্যমে অবকাঠামো উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় তাদের জীবনে এসেছে নতুন সম্ভাবনা।

উন্নয়নের এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে প্রান্তিক জনপদের মানুষের জীবনমান আরও উন্নত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রান্তিক মানুষ,স্বাবলম্বী হচ্ছেন,উন্নয়নের ছোঁয়া,তিস্তা অববাহিকা
আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত