ঢাকা বুধবার, ০৭ জানুয়ারি ২০২৬, ২৩ পৌষ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

মাধ্যমিকের বইয়ে এলো ‘হাসিনার পালানো’ ও ‘হেলিকপ্টার থেকে গুলি’

মাধ্যমিকের বইয়ে এলো ‘হাসিনার পালানো’ ও ‘হেলিকপ্টার থেকে গুলি’

মাধ্যমিক শিক্ষাক্রমে এবার যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় ‘২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান’। নতুন পাঠ্যবইগুলোতে কোটা সংস্কার আন্দোলন দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেলিকপ্টার থেকে গুলিবর্ষণ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের হামলা এবং ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন ও দেশত্যাগের ঘটনাপ্রবাহ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

একই সঙ্গে বইয়ের পাতায় ফিরে এসেছে মেজর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণার ইতিহাস।

ইতিহাস, কবিতা ও গদ্যের মাধ্যমে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরা হয়েছে পাঠ্যবইয়ে। সেখানে শেখ হাসিনার ক্ষমতায় উত্থান, সরকারের পতন এবং ভারতে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর পাশাপাশি ১৯৭১-পরবর্তী রাজনৈতিক ইতিহাস যুক্ত করা হয়েছে শিক্ষাক্রমে।

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড থেকে প্রকাশিত এবং শিক্ষার্থীদের বিতরণ করা বই পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত বিভিন্ন বিষয়ের পাঠ্যবইয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সূচনা, আন্দোলন দমনে রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন, শহীদদের আত্মত্যাগ এবং শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনা সরকারের পতনের ঘটনাবলি স্থান পেয়েছে।

বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়, বাংলা সাহিত্য এবং ইংরেজি বইয়ে জুলাই আন্দোলনের রাজনৈতিক, সামাজিক ও মানবিক দিক শিক্ষার্থীদের বয়স ও বোধগম্যতা অনুযায়ী আলাদা অধ্যায় ও পরিচ্ছেদের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে।

ষষ্ঠ শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ের দ্বিতীয় অধ্যায়ের পাঠ–৯ এ ‘বাংলাদেশ সৃষ্টির পটভূমি ও স্বাধীন বাংলাদেশ’ পরিচ্ছেদে মেজর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণার ছবি ও বিবরণ পুনরায় যুক্ত করা হয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে মেজর জিয়া বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং পরদিন ২৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে আবারও স্বাধীনতার ঘোষণা দেন।

দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৬ ডিসেম্বর একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়।

একই বইয়ের পাঠ–১০ এ ‘স্বাধীন বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থান’ শিরোনামে নতুন পরিচ্ছেদ যুক্ত করা হয়েছে। সেখানে ১৯৭৫ সালে বাকশাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একদলীয় শাসন, ১৯৭৯ সালে বহুদলীয় গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন, ১৯৮২ সালে এরশাদের ক্ষমতা দখল এবং স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের ধারাবাহিক বিবরণ দেওয়া হয়েছে। এ পরিচ্ছেদে ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের পাশাপাশি ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

পাঠে শহীদ নূর হোসেনের ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ লেখা ঐতিহাসিক ছবি এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ আবু সাঈদের দুই হাত প্রসারিত করা ছবিও সংযুক্ত করা হয়েছে।

এ অংশে বলা হয়েছে, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল হলে গণতান্ত্রিক কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিরোধী মতের ওপর দমন-পীড়ন, গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, দুর্নীতি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান অকার্যকর করার মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদী শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়।

এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের জুনে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামলে সরকারদলীয় সন্ত্রাসী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সহিংসতা চালায়। ১৬ জুলাই রংপুরে পুলিশের গুলিতে আবু সাঈদ এবং চট্টগ্রামে ওয়াসিম আকরামসহ ছয়জন নিহত হন। এসব ঘটনার পর আন্দোলন দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে এবং একপর্যায়ে শেখ হাসিনার পদত্যাগের একদফা দাবি ওঠে।

