
ভাইয়ের অপারেশন শেষে পরদিনের ক্লাসে যোগ দিতে জরুরি ভিত্তিতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ফিরছিলেন ইংরেজি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আসিফ। ট্রেনের টিকিট না পেয়ে বন্ধুর স্ট্যান্ডিং টিকিটে যাত্রা করে রাজশাহী রেলস্টেশনে পৌঁছান তিনি। স্টেশন থেকে বের হওয়ার সময় রেলওয়ের আনসার সদস্যদের সঙ্গে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে তাকে ধাক্কা দেওয়া, কলার ধরে টানাটানি এবং পরে কয়েকজন মিলে মারধর করার অভিযোগ করেছেন তিনি।
আসিফের আরও অভিযোগ, পরে তাঁকে একটি কক্ষে নিয়ে গিয়ে লাথি ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়। গতকাল রাতে ‘কী হয়েছিল রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে’—ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে নিজের ওপর ঘটে যাওয়া নির্যাতনের কথা তুলে ধরেন তিনি।
আসিফ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুজ্জোহা হলের আবাসিক শিক্ষার্থী। ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, “আমার ভাইয়ের অপারেশন শেষ করে আমাকে দ্রুত ক্যাম্পাসে ফিরতে হচ্ছিল। কারণ পরদিন আমার ক্লাস ছিল। এর আগ থেকেই আমি টিকিটের খোঁজ করছিলাম। টিকিট কাউন্টারে গিয়ে জানতে পারি, কোনো স্ট্যান্ডিং টিকিটও পাওয়া যাচ্ছে না।”
তিনি বলেন, “এর মধ্যে আমার এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা হয়। তার কাছে একটি স্ট্যান্ডিং টিকিট ছিল। যেহেতু আমার যাওয়া খুব জরুরি ছিল, তাই বন্ধুর সঙ্গে কথা বলে আমি ওই টিকিটের মাধ্যমে যাত্রা করি।”
আসিফের ভাষ্য, গন্তব্যে পৌঁছানোর পর স্টেশন থেকে বের হওয়ার সময় প্রথমে কোনো আনসার সদস্য তাঁকে কিছু বলেননি। পরে গেট পার হয়ে যাওয়ার পর কয়েকজন আনসার সদস্য তাঁকে ডাকতে থাকেন।
তিনি বলেন, “আমি গেট দিয়ে বের হয়ে যাওয়ার পর আনসার সদস্যরা আমাকে কয়েকবার ডাকেন। কিন্তু ততক্ষণে আমি গেট পার হয়ে চলে যাচ্ছিলাম। আমার বন্ধু তখন আমাকে ডাকছিল এবং টেক্সটও করছিল।”
আসিফ অভিযোগ করেন, “এরপর একজন আনসার সদস্য পেছন থেকে আমাকে ধাক্কা দিয়ে বলেন, ‘ডাকছি—শুনতে পাচ্ছ না কেন?’ এরপর আমাকে পাশে নিয়ে গিয়ে আমার কলার ধরেন। তখন আমি বলি, আপনি স্যার হন বা যে-ই হন, আমার গায়ে হাত দেওয়ার অধিকার আপনার নেই।”
তিনি আরও বলেন, “এ সময় তিনি আমাকে চাকরি চলে যাওয়ার হুমকি দেন। আমার কলার ধরে টানাটানি করেন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে গেলে আমি নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করি। সেই সময় অনিচ্ছাকৃতভাবে তাঁর কলারেও আমার হাত লাগে। তাঁকে আঘাত করার কোনো উদ্দেশ্য আমার ছিল না।”
এরপর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বলে দাবি করেন আসিফ। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ওই আনসার সদস্য আরও কয়েকজনকে নিয়ে তাঁদের দিকে এগিয়ে আসেন।
আসিফ বলেন, “প্ল্যাটফর্মের ভেতরে নিয়ে যাওয়ার সময় আমাদের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়। পরে আরও কয়েকজন লোকাল ছেলে সেখানে যোগ দেয়। একপর্যায়ে আমাদের ওপর মারধর শুরু হয়।”
মারধরের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, “আমার শার্ট ছিঁড়ে যায়, ব্যাগ ছিঁড়ে যায়। এরপর আমি মাটিতে পড়ে যাই। তখন তিনজন আমাকে ধরে টেনে স্টেশনের একটি কক্ষে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। একজন সামনে, একজন পেছনে এবং আরেকজন আমার কলার ধরে টানছিল।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, “আমি ওই কক্ষে যেতে চাইছিলাম না। তখন আমাকে ফেলে দিয়ে মারধর করা হয়। লাথি মারা হয়। একপর্যায়ে আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি। পরে আমাকে দুইজন ধরে একটি হাজতসদৃশ কক্ষে নিয়ে যায়।”
আসিফের অভিযোগ, ওই কক্ষেও তাঁকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়। তিনি বলেন, “সেখানেও আমাকে বুট পরা অবস্থায় লাথি ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করা হয়। আমার কাছে থাকা ফোনও নিয়ে নেওয়া হয়। এ সময় আমাদের সঙ্গে গালাগাল ও দুর্ব্যবহারের ঘটনা ঘটে।”
পরে কয়েকজন সাংবাদিক ঘটনাস্থলে এসে বিষয়টি জানতে পারেন বলে জানান আসিফ। তাঁর ভাষ্য, সাংবাদিকরা তাঁদের বের করে দেওয়ার কথা বলার পর তাঁরা সেখান থেকে বের হতে সক্ষম হন।
আসিফ বলেন, “সাংবাদিক ভাইয়েরা এসে আমাদের বের করার কথা বলার পর আমরা সেখান থেকে বের হতে পারি। পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আমরা সেখান থেকে চলে আসি।”
ঘটনার বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়ে আসিফ বলেন, “আমি শুধু চাই, পুরো ঘটনাটি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হোক। আমি কীভাবে সেখানে গিয়েছিলাম, টিকিটের বিষয়টি কী ছিল, এরপর কীভাবে আমাকে ধাক্কা দেওয়া ও কলার ধরা হলো এবং পরে কীভাবে মারধরের ঘটনা ঘটল—সবকিছু তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া দরকার।”
বাংলাদেশ রেলওয়ের ওয়েবসাইটে টিকিট ক্রয় ও যাত্রা সংক্রান্ত বিভিন্ন নিয়ম ও নির্দেশনা প্রকাশ করা হয়েছে। যাত্রীসেবা সংক্রান্ত তথ্যের জন্য রেলওয়ের ১৩১ নম্বরে যোগাযোগের কথাও উল্লেখ রয়েছে।
তবে শিক্ষার্থী আসিফের করা অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আনসার সদস্য বা রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মাহবুবর রহমান বলেন, “আমাদের শিক্ষার্থীরা ঘরে ফিরে এসেছে। কেন এমন হয়েছে, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের কোথায় ঘাটতি ছিল—এগুলো খুঁজলেই পাওয়া যাবে।” আপাতত পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে বলেও জানান তিনি।