
ইলিশের প্রজনন রক্ষায় সারা দেশে চলছে টানা ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা। মা ইলিশ সংরক্ষণে সরকারি এ নিষেধাজ্ঞা চললেও রাজবাড়ীর পদ্মা নদীতে দিনে-রাতে সমানতালে চলছে মা ইলিশ শিকার। শত শত নৌকায় ধরা হচ্ছে মা ইলিশ। নদীর পাড়ে বসছে অস্থায়ী বাজার, বিক্রিও হচ্ছে প্রকাশ্যে। এতে নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন ও অভিযান পরিচালনার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। মৎস্য বিভাগ ও নৌপুলিশ বলছে, নিয়মিত অভিযান চালিয়েও পুরোপুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না ইলিশ শিকার। অন্যদিকে জেলেদের দাবি, প্রকৃত জেলেদের অনেকে সরকারি খাদ্য সহায়তা না পেয়ে জীবিকার তাগিদে নদীতে নামতে বাধ্য হচ্ছেন।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) জেলার বিভিন্ন এলাকার পদ্মা নদী ও নদীতীরবর্তী অস্থায়ী বাজারগুলোতে মা ইলিশ ধরা ও বিক্রির এমন চিত্র দেখা গেছে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, রাজবাড়ী জেলায় মোট নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ১৪ হাজার ১০২ জন। এর মধ্যে ইলিশ শিকারের সঙ্গে জড়িত কার্ডধারী জেলের সংখ্যা ৬ হাজার ৩০৪ জন। তবে বরাদ্দের স্বল্পতার কারণে এবার সরকারি সহায়তার চাল পাননি ৭১২ জন কার্ডধারী জেলে। জেলার পাঁচ হাজার ৫৯২ জন নিবন্ধিত জেলেকে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
নিষেধাজ্ঞা অনুযায়ী, এ সময়ে ইলিশ আহরণ, মজুত, পরিবহন ও বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। মা ইলিশের নির্বিঘ্ন প্রজনন নিশ্চিত করা এবং ইলিশের উৎপাদন বাড়ানোই এ বিধিনিষেধের মূল উদ্দেশ্য। তবে রাজবাড়ীতে নিষেধাজ্ঞা চলাকালে প্রকাশ্যে ইলিশ শিকার ও বিক্রির ঘটনায় এর বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার কাউয়ালজানি, মুন্সিবাজার, বেতকা ও কলাবাগান, সদর উপজেলার মেছোঘাটা, কালীতলা, মহাদেবপুর ও জৌকুড়া, কালুখালী উপজেলার হরিনবাড়িয়ার চর ও রতনদিয়া এবং পাংশা উপজেলার হাবাসপুর ও বাহাদুরপুরসহ জেলার প্রায় শতাধিক পয়েন্টে চলছে মা ইলিশ শিকার ও বিক্রি। নদী থেকে মাছ শিকার করে নৌকা ঘাটে ভেড়ার সঙ্গে সঙ্গেই ভিড় করছেন ক্রেতারা। নৌকার ওপরেই চলছে সদ্য ধরা মা ইলিশের বেচাকেনা। দিনের আলোতেও প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে নিষিদ্ধ সময়ে ধরা ইলিশ। জেলেদের দাবি, সরকারি খাদ্যসহায়তা না পাওয়ায় জীবিকার তাগিদে তাঁরা নদীতে নামতে বাধ্য হচ্ছেন। এর সঙ্গে রয়েছে সংসারের খরচ ও ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ।
মৎস্যজীবী মো. রেজাউল মণ্ডল বলেন, “সরকারি নিষেধাজ্ঞাকে আমরা সম্মান করি। কিন্তু আমাদের কোনো সরকারি সহায়তা দেওয়া হয় না। যাও ২৫ কেজি চাল দেওয়া হয়, তা দিয়ে সংসার চলে না। পাশাপাশি রয়েছে কিস্তির চিন্তা। তাই একপ্রকার বাধ্য হয়েই অভিযানের মধ্যেও মাছ শিকার করি।”
আরেক মৎস্যজীবী আনোয়ার মণ্ডল বলেন, “প্রতি বছরই অভিযানের সময় চাল দেওয়া হয়। কিন্তু এবার এখনো চাল পাইনি। মাছ ধরা বন্ধ রেখে পরিবার-পরিজন নিয়ে কীভাবে বাঁচব? উপায় না পেয়ে নদীতে নেমে মাছ শিকার করছি।”
মো. জিয়া শেখ বলেন, “মাছ ধরি, কারণ আমাদের খেতে হয়, সংসার চালাতে হয়। আগে চাল পেতাম, কিন্তু গত দুই বছর কোনো চাল পাইনি। এবারও পেলাম না, অথচ আমার জেলে কার্ড আছে। তাহলে মাছ ধরা বন্ধ রেখে পরিবার নিয়ে চলব কীভাবে?”
