
বৈশাখ মানেই বাঙালির প্রাণের উৎসব। বাংলা নববর্ষের প্রথম মাস বৈশাখ শুধু ঋতুর পরিবর্তন নয়, এটি বাঙালির আবেগ, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ। প্রকৃতিতে আসে নতুন রূপ, গাছে গাছে নতুন পাতার উচ্ছ্বাস, আর মানুষের জীবনে উৎসবের আমেজ।
বৈশাখকে ঘিরে পান্তা-ইলিশের আয়োজন যেন দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক প্রতীক হয়ে উঠেছে। যদিও সবার ভাগ্যে পান্তা-ইলিশ জোটে না, তবুও মানুষ সাধ্যমতো তরমুজ, নানা দেশীয় খাবার এবং সাংস্কৃতিক আয়োজনের মধ্য দিয়ে নববর্ষকে বরণ করে নেয়।
এই বৈশাখেই প্রকাশিত হয়েছে কবি, লেখক ও গবেষক মো. হাবিবুর রহমানের নতুন গ্রন্থ “টেল অব হিলশা এন্ড এ বয়”। ইলিশ, নদী, জীবনসংগ্রাম এবং এক কিশোরের স্বপ্নকে কেন্দ্র করে রচিত এই বইটি বৈশাখের আবহে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তাই আজকের আয়োজন “ইলিশ ও এক বালকের গল্প”—এই বইটির পাঠ-অনুভব।
বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে বৈশাখ এবং ইলিশের গুরুত্ব বহুদিনের। ‘অগ্নিবীণা’ কাব্যগ্রন্থের ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতায় কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন—
“ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কাল-বৈশাখীর ঝড়,
তোরা সব জয়ধ্বনি কর।”অন্যদিকে ইলিশকে ঘিরে সাহিত্যেও রয়েছে রস-রসিকতার সমৃদ্ধ ভাণ্ডার। সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত ইলিশ বন্দনায় লিখেছিলেন—
“হালকা হাওয়ায় মেঘের ছাওয়ায়
ইলশেগুঁড়ির নাচ;
ইলশেগুঁড়ির নাচন দেখে
নাচছে ইলিশ মাছ।”ইলিশ একসময় সাধারণ মানুষের নাগালের মাছ হলেও এখন তার দাম আকাশচুম্বী। তবুও ইলিশ বাঙালির হৃদয়ে আজও আবেগের নাম।
“টেল অব হিলশা এন্ড এ বয়” গ্রন্থটি বাংলাদেশের অন্যতম প্রশস্ত, দীর্ঘ এবং প্রধান নদী মেঘনার দ্বীপে বসবাসরত একটি পরিবারের জীবনসংগ্রাম, স্বপ্ন, রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা এবং বিয়োগান্ত বাস্তবতার গল্প। উপন্যাসটির কেন্দ্রীয় চরিত্র মুসতাকিম খালেদ—এক কিশোর, যে ইলিশ মাছ খুব পছন্দ করে। অল্প বয়সেই পিতৃহারা এই ছেলেটি শুধু পড়াশোনাই করে না, অবসরে মাছ ধরে এবং পরিবারের অর্থনৈতিক দায়িত্বেও পাশে দাঁড়ায়।
যেখানে সাধারণত পরিবার সন্তানের পাশে থাকে, সেখানে খালেদ নিজেই হয়ে ওঠে পরিবারের সহায়ক শক্তি। তার মা আয়েশা আমিরা তার একমাত্র ভরসা। মায়ের অনুপ্রেরণা এবং শিক্ষকদের উৎসাহে খালেদের মধ্যে বিজ্ঞান, উদ্ভাবন ও আধুনিক প্রযুক্তি সম্পর্কে গভীর আগ্রহ তৈরি হয়।
এই উপন্যাসে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। জ্ঞান, বিতর্ক, শেখার আগ্রহ এবং চিন্তার বিকাশ—এসব বিষয় গল্পকে শুধু কিশোর উপন্যাসের গণ্ডিতে আটকে রাখেনি, বরং পাঠকের জন্য এক চিন্তার জগৎ তৈরি করেছে।
উপন্যাসের অন্যতম আকর্ষণীয় চরিত্র সালাউদ্দিন। তার উপস্থিতি গল্পে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। পাশাপাশি পশু-পাখির প্রতি খালেদের ভালোবাসা, খুনসুটি, প্রকৃতির সঙ্গে তার সম্পর্ক এবং পরিবেশ ও প্রাণীসম্পদের প্রতি মানুষের দায়িত্ব অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহীভাবে উপস্থাপিত হয়েছে।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো—বাংলাদেশের নদ-নদীর বর্তমান জীর্ণ দশা, পানি সম্পদের সংকট এবং পরিবেশের প্রতি মানুষের নির্মম আচরণ এই বইয়ের পরতে পরতে উঠে এসেছে। বইটি পড়লে পাঠক নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য হবে—নদী শুধু প্রকৃতি নয়, এটি একটি সভ্যতার অস্তিত্ব।
গ্রন্থটিতে নদ-নদী, প্রকৃতির নকশাসহ বেশ কিছু চিত্র সংযোজন করা হয়েছে, যা পাঠকের ভাবনার পরিসরকে আরও বিস্তৃত করে। প্রতিটি ছবির মধ্যেই রয়েছে একেকটি বার্তা, যা শিশু, কিশোর ও তরুণদের আলোকিত করতে সক্ষম।
মো. হাবিবুর রহমান রচিত “টেল অব হিলশা এন্ড এ বয়” প্রকাশ করেছে দ্য রিজিওনাল রিপোর্টিং সোসাইটি (TRRS)। গ্রন্থটির সম্পাদক ফররুখ খসরু। বইটির শুভেচ্ছা মূল্য ৪০০ টাকা। এটি দেশের বিভিন্ন গ্রন্থাগার, বইয়ের দোকান, রকমারি এবং অ্যামাজন-এ পাওয়া যাচ্ছে।
বইটি স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সহায়ক পাঠ্য কিংবা পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত করা গেলে ইলিশ, নদী এবং পরিবেশ সম্পর্কে নতুন প্রজন্মের সচেতনতা বাড়বে। একটি সমৃদ্ধ, নদীমাতৃক এবং পরিবেশবান্ধব বাংলাদেশ গঠনে এমন সাহিত্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ বিষয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) এবং শিক্ষানীতি বিশেষজ্ঞদেরও গুরুত্বসহকারে ভাবা উচিত।
বৈশাখের আবহে ইলিশের গল্প নতুন কিছু নয়, কিন্তু “টেল অব হিলশা এন্ড এ বয়” সেই পরিচিত গল্পকে নতুন চোখে দেখার সুযোগ করে দেয়। এটি শুধু একটি কিশোর উপন্যাস নয়, বরং নদী, প্রকৃতি, সংগ্রাম এবং ভবিষ্যতের বাংলাদেশের এক জীবন্ত দলিল।