ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ৩১ আশ্বিন ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

সার ডিলার নিয়োগে দলীয়করণ ও অনিয়ম-দুর্নীতির তদন্ত দাবি জামায়াতের

সার ডিলার নিয়োগে দলীয়করণ ও অনিয়ম-দুর্নীতির তদন্ত দাবি জামায়াতের

সারসংকটের জন্য ডিলার নিয়োগে অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবকে দায়ী করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করে বলেছেন, বিএনপি নেতারা অর্থের বিনিময়ে ডিলার নিয়োগ দিয়েছেন। বিদ্যমান নীতিমালা ও আদালতের আদেশ উপেক্ষা করে ডিলার নিয়োগের কারণে সার বিতরণব্যবস্থায় নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সারসংকট এবং সার ডিলার নিয়োগে অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির প্রতিবাদে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। এ সময় তিনি সার ডিলার নিয়োগের অনিয়ম তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণসহ ছয় দফা দাবি তুলে ধরেন।

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, দেশে সংকটের অভাব নেই। যেখানেই হাত দেওয়া হচ্ছে, সেখানেই সংকট দেখা যাচ্ছে। সার ডিলার নিয়োগে চরম দলীয়করণ করা হয়েছে, যার প্রভাব পড়ছে কৃষি ও নাগরিক জীবনে। সার বিতরণ ও ডিলার নিয়োগে চরম দুর্নীতি, অনিয়ম ও নৈরাজ্য হয়েছে। বিদ্যমান সরকারি নীতিমালা লঙ্ঘন করে এসব করা হয়েছে।

তিনি বলেন, কৃষি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব কৃষিমন্ত্রীর হলেও এ বিষয়ে কথা বলছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। তাদের মধ্যে রাজনৈতিক কর্তৃত্ববাদী মানসিকতা চেপে বসেছে। জেলায় গঠিত কমিটিতে রাজনৈতিক বিবেচনায় তিনজনকে মনোনীত করা হয়েছে। এতে যোগ্য ব্যক্তিদের ডিলার হিসেবে নিয়োগের সুযোগ সংকুচিত হয়েছে। বিএনপির নেতারা অর্থের বিনিময়ে ডিলার নিয়োগ দিয়েছেন। ফলে সার বিতরণে সরকার শতভাগ ব্যর্থ হয়েছে।

সারসংকটের কারণ হিসেবে সরকারের অব্যবস্থাপনা, ডিলার নিয়োগে স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতি, কালোবাজারে সার বিক্রি এবং চোরাচালানের কথা উল্লেখ করেন জামায়াতের এই নেতা। তিনি বলেন, ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে নির্ধারিত শর্ত মানা হয়নি। কিছু এলাকায় দলীয় প্যাডে তালিকা দেওয়া হয়েছে এবং সেই তালিকা বিবেচনায় নিয়ে ডিলার নিয়োগ করা হয়েছে। অর্থের বিনিময়ে ডিলার নিয়োগের ঘটনাও ঘটেছে। দিনাজপুর ও রংপুরের বদরগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় এ ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

মিয়া গোলাম পরওয়ার আরও বলেন, ‘দ্য ডিসেন্ট’-এর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিএনপির ১৪ জন সংসদ সদস্যের নির্বাচনী এলাকায় সারসংকট হয়েছে এবং কৃষকেরা ভোগান্তিতে পড়েছেন। এক এলাকার বাসিন্দাকে অন্য এলাকায় সারের ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে। এমনকি আগে কখনো সারের ব্যবসা না করেও অনেকে ডিলারশিপ পেয়েছেন। একই পরিবারের একাধিক ব্যক্তিকে ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে। ভুয়া গুদাম ও ভুয়া চুক্তিনামা ব্যবহার করেও ডিলারশিপ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে দলীয় চাপের মুখে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, রংপুরের পীরগাছা উপজেলায় বিএনপির প্যাডে দেওয়া ডিলার নিয়োগের তালিকায় আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির নেতাদের নামও পাওয়া গেছে।

মিয়া গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেন, বিএনপির ত্যাগী নেতাদের ডিলারশিপ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। সরকারের মন্ত্রীরা নীতিমালার তোয়াক্কা করছেন না। ফলে ‘সবার আগে বিএনপি’ নীতিই প্রাধান্য পাচ্ছে, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নয়। হাইকোর্টের আদেশ ভঙ্গ করে ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে সার ডিলার নিয়োগ ও বিতরণব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ছয় দফা দাবি তুলে ধরে জামায়াত। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে, ডিলার নিয়োগে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক প্রভাব ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ অবিলম্বে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ; ডিলার নিয়োগের যোগ্যতা মূল্যায়নের মানদণ্ড, তালিকা তৈরির প্রক্রিয়া ও লাইসেন্স প্রদানের ভিত্তি জনসমক্ষে প্রকাশ; ডিলারশিপ দেওয়ার নামে অর্থ আদায়ের অভিযোগ তদন্ত করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ।

এ ছাড়া সারসংকট নিয়ে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বক্তব্যের সঙ্গে বিভিন্ন এলাকার প্রকৃত পরিস্থিতির অসংগতি যাচাই করে তথ্য প্রকাশ, ডিলার নিয়োগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের লিখিত ব্যাখ্যা এবং তদন্তের অগ্রগতি জনসমক্ষে জানানো এবং কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তা প্রমাণের ভিত্তিতে যাচাই করার দাবি জানিয়েছে দলটি।

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সারসংকট সম্পর্কে সরকার জাতিকে অসত্য তথ্য দিয়েছে। গত ছয় থেকে সাত মাসে সরকারের সর্বস্তরে দলীয়করণ ও দুর্নীতি এবং মন্ত্রীদের মিথ্যাচার নিয়ে জামায়াতে ইসলামী অত্যন্ত উদ্বিগ্ন। নিজেদের ব্যর্থতা আড়াল করতে একের দায় অন্যের ওপর চাপানোর চেষ্টা চলছে। দুর্নীতি ও দলীয়করণে নিমজ্জিত সরকারের বিরুদ্ধে দেশবাসীকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

তিনি বলেন, জুলাই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও ভিন্নমতের ওপর দমন-পীড়নমুক্ত মানবিক ও ইনসাফভিত্তিক নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখা হয়েছিল। কিন্তু ক্ষমতাসীন সরকার সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে দেবে না। বিরোধীদলকে বাদ দিয়ে নিজেদের সুবিধামতো সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার লক্ষ্যে কর্তৃত্ববাদী সাংবিধানিক কাঠামো তৈরিতে ব্যস্ত রয়েছে সরকার।

জামায়াতের এই নেতা বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন এবং সংবিধান সংস্কারের অনুমোদিত আইনি কাঠামো অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন করতে চায় জামায়াত। কিন্তু সরকার তা উপেক্ষা করে কর্তৃত্ববাদী কাঠামোর আদলে সবকিছু সাজাচ্ছে। বিরোধীদলকে সংবিধান সংস্কার প্রক্রিয়া থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে বাইরে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে রাজনৈতিক অপকৌশল আড়াল করার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

এ উদ্যোগের নিন্দা জানিয়ে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ক্ষমতাসীনদের লক্ষ্য আজীবন ক্ষমতায় থাকা, যা ফ্যাসিবাদী চিন্তার একটি সর্বনাশা পদক্ষেপ। এই চিন্তা থেকে সরকারকে ফেরানোর চেষ্টা করবে জামায়াত। বিতর্ক রাজপথে না ঠেলে সংসদে সমাধানের আহ্বান জানান তিনি।

তিনি আশা প্রকাশ করেন, সংবিধান সংশোধনের পরিবর্তে গণভোটে নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়ায় সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে আগামী সংসদ অধিবেশনে সরকার বিরোধীদলকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যাবে।

দেশে সার, তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসংকটের কারণে উৎপাদন খরচ বাড়ছে এবং এর প্রভাবে দ্রব্যমূল্যও বাড়ছে উল্লেখ করে নগরবাসী ও প্রান্তিক কৃষকদের দুর্ভোগ কমাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান মিয়া গোলাম পরওয়ার।

জামায়াত,তদন্ত দাবি,অনিয়ম-দুর্নীতি,দলীয়করণ,সার ডিলার নিয়োগে
আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত