
শিক্ষা মানুষের মনন, চিন্তাচেতনা, মূল্যবোধ ও ব্যক্তিত্ব গঠনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। ব্যক্তি, সমাজ এবং রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন ও পুনর্গঠনে শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম; তবে সেই শিক্ষা হতে হবে সুশিক্ষা, যা জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি নৈতিকতা, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধের বিকাশ ঘটায়। মানবসমাজে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য মানুষ জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে নানা ধরনের জ্ঞান, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা অর্জন করে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে শিক্ষা। পরিবার শিশুর প্রাথমিক মানসিক ও নৈতিক বিকাশে মুখ্য ভূমিকা পালন করলেও তার বুদ্ধিবৃত্তিক, সামাজিক ও আচরণগত বিকাশের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা অপরিহার্য।
অবশ্য কেবল বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকলেই যে একজন শিক্ষার্থী প্রকৃত জ্ঞানী হয়ে উঠবে, কিংবা বিদ্যালয়ের বাইরে থাকলেই যে সে ব্যর্থ হবে—এমন ধারণা সঠিক নয়। তবুও বিদ্যালয়, মক্তব কিংবা অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই সাধারণত একটি শিশুর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবনের সূচনা ঘটায় এবং পর্যায়ক্রমে তাকে মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক, বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন স্তরে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে।
শিক্ষাজীবনে সাফল্য সমাজে স্বীকৃতি ও উৎসাহ এনে দেয়, আর ব্যর্থতা প্রায়শই সমালোচনার জন্ম দেয়। তবে শিক্ষা কেবল পরীক্ষার ফলাফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি একটি ধারাবাহিক জীবনব্যাপী প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি নতুন জ্ঞান, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা অর্জন করে নিজের ক্যারিয়ার এবং ব্যক্তিগত বিকাশের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।
বিভিন্ন রাষ্ট্র ও সমাজের ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার ভিত্তিতে শিক্ষাব্যবস্থার স্তর, কাঠামো ও বিন্যাসে ভিন্নতা পরিলক্ষিত হলেও এর মৌলিক উদ্দেশ্য একই—সুশিক্ষার মাধ্যমে দক্ষ, সৃজনশীল ও দায়িত্বশীল মানবসম্পদ গড়ে তোলা।
বাংলার শিক্ষাব্যবস্থার দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ ঐতিহ্য থাকলেও এর বর্তমান রূপ নিয়ে আলোচনা ও সমালোচনা উভয়ই বিদ্যমান। শিক্ষার বিস্তারে বিভিন্ন সময়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হলেও দেশের সংস্কৃতি, মূল্যবোধ, সামাজিক বাস্তবতা এবং জাতীয় প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি পূর্ণাঙ্গ ও মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থা এখনো পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বাংলার বিভিন্ন শাসনামলে ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল এবং প্রতিটি শাসনপর্বই শিক্ষা সম্প্রসারণে স্ব স্ব অবদান রেখেছে। বিশেষ করে সুলতানি আমলে শিক্ষা বিস্তার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়।
এ প্রসঙ্গে ড. আবু নোমান (২০২৪) তাঁর *সুলতানি আমলে বাংলার শিক্ষাব্যবস্থা* গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, বাংলায় মুসলিম শাসনের সূচনা থেকে রাজধানী লাখনাবতীসহ বিভিন্ন শহর ও জনপদে অসংখ্য মাদ্রাসা এবং অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, যেখানে শিক্ষার্থীদের আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে শিক্ষা প্রদান করা হতো। বাংলায় মুসলিম শাসনের অগ্রদূত বখতিয়ার খলজির সময় থেকে শুরু করে শেষ সুলতানের শাসনকাল পর্যন্ত অসংখ্য মসজিদ, মাদ্রাসা ও খানকাহ প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক তথ্য পাওয়া যায়, যা সে সময়ের শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার বিস্তৃত পরিসরের সাক্ষ্য বহন করে।
পরবর্তী শাসনামলগুলোতেও শিক্ষা সম্প্রসারণের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে এবং সময়ের চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। ফলে বাংলার শিক্ষাব্যবস্থার ইতিহাস কেবল একটি ধারাবাহিক শিক্ষাবিস্তারের ইতিহাসই নয়, বরং এটি সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
শিক্ষা ও পাঠদানকে কীভাবে অধিকতর প্রফুল্ল, কার্যকর ও শিক্ষার্থীবান্ধব করা যায়—এ প্রশ্নটি প্রাচীনকাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত শিক্ষাবিদ, দার্শনিক ও নীতিনির্ধারকদের আলোচনার অন্যতম বিষয়। যুগে যুগে সমাজ, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রের প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষণ-কৌশলের পরিবর্তন ঘটেছে। বর্তমান বিশ্বে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলো শিক্ষাকে অধিকতর আনন্দময়, অংশগ্রহণমূলক, দক্ষতাভিত্তিক এবং শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক করে তোলার লক্ষ্যে বিভিন্ন উদ্ভাবনী পদ্ধতি গ্রহণ করেছে। তবে আনন্দময় শিক্ষার ধারণা আধুনিক যুগের সৃষ্টি নয়; এর দার্শনিক ভিত্তি বহু প্রাচীন।
এ প্রসঙ্গে সরদার ফজলুল করিম অনূদিত প্লেটোর *রিপাবলিক* (১৯৭৪) গ্রন্থে সক্রেটিসের জ্ঞানতত্ত্বের আলোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, প্রকৃত জ্ঞান অর্জনের জন্য মানুষের চিন্তা ও বোধের বিকাশ অপরিহার্য। সক্রেটিস জ্ঞানের চারটি স্তর—জ্ঞান, বোধ, ধারণা ও ভ্রম—চিহ্নিত করে দেখিয়েছেন যে, সত্যজ্ঞান অর্জনই শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য এবং দার্শনিকের সাধনা হওয়া উচিত সেই সত্যের অনুসন্ধান।
প্লেটো শিক্ষাকে ধাপে ধাপে বিকাশমান একটি প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন, যেখানে প্রতিটি স্তরের লক্ষ্য ও পাঠ্যবিষয় বয়স ও মানসিক পরিপক্বতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাঁর মতে, জন্ম থেকে ১৮ বছর পর্যন্ত শিক্ষার প্রধান উপাদান হবে সাহিত্য, সঙ্গীত এবং প্রাথমিক গণিত; তবে এই শিক্ষা অবশ্যই আনন্দময় হতে হবে। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, জোরপূর্বক শিক্ষা কখনোই শিক্ষার্থীর মনের প্রকৃত বিকাশ ঘটাতে পারে না। তাই শৈশবের শিক্ষা এমনভাবে পরিচালিত হওয়া উচিত, যাতে শিক্ষার্থীরা আনন্দের সঙ্গে শেখে এবং তাদের স্বাভাবিক প্রতিভা, আগ্রহ ও সৃজনশীলতা বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায়।
পরবর্তী পর্যায়ে, অর্থাৎ ১৮ থেকে ২০ বছর বয়সে শরীরচর্চা ও সামরিক প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে, যাতে শারীরিক সক্ষমতা, শৃঙ্খলা ও মানসিক দৃঢ়তা গড়ে ওঠে। এরপর ২০ থেকে ৩০ বছর বয়সে যোগ্য শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চতর গণিত, জ্যামিতি, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও সঙ্গীতের গভীর অধ্যয়নের ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়েছে। এই পর্যায়ের মূল উদ্দেশ্য হলো যুক্তিবোধ, বিশ্লেষণী ক্ষমতা এবং বাস্তব জগতের গভীর উপলব্ধি অর্জন।
প্লেটোর এই শিক্ষাদর্শ আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। তাঁর দর্শনের মূল শিক্ষা হলো—প্রকৃত শিক্ষা কখনো ভয়, চাপ বা মুখস্থবিদ্যার ওপর নির্ভরশীল হতে পারে না; বরং আনন্দ, কৌতূহল, অনুসন্ধিৎসা এবং শিক্ষার্থীর স্বাভাবিক সক্ষমতার বিকাশের মধ্য দিয়েই সত্যিকারের জ্ঞান অর্জন সম্ভব। ফলে শিক্ষায় প্রফুল্লতা অর্জনের জন্য এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেখানে শিক্ষার্থীকে কেবল পরীক্ষামুখী না করে তার সৃজনশীলতা, যুক্তিবোধ, নৈতিকতা এবং জীবনদক্ষতার বিকাশে সমান গুরুত্ব দেওয়া হবে।(চার) ৩০ থেকে ৩৫ বৎসর : তৃতীয় পর্যায়কে যারা সাফল্যের সঙ্গে অতিক্রম করতে পারবে, সংখ্যা তাদের যত অল্পই হোক, বাছাই করা সেই কৃতী শিক্ষার্থীদের ত্রিশ থেকে পঁয়ত্রিশ - এই পাঁচ বছর একাগ্রভাবে উচ্চতর দর্শন অধ্যয়ন করতে হবে।
উত্তম কাকে বলে তার অনুধাবন এবং সকল জ্ঞানের মধ্যকার ঐক্যসূত্রের উপলদ্ধি হবে এই পর্যায়ের শিক্ষার লক্ষ্য। উচ্চতর দর্শন পাঠের একটা সময় আছে। তার পূর্বে দর্শনের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচয় ঘটলে মঙ্গলের চেয়ে অমঙ্গলের আশঙ্খা অধিক। পরিপক্ক বয়স ব্যতীত দর্শনের গুরুত্ব উপলদ্ধি করা শিক্ষার্থীদের পক্ষে সম্ভব নয়। (পাঁচ) ৩৫ থেকে ৫০ বৎসর পর্যন্ত পূর্ববর্তী স্তরের সকল শিক্ষার্থীকে জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতায় অভিজ্ঞ করে তোলা হবে। নিম্নতর রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে তারা শাসনের অভিজ্ঞতা লাভ করবে। (ছয়) ৫০ বৎসর বয়সে পূর্ববর্তী স্তরসমূহের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হতে হতে যারা সর্বোত্তম বলে বিবেচিত হয়েছে তারা এবার তাদের সমগ্র শিক্ষা এবং অভিজ্ঞতার মাধ্যমে পরম উত্তমের জ্ঞান লাভ করবে। পরম উত্তমের জ্ঞানই হচ্ছে শাসক হওয়ার একমাত্র শতী।
এবার এই সর্বোত্তমগণ রাষ্ট্রশাসনের সামগ্রিক দায়িত্ব গ্রহণ করবে। তাদের একমাত্র চিন্তা হবে রাষ্ট্রের সুশাসন। উত্তমের অধ্যয়ন এবং রাষ্ট্রের সুশাসন - এই হবে সর্বোত্তমদের একমাত্র করণীয়। সুতরাং অত্র আলোচনার সুশাসন, শাসক, সর্বোত্তম শাসন, রাষ্ট্রের সুশাসন এবং শিক্ষা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তবে এখানে শিক্ষা পর্যায়ক্রমিক উন্নতি বেশ আলোচিত হয়েছে। প্লেটোর এ আলোচনা থেকে আমরা শিক্ষা ব্যবস্থার কতিপয় দিক আমলে নিতে পারি। যেমন অন্তত পাঠদান ও শিক্ষায় আগ্রহী করে তোলার জন্য শিক্ষার্থীদের নিকট শিক্ষা আনন্দময় করে তুলতে পারি।
প্রচলিত পরীক্ষা পদ্ধতি ও শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে অনেক ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ রয়েছে। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ এ পরীক্ষা ও মূল্যায়ন (২১) এ উল্লেখ রয়েছে- পরীক্ষা ও মূল্যায়ন একটি বিধিবদ্ধ ব্যবস্থা, যার সাহায্যে শিক্ষার সামগ্রিক উদ্দেশ্য অর্জনে শিক্ষার্থী কতটা সফল হয়েছে তা নিরূপিত হয়। পরীক্ষা ও মূল্যায়নের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নিম্নরূপ-মুখস্ত বিদ্যা নয় বরং শিক্ষার্থী বিষয়বস্তুকে কতটুকু আত্মস্থ করতে পেরেছে তা মূল্যায়নের লক্ষ্যে সৃজনশীল পদ্ধতি চালু করা এবং যথাযথ মূল্যায়নের জন্য পাঠ্যপুস্তক, প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করার নিয়মকানুন নির্ধারণ এবং প্রশ্নকর্তা ও পরীক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্ট সকলের তা বুঝতে পারার উপায় নির্ধারণ এবং তাদের সচেতন করা।
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে উল্লেখ রয়েছে যে- দ্বাদশ শ্রেণীর শেষে আরো একটি পাবলিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে, এর নাম হবে উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষা। উভয় পরীক্ষা হবে সৃজনশীল পদ্ধতিতে এবং পরীক্ষার মূল্যায়ন হবে গ্রেডিং পদ্ধতিতে। উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে উচ্চশিক্ষার জন্য বৃত্তি প্রদান করা হবে। অন্যদিকে মাদরাসার ক্ষেত্রে জুনিয়র দাখিল ,দাখিল ও আলিম পরীক্ষায় সকল ধারার জন্য আবশ্যিক বিষয়সমুহে অন্যান্য ধারার সঙ্গে অভিন্ন প্রশ্নপত্র অনুসরণ করা হবে। এছাড়াও মাধ্যমিক পর্যায়ে ব্যবহারিক পরীক্ষার যথাযথ মূল্যায়নের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
অন্যদিকে মাধ্যমিক পর্যায়ের পাবলিক পরীক্ষায় কোন শিক্ষার্থী এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য হলে তাকে সে বিষয়ে/বিষয় দু’টিতে দু’বার পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হবে। শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি পরিবর্তিত হলে পুরাতন শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি অনুযায়ী উক্ত প্রার্থীকে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হবে, তবে কোনো অন্তর্বতীকালীন পরীক্ষা অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা যাবে না। সুতরাং এ সকল বিষয়ে শিক্ষার্থীদের আরো সচেতন করা প্রয়োজন। বাংলাদেশে শিক্ষায় আগ্রহ বাড়ানোর জন্য পাবলিক পরীক্ষায় ওপেন বুক এক্সাম চালু করা যেতে পারে। কারণ ক্লোজড বুক এবং ওপেন বুক পরীক্ষায় শিক্ষার্থীরা উপকৃত হতে পারবে।
এ সকল পরীক্ষায় সাধারণত পরীক্ষার প্রস্তুতি, না বুঝে মুখস্তকরণ, সক্রিয় শিক্ষা, বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যস্ততা, দক্ষতা, উদ্বিগ্নতা হ্রাস, এবং শিক্ষার্থীদের সন্তুষ্টি ইত্যাদি বিষয় এ ক্ষেত্রে অন্তর্ভূক্ত। প্রথাগত ও প্রচলিত পরীক্ষা পদ্ধতিতে মূলত না বুঝে মুখস্ত করার বিদ্যাকে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। অন্যদিকে ওপেন বুক এক্সাম (ওবিই) তে যৌক্তিক বিশ্লেষণ, নিজে নিজে শিক্ষা গ্রহণ, এবং কোন বিষয়ে গভীর বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা লাভ করা যায়। তবে ওপেন বুক এক্সাম এবং সংশোধনকৃত যে কোন নীতি প্রণয়নের এবং বাস্তবায়নের আগে শিক্ষার্থী ও অংশীজনদের সাথে পর্যালোচনা করতে হবে।
সমগ্র বাংলাদেশে উচ্চ মাধ্যমিক ও সার্টিফিকেট (এইচ.এস.সি) ও সমমান পরীক্ষা ২০২৬ এ মোট ০৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে এবং মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডেও সমমান পরীক্ষায় ১২ লক্ষ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন শিক্ষার্থী অংশ নিচ্ছেন। এ সকল পরীক্ষার্থীদের মধ্যে অনেকেই অংশ নিলে ও এবার ৩৬% পরীক্ষার্থী অংশগ্রহণ নিচ্ছেন না, যা হতাশাজনক। পরীক্ষা ও শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি এ ধরণের অনীহা দূর করতে হবে। ঝরে পড়া শিক্ষার্থী রোধে করণীয় সম্পর্কে শিক্ষাবিদগণ নানা পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
বর্তমানে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের রোধ করার জন্য অভিভাবক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সরকারকে আন্তরিক হতে হবে। শিশুশ্রম রোধে পদক্ষেপ, শিক্ষায় আগ্রহী করে তোলা ইত্যাদিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আরো বেশি মনোনিবেশ করতে হবে। পরীক্ষা অংশগ্রহণের যে বিদ্যমান ভীতি রয়েছে তা দূর করতে হবে। এছাড়াও মনোবিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদদের নিকট পরামর্শ গ্রহণ, মিড ডে পরিপূর্ণ চালু, শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ তৈরি, অস্বচ্ছল শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহায়তা এবং অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে।
শিক্ষার মান উন্নতিকরণে যেমন অর্থ বরাদ্দ এবং সরবরাহ ও ব্যবস্থাপনা সহায়তা যেমন ঘাটতি রয়েছে তেমনি বিদ্যমান শিক্ষানীতি ও শিক্ষাকমিশনে রয়েছে নানা সমালোচনা ও অসামঞ্জস্যতা। সুতরাং এ সকল বিষয়ে বর্তমান সরকারকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমত, প্রচলিত শিক্ষানীতি সংশোধন এবং শিক্ষাকমিশন পুনর্গঠনের জন্য সকল অংশীজন এবং জনসাধারণের সাথে উন্মুক্ত আলোচনা করে আইনগত ধারাগুলো সংশোধন করতে হবে।
এক্ষেত্রে সরকার ও বিরোধীদলের জাতীয় ঐক্য প্রয়োজন। তাছাড়া শিক্ষা নিয়ে বর্তমান সরকারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কার্যক্রম ক্রমান্বয়ে কিছুটা অগ্রসর হচ্ছে। যেমন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শিক্ষাখাতে বাজেট মোট জিডিপি-র ২% (১ লক্ষ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা) বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। যা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক ও প্রশংসনীয় পদক্ষেপ। এখন প্রশ্ন হলো এ রেকর্ড পরিমাণ বাজেট কিভাবে ব্যয় ও বণ্টন করা হবে? তা আলোচনার দাবি রাখে।
কারণ বিগত এক দশকের বেশি সময় ধরে উন্নয়ন কার্যক্রম ও প্রকল্প বাস্তবায়নে নানা অসঙ্গতি ও ক্রটি বিচ্যুতি পরিলক্ষিত হয়েছে। কি পরিমাণ টেকসই উন্নয়ন, ও জনগণ সুবিধা পেয়েছে তা মূলত বিবেচনার বিষয়। সুতরাং, শিক্ষা, এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনসহ বর্তমান সরকারকে এ সকল ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা, সকলের অংশগ্রহণ, নিয়ম ও নীতির অনুসরণ, প্রয়োজন অনুযায়ী সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত ও অন্তর্ভুক্তিকরণসহ বিভিন্ন মানদণ্ড বজায় রাখতে হবে। কারণ শিক্ষা বাজেট দিয়ে শুধু কাঠামোগত সংস্কার করলেই হবে না বরং শিক্ষার মানোন্নয়নে মানসম্মত সিলেবাস প্রণয়ন, আধুনিক ও কর্মমূখী শিক্ষার প্রচলন, গবেষণা ও উদ্ভাবনে বরাদ্দ, শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষাবৃত্তি ও শিক্ষায় মনোনিবেশে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ, শিক্ষার সাথে সংশ্লিষ্ট সবার জন্য মান সম্মত প্রশিক্ষণ ও সমৃদ্ধ জীবন যাপনে বেতন বৃদ্ধি, উন্নতি বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে শিক্ষার অভিযোজন কৌশল রপ্ত ইত্যাদি বিষয়েও সমপরিমাণ বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে।
অন্যদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঘোষিত ১২ দফা সংস্কার উদ্যোগ পাইলট প্রকল্প হিসেবে শুরু করতে হবে। পাইলট প্রকল্পের ত্রুটি -বিচ্যুতি আমলে নিয়ে পরবর্তী করণীয় ঠিক করতে হবে। পাইলট প্রকল্প বিফলে গেলে পুনরায় সংস্কার কার্যক্রম নবায়ন করতে হবে। বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী গত ২০০১-২০০৬ তে শিক্ষার জন্য প্রশংসনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন যা সর্বমহলে স্বীকৃত। পরীক্ষার হলে নকল করার প্রবণতা কঠোরভাবে প্রতিরোধ করেছেন। তবে বর্তমান সময়ে নকল প্রতিরোধের পাশাপাশি প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ, পরীক্ষা ব্যবস্থা ঢেলে সাজানো, বেকারত্ব দূর, এবং দক্ষ মানবসম্পদ গঠনে শিক্ষামন্ত্রীকে বেশি মনোনিবেশ করতে হবে।
এবার তিনি দায়িত্ব গ্রহণের পর কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করলেও সময় অল্প (প্রায় ৫ মাসন) হওয়াতে এখনও পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি। শিক্ষামন্ত্রীর কার্যক্রম ও পদক্ষেপ মূল্যায়নের জন্য আমাদের আরো অপেক্ষা করতে হবে। তাকে আমাদের আরো সময় দিতে হবে। অন্যদিকে শিক্ষামন্ত্রী বর্তমান কিছু বাস্তবতা ও অবস্থাকে আমলে নিতে হবে। যেহেতু পূর্বের অবস্থা ও সময়কাল বর্তমানের সাথে এক নয়। বর্তমান জেনারেশনের স্পন্দন, যুগের চাহিদা, জেনজির অগ্রাধিকার বিষয় এবং বিগত আমলের শিক্ষার ভুল-ত্রুটি পর্যালোচনা করতে হবে। তাহলে বর্তমান শিক্ষামন্ত্রীর শিক্ষা নিয়ে যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য রয়েছে, তা বাস্তবায়ন করা সহজ হবে।
পাশাপাশি বর্তমানে উদ্ভূত সমালোচনা ও বিতর্ক এড়িয়ে চলা সম্ভব। শিক্ষা যেহেতু একটি গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর বিষয় ,তাই এখানে প্রতিটি পদক্ষেপ অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে ফেলতে হবে। এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা নিয়ে যে অচলাবস্থা সৃষ্ঠি হয়েছে তা দ্রুত সমাধান করতে হবে। শিক্ষামন্ত্রীর দুঃখ প্রকাশ এবং শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ আমলে নিয়ে যে ঘোষণা দিয়েছেন, তা আমরা সাধুবাদ জানাই।
বেকারত্ব হ্রাস ও দক্ষ মানব সম্পদ গঠনে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সরকারকে সুচিন্তিতভাবে এগোত হবে। শিক্ষা ও গবেষণার আমূল ইতিবাচক পরিবর্তন ছাড়া সমৃদ্ধ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। সুশিক্ষা, কার্যকর শিক্ষানীতি ও শিক্ষাকমিশনই আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণ করবে। -লেখক, মো. হাবিবুর রহমান, কবি, গবেষক ও বিশ্লেষক