
দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে বসেছে ঐতিহ্যবাহী বউমেলা। এ মেলায় নারীদের প্রবেশাধিকার থাকলেও পুরুষদের প্রবেশ নিষিদ্ধ। মেলার গেটে মোটরসাইকেল, বাইসাইকেল, অটোরিকশা ও চার্জার ভ্যানসহ বিভিন্ন বাহনে করে নারী ও শিশুদের নামিয়ে দিয়ে যাচ্ছেন পুরুষরা।
নারীরা মেলায় প্রবেশ করছেন, কেনাকাটা করছেন, আবার বেরিয়ে আসছেন। আর বাইরে অপেক্ষা করছেন তাঁদের সঙ্গে আসা পুরুষরা।
মেয়েদের প্রসাধনী, হস্তশিল্প, গৃহস্থালির প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র থেকে শুরু করে হরেক রকমের খেলনা ও খাবার—সবই রয়েছে এ মেলায়। দেখতে আর দশটা মেলার মতো হলেও ব্যতিক্রম হলো, এখানে দর্শনার্থী ও ক্রেতা সবাই নারী। এ কারণেই মেলার নাম ‘বউমেলা’। প্রায় ৭০ বছর ধরে চলে আসছে এ ঐতিহ্যবাহী মেলা।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধন-সম্পদের দেবী শ্রীশ্রী লক্ষ্মীর পূজার পরদিন দিনাজপুরের ফুলবাড়ী পৌর এলাকার সুজাপুর গ্রামের সর্বজনীন দুর্গামন্দির প্রাঙ্গণে এ মেলা বসে।
প্রতি বছরের মতো এবারও মঙ্গলবার দিনব্যাপী মেলার আয়োজন করা হয়। দুপুরের পর থেকে মেলায় ভিড় বাড়তে থাকে, যা চলে সন্ধ্যা পর্যন্ত।
সরেজমিনে দেখা যায়, মেলায় বসেছে শতাধিক দোকানপাট। এসব দোকানে রয়েছে নারীদের প্রসাধনসামগ্রী, শিশুদের খেলনা, তৈজসপত্র, গৃহসজ্জার উপকরণ, প্রয়োজনীয় নানা জিনিসপত্র ও বাহারি খাবার। পুরুষদের প্রবেশাধিকার না থাকলেও দোকান নিয়ে বসা বিক্রেতাদের মধ্যে পুরুষও রয়েছেন।
মেলার বাইরে দেখা যায়, অনেক পুরুষ দর্শনার্থী অপেক্ষা করছেন। নববধূকে নিয়ে মেলায় এসেছেন তমাল দাস। স্ত্রীকে মেলার ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়ে বাইরে অপেক্ষা করছেন তিনি।
মেলায় আসা সুজাপুর গ্রামের আশা রানী বলেন, ‘এই মেলা আমাদের নারীদের জন্য। ফলে একটা আলাদা অনুভূতি কাজ করে। দূরদূরান্ত থেকে আত্মীয়স্বজনও আসেন এই মেলায়। এখানে অনেকের সঙ্গে দেখা হয়, ভাববিনিময় হয়। মেলা মানেই মিলনস্থল।’
বিউটি সরকার বলেন, ‘আমরা অনেক কিছু কেনাকাটা করলাম। ভালো লাগে এই মেলায় আসতে। কোনো ধরনের সমস্যা হয় না। এক কথায়, অপেক্ষায় থাকি এই মেলার জন্য। তবে আমার স্বামীকে বাইরে রেখে আসতে হয়েছে।’
৮০ বছর বয়সী হরমুজ আলী বলেন, ‘প্রায় ২০ বছর ধরে এই মেলায় হাওয়াই মিঠাই বিক্রি করি। মেলায় দুপুর ২টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত শুধু নারীরা প্রবেশ করতে পারেন। রাতে সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। ছোট পরিসরে হলেও মেলাটির পরিবেশ সুন্দর।’
মেলার প্রধান ফটকে কথা হয় কয়েকজন পুরুষ দর্শনার্থীর সঙ্গে। শিবেন সরকার বলেন, ‘আমার স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে এসেছি। তাদের ভেতরে দিয়ে আমি অপেক্ষা করছি। এখানে আমরা যারা পুরুষ আছি, তারাও বেশ উপভোগ করি এই মেলা। কোনো রকম ঝুট-ঝামেলা নেই।’
সুজাপুর সর্বজনীন দুর্গাপূজা ও বউমেলার সাধারণ সম্পাদক সুজন সরকার বলেন, প্রায় ৭০ বছর ধরে এ বউমেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। জমিদার ক্ষিতীশ সরকার রায়ের সময় চাঁদপাড়ায় এ মেলার আয়োজন করা হতো। তখন দুর্গামন্দিরটিও সেখানে অবস্থিত ছিল। দুর্গাপূজার পাঁচ দিন পর লক্ষ্মীপূজা অনুষ্ঠিত হয়। লক্ষ্মীপূজার পরদিন বসে ঐতিহ্যবাহী এ বউমেলা।
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এ ঐতিহ্য তারা ধরে রেখেছেন। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছেও এ ঐতিহ্য তুলে দিতে চান।
ফুলবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ শহিদুল ইসলাম বলেন, মেলার নিরাপত্তায় সার্বক্ষণিক পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।