মো. লালন বলেন, “আমরা প্রতিবছরই চাল পাই। এবারও চাল আনতে গিয়েছিলাম, কিন্তু দেওয়া হয়নি। আমাদের কার্ড নাকি বাতিল হয়ে গেছে। এখানে প্রায় ৫০০ জেলে আছেন। তাঁদের মধ্যে ১০০ জন চাল পেয়েছেন, বাকি ৪০০ জন পাননি। চাল বা কোনো সহযোগিতা না পেলে অভিযানের তোয়াক্কা না করে মাছ ধরবই।”
এদিকে নদীর তীর ঘেঁষে বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে অস্থায়ী মাছের বাজার। সেখানে ক্রেতাদের ভিড়, চলছে দরদাম ও কেনাবেচা। নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই পদ্মার তাজা ইলিশ দেখতে ও কিনতে পেরে খুশি ক্রেতাদের অনেকে। তবে এভাবে প্রকাশ্যে মা ইলিশ ধরা ও বিক্রি চলতে থাকায় ইলিশের প্রজনন রক্ষার উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সচেতন ব্যক্তিরা।
দর্শনার্থী জহুরুল ইসলাম হালিম বলেন, “নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও যেভাবে প্রকাশ্যে মা ইলিশ ধরা ও বিক্রি হচ্ছে, তা দেখে আমরা অবাক হচ্ছি। মা ইলিশ রক্ষা করা আমাদের সবার দায়িত্ব। এভাবে মাছ ধরা চলতে থাকলে ইলিশের উৎপাদন ও প্রজনন ব্যাহত হতে পারে। তাই প্রশাসনের উচিত আরও কঠোরভাবে নজরদারি করা এবং নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা।”
দর্শনার্থী হিরা বলেন, “নদীতে মা ইলিশ ধরা হচ্ছে, আবার নদীর পাড়েই প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে। নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও যদি এমন পরিস্থিতি চলে, তাহলে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে কী লাভ? শুধু অভিযান চালালেই হবে না, মাছ ধরা ও বিক্রির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে প্রকৃত জেলেরা যাতে সরকারি সহায়তা পান, সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।”
ক্রেতা আসিফ হোসেন মনা বলেন, “নদীর পাড়ে তাজা ইলিশ দেখে কিনতে ইচ্ছা হয়। কিন্তু এখন যেহেতু মা ইলিশ রক্ষায় নিষেধাজ্ঞা চলছে, তাই এ সময়ে ইলিশ কেনা ও বিক্রি বন্ধ থাকা উচিত। মা ইলিশ রক্ষা করা গেলে ভবিষ্যতে ইলিশের উৎপাদন বাড়বে, আমরাও বেশি ইলিশ খেতে পারব। এজন্য ক্রেতা-বিক্রেতা সবার সচেতন হওয়া দরকার।”
নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মা ইলিশ শিকারের বিষয়ে দৌলতদিয়া নৌ পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ত্রিনাথ সাহা বলেন, মৎস্য বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে নদীতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে অভিযান চালিয়েও পুরোপুরি ইলিশ শিকার বন্ধ করা যাচ্ছে না। পাশাপাশি জনবল সংকটও রয়েছে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মাহবুব উল হক বলেন, মা ইলিশের প্রজনন রক্ষায় প্রতিদিনই অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। গত ১১ দিনে রাজবাড়ীর পদ্মা নদীতে ৩৯টি অভিযান ও সাতটি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়েছে। এসব অভিযানে ছয় লাখ ৫৫ হাজার মিটার কারেন্ট জাল ও ১৪২ কেজি ইলিশ জব্দ করা হয়েছে। বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে ১২ জেলেকে। এ ছাড়া ৮৪ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে এবং ১০ জেলের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা করে আদালতে পাঠানো হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, মা ইলিশ শিকার বন্ধে জেলেদের নিয়ে সচেতনতামূলক সভা করা হয়েছে। খাদ্য সহায়তা কর্মসূচির আওতায় রাজবাড়ী জেলার পাঁচ হাজার ৫৯২ জন নিবন্ধিত জেলেকে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এরপরও নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে অনেক জেলে নদীতে নামছেন।