ঢাকা সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ৩০ চৈত্র ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

রাবি শিক্ষার্থীদের চোখে পহেলা বৈশাখের নতুন রূপ

রাবি শিক্ষার্থীদের চোখে পহেলা বৈশাখের নতুন রূপ

পহেলা বৈশাখ বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্যের এক উজ্জ্বল ধারক ও বাহক। এটি কেবল একটি উৎসব নয়, বরং বাঙালির সর্বজনীন লোকজ সংস্কৃতির প্রাণস্পন্দন। পুরোনো বছরের সব ভুলত্রুটি, গ্লানি ও হতাশা পেছনে ফেলে নতুন স্বপ্ন ও উদ্যমে পথচলা শুরুর অনন্য দিন এটি।

নতুন বছরের আগমনে নাচ, গান ও উৎসবের আনন্দে মেতে ওঠে সমগ্র বাঙালি জাতি।

পহেলা বৈশাখ মানেই এক সময় ছিল পান্তা-ইলিশের ঘ্রাণ, বৈশাখী মেলার হুল্লোড়, আর লাল-সাদা পোশাকে রঙিন সকাল। আজকের তরুণ প্রজন্ম কীভাবে দেখছে পহেলা বৈশাখকে? শৈশবের সারল্যে মাখা আনন্দ আর এখনকার কর্মব্যস্ত জীবনের মধ্যে কতটা বদলে গেছে বৈশাখ উদযাপনের রূপ?

সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বৈশাখ এখন তরুণ প্রজন্মের চোখে নতুন মাত্রা পেয়েছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) তরুণ শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন, ভাবনা ও অনুভূতির কথা জানা গেছে।

‘নববর্ষ আমাদের শেকড়ের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়’

ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী রানা সরকার বলেন, নববর্ষ বাঙালির ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রাণের উৎসব, যা আমাদের শেকড়ের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। পহেলা বৈশাখকে ঘিরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে যে বর্ণিল আয়োজন, তা সত্যিই অনন্য।

শিল্পীদের রঙ-তুলির ছোঁয়া, নৃত্যশিল্পীদের প্রস্তুতি এবং মঙ্গলশোভাযাত্রার আয়োজন—সব মিলিয়ে পুরো ক্যাম্পাসে তৈরি হয়েছে এক উৎসবমুখর পরিবেশ।

তিনি আরও বলেন, পান্তা-ইলিশ, মাটির শিল্প আর বৈশাখী সাজে সজ্জিত ক্যাম্পাস তাকে নতুন এক অনুভূতির স্বাদ দিচ্ছে।

রানা সরকার বলেন, কৃষ্ণচূড়া আর জারুলের রঙে রাঙানো এই ক্যাম্পাস যেন প্রকৃতির নিজস্ব উৎসবমঞ্চ। এমন সৌন্দর্যের মাঝে দাঁড়িয়ে মনে হয়, এই ঐতিহ্য ও আনন্দের ধারা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ুক, আর নববর্ষ বয়ে আনুক সবার জীবনে নতুন আশা ও একতার মেলবন্ধন।

‘বৈশাখ আমাদের ঐতিহ্যের ধারক’

রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী জান্নাতুল নাইম বলেন, পহেলা বৈশাখ বাঙালির সর্বজনীন লোকউৎসব, যার সূচনা মোগল সম্রাট আকবরের আমলে কৃষকদের সুবিধার্থে প্রবর্তিত ফসলি সন থেকে। এই দিনটি বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনা, ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।

তিনি বলেন, ‘এসো হে বৈশাখ’ আহ্বানের মধ্য দিয়ে দিনটি শুরু হয় নতুন আশায়। পান্তা-ইলিশ, বৈশাখী মেলা ও মঙ্গল শোভাযাত্রায় মুখর হয়ে ওঠে চারদিক; ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই অংশ নেয় এই উৎসবে।

শৈশবের স্মৃতিচারণ করে তিনি জানান, লাল-সাদা পোশাকে সেজে মেলায় ঘোরা ও নানা শখের সামগ্রী কেনার আনন্দ এখনও তাকে নাড়া দেয়। তিনি প্রত্যাশা ব্যক্ত করে বলেন, নতুন বছর পুরোনো সব গ্লানি মুছে সবার জীবনে সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি বয়ে আনুক। একই সঙ্গে বাঙালিয়ানার এই উৎসব যেন নিরাপদ ও শুদ্ধ ধারায় উদযাপিত হয়—এটাই প্রত্যাশা।

‘পহেলা বৈশাখ নতুন স্বপ্ন ও ঐক্যের বার্তাবাহক’

বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী জবা রানী রায় আশা বলেন, “পহেলা বৈশাখ আমার কাছে শুধু একটি উৎসব নয়, এটি নতুন করে শুরু করার এক প্রতীক। এই দিনটি আমাদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও আবেগের এক অনন্য মিলনমেলা। লাল-সাদা পোশাক, গান-নৃত্য, মঙ্গল শোভাযাত্রা ও বৈশাখী মেলার মধ্য দিয়ে আমরা নতুন বছরকে বরণ করি।

তিনি আরও বলেন, পান্তা-ইলিশসহ ঐতিহ্যবাহী খাবার এই আনন্দকে আরও বাড়িয়ে তোলে। সবচেয়ে বড় কথা, এই উৎসবের সার্বজনীনতা—ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই একসঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করি। আমার কাছে বৈশাখ মানে নতুন স্বপ্ন দেখা, পুরোনো গ্লানি ভুলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা।”

‘নতুন বছরের অঙ্গীকার’

রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী শাকিব আল মাহমুদ বলেন, ‘নববর্ষ কথাটি শুনলে মনে জেগে ওঠে নতুনত্ব। পহেলা বৈশাখ বাঙালির এক নতুন অধ্যায়; নতুন ধানের চাল, নতুন পোশাক ও হালখাতা—পুরোনো সকল হিসেব চুকে অভিনবভাবে পথ চলা। নতুন বছর আমাদের কাছে এক বিশেষ বার্তা বয়ে আনে। দুঃখ-কষ্ট-বেদনা ভুলে সকলে এক বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার অঙ্গীকার।

কিন্তু সময় পরিক্রমায় নববর্ষে সেই ঘ্রাণ পাওয়া যায় না। চারদিকে আধুনিকতার ছোঁয়া। নববর্ষের নামে ব্যান্ড পার্টি, গেট টুগেদার—মঙ্গল শোভাযাত্রায় অরাজকতা-অশ্লীলতা; বরং বর্ষবরণে চলে পশ্চিমা সংস্কৃতি। আফসোস, এরকম সংস্কৃতি বাঙালির জন্য নয়।

তিনি আরও বলেন, বাঙালি সংস্কৃতি হলো আপন মনে গেঁথে যাওয়া কাঁথার মতো, যেখানে নেই কোনো অপসংস্কৃতি—আছে শুধু মায়া। সকলে মিলে দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য তুলে ধরা। শৈশবের সোনালি দিনের মতো নববর্ষ হোক বাঙালির রঙিন; সেখানে না থাকুক কোনো অশালীনতা। “বছর ঘুরে আসুক বর্ষ, বাঙালি হোক এক আলোকবর্ষ”—এই তাৎপর্যকে কেন্দ্র করে সবার নতুন বছর সমৃদ্ধিতে কাটুক।’

সময়ের সঙ্গে পাল্টেছে বৈশাখের অনুভব। কর্মব্যস্ত জীবনে এখন বৈশাখ কেবল ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ মাত্র। পান্তা-ইলিশের ঐতিহ্য স্থান করে নিয়েছে রেস্তোরাঁর মেনুতে বা টেলিভিশনের পর্দায়। মেলার জায়গা দখল করেছে অনলাইন শপিং, আর লাল-সাদা পোশাককে প্রতিস্থাপন করেছে অফিসের ড্রেসকোড।

আজকের বৈশাখ মানে ক্যামেরার সামনে হাসিমুখে তোলা ছবি, ফেসবুকে ‘শুভ নববর্ষ’ লেখা স্ট্যাটাস, আর সাজসজ্জার এক কৃত্রিম প্রতিযোগিতা। কিন্তু মন জানে, সেই ছবিগুলোতে শৈশবের খুশির রং নেই। এখন পহেলা বৈশাখ আসে, কিন্তু মন আর শিশুর মতো লাফিয়ে ওঠে না।

শহরের কোলাহলে হারিয়ে গেছে পাড়ার ঢাকির শব্দ, মেলার মুখরতা আর সেই প্রাণখোলা হাসিগুলো।

পহেলা বৈশাখ,রাবি শিক্ষার্থী
আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত