অনলাইন সংস্করণ
২১:০৫, ১৪ জুলাই, ২০২৬
দুই দশকের বেশি সময় বিচারিক দায়িত্ব পালনের পর অবসরে গেলেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম।
আজ প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ বেঞ্চে বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলামের বিদায় সংবর্ধনা বক্তব্য উপস্থাপন করেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির পক্ষ থেকে সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন।
এসময় আপিল বিভাগের বিচারপতি ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীরা উপস্থিত ছিলেন।
বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম তার বিদায় সংবর্ধনায় বলেন, আমি একটি কথা বিশেষভাবে বলতে চাই। বিচার বিভাগ শুধু বিচারকদের নয়। শুধু আইনজীবীদেরও নয়। এই বিচার বিভাগ আমাদের সবার। বিচারক, আইনজীবী, কর্মকর্তা-কর্মচারী-আমরা সবাই এই প্রতিষ্ঠানের অংশ। আমরা যদি সবাই বিচার বিভাগকে নিজের প্রতিষ্ঠান বলে মনে করি, তাহলে এই প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা, স্বাধীনতা এবং জনগণের আস্থা আরও সুদৃঢ় হবে। বিচার বিভাগের শক্তি একা কোনো বিচারকের শক্তি নয়, একা কোনো আইনজীবীরও নয়। এটি আমাদের সবার সম্মিলিত প্রয়াসের ফল। তাই ভবিষ্যতেও বিচার বিভাগের কল্যাণে বার ও বেঞ্চ একসঙ্গে কাজ করবে-এই প্রত্যাশা করি।
বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম বলেন, আমাদের সংবিধান শুধু রাষ্ট্র পরিচালনার দলিল নয়। এটি আমাদের স্বাধীনতার চেতনা, গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার এবং মানুষের মর্যাদা রক্ষার অঙ্গীকার। বিচার বিভাগের দায়িত্ব সেই অঙ্গীকারকে সমুন্নত রাখা। একজন বিচারকের আনুগত্য কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা ক্ষমতার প্রতি নয়। তার আনুগত্য সংবিধানের প্রতি, আইনের প্রতি এবং নিজের বিবেকের প্রতি।
নবীন আইনজ্ঞদের উদ্দেশ্যে বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম বলেন, একজন আইনজ্ঞের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার সততা। এরপর তার চরিত্র। আর তারপর তার অধ্যয়ন। আইন প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। নতুন নতুন প্রশ্ন সামনে আসছে। আইনজ্ঞ হতে গেলে শেখার কোনো শেষ নেই। তাই নিয়মিত পড়তে হবে। সংবিধান পড়তে হবে। আইন পড়তে হবে। দেশি-বিদেশি রায় পড়তে হবে। বিচারতত্ত্ব জানতে হবে। যত বেশি পড়বেন, তত বেশি সমৃদ্ধ হবেন। বই হাতের কাছে না পেলে প্রয়োজনে তথ্যপ্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে অনলাইনেই পড়ে ফেলতে হবে। আমাদের বিচার বিভাগের সামনে আগামী দিনে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ আসবে। মামলার জট কমাতে হবে। বিচারকে আরও দ্রুত ও কার্যকর করতে হবে। মানুষের প্রত্যাশাও অনেক বেড়েছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হলে বিচার বিভাগকে আরও দক্ষ, আরও আধুনিক এবং আরও সেবামুখী হতে হবে। বিচার শুধু প্রতিষ্ঠিত হলেই যথেষ্ট নয়; মানুষকেও তা দেখতে হবে এবং বিশ্বাস করতে হবে যে বিচার হয়েছে। বিচার বিভাগের সবচেয়ে বড় শক্তি জনগণের আস্থা। সেই আস্থা রক্ষা করাই আমাদের সর্বোচ্চ দায়িত্ব। আমি বিশ্বাস করি, বিচক্ষণভাবে প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বিচার বিভাগের দক্ষতা বাড়াবে, মানুষের ভোগান্তি কমাবে এবং ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার আরও সহজ করবে। এর ফলে বিচার বিভাগের প্রতি মানুষের আস্থা ও গ্রহণযোগ্যতাও আরও বৃদ্ধি পাবে।
পরিশেষে বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম বলেন, আমি আজ বিদায় নিচ্ছি বিচারকের আসন থেকে, কিন্তু ন্যায়ের আদর্শ থেকে নয়। সংবিধানের প্রতি আমার আনুগত্য, আইনের শাসনের প্রতি আমার বিশ্বাস এবং এই মহান প্রজাতন্ত্রের প্রতি আমার অঙ্গীকার আজীবন অক্ষুণ্ন থাকবে।
বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম ২০০৩ সালের ২৭ আগস্ট হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত বিচারক হিসেবে নিয়োগ পান। দুই বছর পর ২০০৫ সালের ২৭ আগস্ট তিনি হাইকোর্ট বিভাগের স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান। ২০২২ সালের ৮ ডিসেম্বর আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে শপথ নেন।