
নেত্রকোনার দুর্গাপুরে এক কিশোরীকে সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণ এবং ঘটনার ভিডিও ধারণের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে চার যুবকের বিরুদ্ধে। এ সময় কিশোরীর ব্যবহৃত মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিয়ে কথিত ধর্ষণের দৃশ্য ধারণ করে রাখারও অভিযোগ উঠেছে।
অভিযুক্তরা হলেন উপজেলার গাঁওকান্দিয়া ইউনিয়নের পূর্ব দুবরাজপুর গ্রামের সিরাজ মিয়ার ছেলে নাঈম মিয়া, ফরিদ মিয়ার ছেলে ঝুটন মিয়া, লাল মিয়ার ছেলে রুহুল আমিন ও একই গ্রামের ডেকোরেশন মিস্ত্রি আজিজুল ইসলাম।
ঘটনার পরদিন সকালে স্থানীয় কয়েকজন মাতব্বর বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করেছেন বলেও অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী কিশোরী। গত ১৭ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাত ৩টার দিকে এ সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। শুক্রবার সকালে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে সরেজমিনে ঘুরে পরিবারের লোকজন গণমাধ্যমকর্মীদের এসব তথ্য জানান।
গত ১৮ সেপ্টেম্বর দুর্গাপুর থানায় লিখিত অভিযোগ দেন ভুক্তভোগী কিশোরী (১৭)। অভিযোগে দুর্গাপুর উপজেলার গাঁওকান্দিয়া ইউনিয়নের পূর্ব দুবরাজপুর গ্রামের নাঈম (২০), ঝুটন (২১), রুহুল আমিন (২৬)সহ একজনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়। তবে ওই ঘটনায় অজ্ঞাতনামা আসামি হিসেবে উল্লেখ করা ব্যক্তি ডেকোরেশন মিস্ত্রি আজিজুল ইসলাম (১৯) বলে জানা গেছে। তিনজন অভিযুক্ত আদালতে আত্মসমর্পণ করে বর্তমানে জেলহাজতে রয়েছেন। আজিজুল ইসলাম এখনো পলাতক রয়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কিশোরী তার এক বান্ধবীর বড় ভাইয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে যাওয়ার জন্য ১৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যার দিকে নাঈম মিয়ার বাড়িতে যান। সেখানে বিয়ের বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা শেষে রাত ৩টার দিকে নিজ বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হন তিনি। ঘটনার আগের দিন রাতেও গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানেও ওই কিশোরী ছিলেন।
নাঈমের বাবা সিরাজ মিয়া সম্পর্কে কিশোরীর দাদা হন। তিনি কিশোরীকে বাড়িতে পৌঁছে দেন। পরদিন সিরাজ মিয়া তার ছেলে নাঈমকে কিশোরীকে বাড়িতে পৌঁছে দিতে বলেন। নাঈম ওই কিশোরীর কাকা হন।
কিশোরীকে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে অভিযুক্ত নাঈমসহ অন্যরা তাকে পূর্ব দুবরাজপুর গ্রামের একটি পরিত্যক্ত ভিটায় নিয়ে যান বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, সেখানে নাঈমের সঙ্গে থাকা অন্য যুবকদের মধ্যে আজিজুল ইসলাম কিশোরীর মুখ চেপে ধরে রাখেন। অন্যদের সহায়তায় নাঈম তার ওপর যৌন নির্যাতন করেন। পরে ঝুটন মিয়া তার পরনের কাপড় টেনে ছিঁড়ে ধর্ষণের চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে রুহুল আমিন কিশোরীর মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিয়ে অশ্লীল ভিডিও ধারণের চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, আজিজুল ইসলাম কিশোরীর হাত-পা ও মুখ চেপে ধরে রাখেন এবং যৌন নির্যাতনে সহযোগিতা করেন। ভিডিও ধারণের একপর্যায়ে কিশোরীর চিৎকারে আশপাশের লোকজন ছুটে এলে অভিযুক্তরা ঘটনাস্থল থেকে চলে যান।
এ সময় অভিযুক্তরা কিশোরীর ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি নিয়ে যান। ফোনটির আনুমানিক মূল্য ১২ হাজার টাকা। ফোনটিতে একটি সিমও ছিল।
কিশোরীর অভিযোগ, ঘটনার পর তিনি বিষয়টি পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়দের জানান। পরে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের কয়েকজনকে ঘটনাটি জানানো হলেও বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করা হয়। তবে ঘটনার পরদিন আইনি প্রতিকার চেয়ে তিনি দুর্গাপুর থানায় লিখিত অভিযোগ করেন।
কিশোরীর বাবা একজন দিনমজুর। মা অন্যের বাড়িতে কাজ করেন। কিশোরীর দুই বোন ও দুই ভাই রয়েছে।
এ ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। ভুক্তভোগীর অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত, অভিযুক্তদের আইনের আওতায় আনা এবং কোনো ধরনের আপস-মীমাংসার মাধ্যমে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা হয়ে থাকলে তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।
গত বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট দুর্গাপুর চৌকিতে অভিযুক্ত তিনজন আত্মসমর্পণ করলে আদালতের বিচারক নুরুল আলম ভূইয়া জামিন নামঞ্জুর করে তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। গণধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্তদের পক্ষে আইনজীবী ছিলেন অ্যাডভোকেট মানেশ সাহা ও অ্যাডভোকেট পুলক বিশ্বাস।
দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমেদ জানান, পুলিশ তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত তথ্য উদঘাটনের চেষ্টা করছে। তিনজন আসামি জেলহাজতে রয়েছেন। অপর আসামিকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত আছে।