শেষ পর্যন্ত ৫ আগস্ট হাজারো শহীদের রক্তের বিনিময়ে শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটে এবং তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। এ আন্দোলনকে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান’ নামে অভিহিত করা হয়েছে।

সপ্তম শ্রেণির বাংলা বই ‘সপ্তবর্ণা’-য় কবিতা অংশে হাসান রোবায়েতের লেখা ‘সিঁথি’ যুক্ত করা হয়েছে। পাঠ-পরিচিতিতে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন ছিল নির্মম ও মর্মন্তুদ হলেও এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে মানুষ নতুন করে মুক্তির স্বাদ পেয়েছে। কবিতায় শিক্ষার্থী ও জনতার আত্মত্যাগ, রক্তপাত এবং দেশের কল্যাণ ও মানুষের মুক্তির প্রত্যয় ফুটে উঠেছে।

একই শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ের প্রথম অধ্যায়ে ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় মেজর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। পরবর্তী পাঠে কোটা সংস্কার আন্দোলনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ঘটনাপ্রবাহ, আন্দোলন দমনে হত্যাকাণ্ড এবং হেলিকপ্টার থেকে গুলিবর্ষণের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

অষ্টম শ্রেণির বাংলা বইয়ের সাহিত্য কণিকায় ‘গণঅভ্যুত্থানের কথা’ শিরোনামের প্রবন্ধে বাংলাদেশের তিনটি বড় গণঅভ্যুত্থানের কথা বলা হয়েছে। সেখানে ১৯৬৯ সালে আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে, ১৯৯০ সালে এরশাদের বিরুদ্ধে এবং ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানের উল্লেখ রয়েছে।

প্রবন্ধে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের আন্দোলনের নেতৃত্ব ছিল শিক্ষার্থীদের হাতে এবং সহস্র মানুষের জীবনের বিনিময়ে এই আন্দোলন সফল হয়।

অষ্টম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের কারণ, পটভূমি ও ফলাফল আলাদা পরিচ্ছেদে তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সশস্ত্র কর্মী এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হামলার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে রংপুরে পুলিশের গুলিতে আবু সাঈদ এবং চট্টগ্রামে ছাত্রলীগের হামলায় ওয়াসিম আকরাম নিহত হওয়ার ঘটনাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

নবম-দশম শ্রেণির ‘বাংলা সাহিত্য’ বইয়ের ‘আমাদের নতুন গৌরবগাথা’ প্রবন্ধে ৫ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরা হয়েছে। এতে কারফিউ উপেক্ষা করে মানুষের রাস্তায় নেমে আসা, ব্যাপক প্রাণহানি এবং সরকারপ্রধানের দেশত্যাগের কথা বলা হয়েছে। প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে, এই গণঅভ্যুত্থান কোনো রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে নয়, বরং শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্য দিয়েই গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়।

এছাড়া নবম-দশম শ্রেণির ইংরেজি বই ‘English For Today’-এর একটি অধ্যায়ে গ্রাফিতির ভূমিকা তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে ১৬ জুলাই রংপুরে পুলিশের গুলিতে নিহত আবু সাঈদের ঘটনা এবং তার মায়ের উক্তি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

পাঠ্যবইয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থান অন্তর্ভুক্ত করার সরকারি উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া ব্যক্তিরা। তাদের মতে, এতে নতুন প্রজন্ম সত্য ইতিহাস জানার সুযোগ পাবে এবং রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের বাস্তবতা আড়াল করার প্রবণতা ভাঙবে।

এনসিটিবি জানিয়েছে, আগামী ১৫ জানুয়ারির মধ্যেই মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের হাতে সব পাঠ্যবই পৌঁছে যাবে।

সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে ৩০ কোটি ২ লাখ ৫৫ হাজারের বেশি পাঠ্যবই মুদ্রণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে এবং মুদ্রণ ও বিতরণ কার্যক্রম চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

‘হেলিকপ্টার থেকে গুলি’,‘হাসিনার পালানো’,মাধ্যমিকের বইয়ে
আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত