
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) বাংলা বিভাগে নিয়মবহির্ভূতভাবে অতিরিক্ত শিক্ষক নিয়োগের অভিযোগে ওই নিয়োগ বাতিলের সুপারিশ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। একই সঙ্গে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকের বেতন-ভাতাসহ এ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় তহবিল থেকে দেওয়া অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে কমিশন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মূল বাজেট অ্যাসেসমেন্ট শেষে ইউজিসির প্রতিবেদনে এসব অনিয়মের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনায় মোট ২৯টি গুরুতর পর্যবেক্ষণ বা অনিয়ম চিহ্নিত করা হয়। এর মধ্যে প্রথম ক্রমিকেই রয়েছে বাংলা বিভাগের শিক্ষক নিয়োগসংক্রান্ত অনিয়মটি।
ইউজিসির বাজেট অ্যাসেসমেন্ট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিয়মবহির্ভূতভাবে দুইজন স্থায়ী প্রভাষক নিয়োগ দিয়েছে। এর ফলে বছরে প্রায় ২ লাখ ৭৭ হাজার টাকা অননুমোদিত আর্থিক ব্যয়ের সৃষ্টি হয়েছে। নিয়মবহির্ভূত হওয়ায় এ খাতে ইউজিসি কোনো বাজেট বরাদ্দ রাখেনি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, অনিয়মের বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার তাগাদা দেওয়া হলেও দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এ বিষয়ে ইউজিসির পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ম্যানেজমেন্ট বিভাগে নিজেদের বক্তব্য পাঠায়। এরপরও ১৫ জুন ইউজিসি বিষয়টি পুনরায় তুলে ধরে।
ইউজিসির চূড়ান্ত সুপারিশে নিয়মবহির্ভূত অতিরিক্ত শিক্ষক নিয়োগ অবিলম্বে বাতিল করার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি এ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের বিশ্ববিদ্যালয় তহবিল থেকে দেওয়া অর্থ ও বেতন-ভাতা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত আদায় করে কমিশনকে দ্রুত অবহিত করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট নিয়োগের নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ওই নিয়োগ বোর্ডে মেধাক্রমে ৪৭তম অবস্থানে থাকা একজন প্রার্থীকে বাংলা বিভাগের প্রভাষক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়।
নিয়োগ পাওয়া প্রভাষক মনির হোসেনের অনার্সে সিজিপিএ ৩.৩৪ এবং মাস্টার্সে ৩.৬১। নিয়োগের জন্য আবেদন করা অন্তত ৪৬ জন প্রার্থীর অনার্স ও মাস্টার্সের ফলাফল তার চেয়ে বেশি ছিল বলে নথিপত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে।
এ ছাড়া নিয়োগ প্রক্রিয়ায় এমফিল, পিএইচডি এবং বিদেশি ডিগ্রিধারী প্রার্থীদের কৌশলে বাদ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
নিয়োগসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২৪ সালের ২৩ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বাংলা বিভাগে একজন প্রভাষক এবং একজন সহকারী অধ্যাপক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। বিজ্ঞপ্তিতে অনুমোদিত পদের সংখ্যা ছিল দুটি।
তবে ওই নিয়োগ বোর্ডে বাংলা বিভাগে দুইজন প্রভাষক ও একজন সহকারী অধ্যাপকসহ মোট তিনজনকে নিয়োগ দেওয়া হয় বলে নথিপত্রে দেখা যায়। অর্থাৎ অনুমোদিত পদের চেয়ে একজন অতিরিক্ত প্রভাষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যে মনির হোসেন ২০২৪ সালের ২১ মে প্রকাশিত শিক্ষক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে আবেদন করেছিলেন। পরে সহকারী অধ্যাপকের পদ যুক্ত করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পুনরায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে।
ইউজিসির বাজেট অ্যাসেসমেন্ট প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালের ১৬ ও ১৭ নভেম্বর কমিশনের একটি দল বেরোবিতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মূল বাজেট অ্যাসেসমেন্টের কাজ সম্পন্ন করে। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় ২৯টি গুরুতর পর্যবেক্ষণ বা অনিয়ম চিহ্নিত করা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউজিসির নির্দেশনা অনুযায়ী এসব পর্যবেক্ষণ নিষ্পত্তি না করায় বিশ্ববিদ্যালয়ের চাহিদা অনুযায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মূল বাজেটের কয়েকটি খাতের বরাদ্দ বাতিল বা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ইউজিসি জানিয়েছে, ভবিষ্যতে প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ পাওয়ার স্বার্থে ২৯টি পর্যবেক্ষণ দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে। অন্যথায় বিশ্ববিদ্যালয়ের চাহিদার সঙ্গে কমিশনের বরাদ্দের ব্যবধান আরও বাড়বে এবং এর দায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকেই নিতে হবে।
এ বিষয়ে কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. নিতাই কুমার ঘোষ বলেন, ‘আমার কাছে এ বিষয়ে কোনো এভিডেন্স নেই। তাই আমি এখন কোনো মন্তব্য করতে চাচ্ছি না।’
অন্যদিকে অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. মো. ফেরদৌস রহমান বলেন, ‘বিষয়টা এমন ছিল না। দুইটা বিজ্ঞপ্তিতে দুইটা নিয়োগ হয়েছে। আমরা ইউজিসিকে উত্তর দিয়েছি। বিষয়টি সময় নিয়ে আমরা তোমাদের উত্তর দেব। দুইটা বিজ্ঞপ্তি দুটো ভিন্ন সময়ে হয়েছিল।’
দুটি ভিন্ন সময়ে বিজ্ঞপ্তি হয়ে থাকলে ইউজিসি কেন বিষয়টিকে অনিয়ম হিসেবে উল্লেখ করেছে, জানতে চাইলে রেজিস্ট্রার বলেন, ‘আমরা ইউজিসি থেকে যে টিম এসেছিল, তারা হয়তো বিষয়টি জানত না।’
তবে ইউজিসির চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বিষয়টিকে নিয়মবহির্ভূত অতিরিক্ত নিয়োগ হিসেবে উল্লেখ করে তা বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছে।